চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোঁড়া: গতির ওপর কেন এই দুর্গতি?

মন্তব্য প্রতিবেদন

0

‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু’-এই উক্তি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গতি বন্দনায় যিনি লিখেছেন – ‘জীবনে অনন্তকে চিনতে হবে…গতির মধ্য দিয়ে অনন্তের স্বরূপ চোখে ধরা দেবে। হে জীবনপথের পথিক। পথের ধারে ঘুমিয়ে পড়ো না।’ কিন্তু দেশে আজ বিভূতিবাবুর গতি বন্দনার উল্টোসুর। আজ গতি-ই দেশে ডেকে আনছে দুর্গতি। দেশের রেলপথে প্রায়ই চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে যাত্রীদের আহত করার (দু)ঘটনা ঘটছে। চলন্ত ট্রেনের জানালায় পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনায় অনেকেই উদ্বিগ্ন।

‘ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত কয়েক মাসে চলন্ত ট্রেনে ঢিলের আঘাতে অনেক যাত্রী আহত, এমনকি বেশ কয়েকজন নিহতও হয়েছেন। দুষ্কৃতিকারীরা এভাবে নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের মাধ্যমটিকে অনিরাপদ করে তুলছেন। এতে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বিপন্ন হচ্ছে মানুষের জীবন।এই কথাগুলো রেলপথ মন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজনের। চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে (ডেইলি স্টার অনলাইন, ০৮:৪১ অপরাহ্ন, মে ০৭, ২০১৯) এসব কথা বলেন তিনি। বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে ২,০০০ এর বেশি জানালা-দরজা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত এক মাসে রাজশাহী-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ট্রেনে ১৭ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় এখনও জড়িত কাউকে আটক করা যায়নি।

ট্রেনে পাথর ছোঁড়া নিয়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি

রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ট্রেনে চড়ে উত্তরাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তিনি ট্রেনে থাকা অবস্থাতেই বাইরে থেকে ছোঁড়া ঢিলের আঘাতে জানালার কাঁচ ভেঙে যায়। এই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও ট্রেনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সর্বশেষ গত রোববার রাতে ঢাকা ও রাজশাহীর মধ্যে চলাচলকারী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনায় চার বছর বয়সী জিসান নামে এক শিশু ও তার মা আহত হন। এদিকে চলন্ত ট্রেনে ছোঁড়া পাথরের আঘাতে ৩০ এপ্রিল আহত টিআই শিকদার বায়েজিদের জ্ঞান ফেরেনি এখনও। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে।

এভাবে শুধু যাত্রীই নয় খোদ রেলের কর্মচারীরাও হতাহত হচ্ছেন। ছুঁড়ে মারা পাথরের আঘাতে প্রাণ গেছে টিকেট চেকার শিকদার বায়েজিদ ও প্রকৌশলী প্রীতি দাসের। খুলনাগামী বেনাপোল কমিউটার ট্রেনে আহত বায়েজিদ ৪১ দিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে গত বছর ১১ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান। এখন ঘন ঘন ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগে গোটা রেলপথ মন্ত্রণালয়। আজ থেকে ছয় বছর আগে এই প্রবণতাটি আরো ভয়াবহ ছিল। ‘ট্রেনযাত্রীদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা’ শীর্ষক গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখের ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় থেকে জানা গেল- ‘তুলনামূলকভাবে ট্রেনকে নিরাপদ গণপরিবহন বলিয়া বিবেচনা করা হয় সারা বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আমাদের দেশে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা কতোখানি নাজুক তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বাস্তবতা হইল, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে শত শত কিলোমিটার ট্রেন লাইনের প্রায় পুরোটাই অরক্ষিত ও অনিরাপদ। দেশের প্রায় সর্বত্রই ট্রেন লাইনের পাশ ঘেঁষিয়া শুধু যে বিপজ্জনকভাবে অসংখ্য বস্তি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই নহে, লাইনের উপর নিয়মিত হাটবাজারও বসিতেছে। গরুছাগল চরিতেছে। খেলা করিতেছে শিশু-কিশোরের দল। আর ট্রেনলাইনের উপর দিয়া যত্রতত্র পথচারী ও যানবাহন পারাপারের ঘটনা তো আছেই।’ একই বছরের ২৮ অগাস্ট দৈনিক সমকাল’র অনলাইন এডিশন জানাচ্ছে, দুপুরে &বখাটে যুবকদের& ছোঁড়া পাথরের আঘাতে শাহাদত হোসেন (৫৯) নামে এক ট্রেনচালক মাথা ফেটে গুরুতর আহত হয়েছেন। পোড়াদহ জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবজাল হোসেন জানান, চালক আহত হওয়ার পর থেকে খুলনা-রাজশাহী ও ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।’

ট্রেনে পাথর ছোঁড়া নিয়ে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি

গতিময় রেলগাড়িতে মৃত্যু আজ বেপরোয়া। রেলের গতি আজ অনন্তের স্বরূপ হয়ে অন্তর্চক্ষুতে ধরা না দিয়ে মস্তক থেকে প্রবহমান রক্তধারা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আর রেলপথের পথিক পথের ধারে কখনো আহত, কখনোবা ঘুমিয়ে পড়ছে চিরতরে। ১৬ আগস্ট, ২০১৩ তারিখের যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যমতে ‘প্রতি মাসে চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারার ৩০-৩৫টি ঘটনা ঘটলেও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। জনবল সংকটসহ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও, গত ৫ বছরে এ রকম ঘটনা ঘটেছে দুই হাজারেরও বেশি। রেলওয়ে নথিপত্রে পাওয়া সূত্রে জানা যায়, গড়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ট্রেনের প্রায় ৩৫টি দরজার গ্লাস পাথর নিক্ষেপের কারণে ভাঙছে।’ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নথি অনুযায়ী প্রতিবেদক জানাচ্ছেন- ‘চলতি বছর দৌলতগঞ্জ, ফাতেমানগর, গেণ্ডারিয়া, মানিকখালি, কসবা, ফৌজদারহাট, সোনাইমুড়ি, লালমাই ও ভাটিয়ারি এলাকায় পাথর ছোঁড়ার নয়টি ঘটনা ঘটে। এর বাইরেও হরহামেশা এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে রেলযাত্রী ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।’ বিডিনিউজে প্রকাশিত সংবাদে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. তাফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘রাতের বেলায় কারা, কেন ঢিল ছুঁড়ে মারে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা নেই। কারণ ঢিল মেরে ডাকাতি বা ছিনতাই কিছুই হচ্ছে না। হতে পারে কেউ ‘মজা’ করার জন্য পাথর ছুঁড়ে মারে।’

চলন্ত ট্রেনে মজা লুটতে গিয়ে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শৈশবের একটি নীতিগল্পের। যেখানে খেলাচ্ছলে ব্যাঙকে পাথর ছুঁড়ে মারে অবোধ শিশুর দল। যেখানে একপক্ষের বিনোদন, অনপক্ষে তা ডেকে আনে প্রাণসংহার। ঢিল ছুঁড়ে ব্যাঙ মারার মতো ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার মতো পরিস্থিতির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিবারের সদস্যরাও। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা জাকির হোসেন নিজেও চলন্ত ট্রেনে এ ধরনের হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। গত ৭ অগাস্ট চট্টলা এক্সপ্রেসে করে চট্টগ্রামে আসার পথে তার ট্রেনে ঢিল পড়ে। তার অভিজ্ঞতাটি এরকম- ‘ব্রাক্ষণবাড়িয়া স্টেশনের একটু পরই কয়েকজন কিশোর গুলতি দিয়ে ট্রেন লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে থাকে। তবে কেন তারা এমন করছে তা বলা কঠিন’- সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীতে এমনটিই বলেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদে বলা হচ্ছে- ‘রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা মতে কেউ যদি ট্রেনে পাথর ছোঁড়ে, তাহলে যাবজ্জীবন জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। পাথর নিক্ষেপে যদি কারও মৃত্যু হয়, তাহলে ৩০২ ধারা মতে দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রয়েছে।’

চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনায় শাস্তি কার্যকর কি না তা বোঝা যায় না, এমন ঘটনার নিত্যতা থেকে। আমরা জানি, সারাদেশে প্রায় দুই হাজার নয়শ’ কিলোমিটার রেলপথ আছে। ‘শাস্তি দেওয়ার মতো আইন’ কাজীর কেতাবে থাকলেও, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও খুলনা-পার্বতীপুর লাইনে প্রতিনিয়তই পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটছে। ছয়বছর আগে চলন্ত ট্রেনে বাইরের থেকে ছোঁড়া পাথরের আঘাতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থী প্রীতি দাশ নিহত হওয়ার পর রেল কর্তৃপক্ষ চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ না করার জন্য সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ট্রলি ক্যাম্পেইন শুরু করে। অবাক হলেও সত্যি, দিনে সচেতনতা শেষ হওয়ার পর রাতে ঐ এলাকায় আবার চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করার ঘটনা ঘটেছে! আমাদের ভাববার সময় হয়েছে যে দুর্বার গতিতে একটি ট্রেন ভোঁ-ভোঁ শব্দে কোনো একটি এলাকা অতিক্রম করলে সে এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত, শ্লথ জীবনধারণকারী ধীরগতির মানুষরা কেন চলন্ত ট্রেনে পাথর মারে? এর কারণ যদি হয় হিংসা বা ক্রোধ, তাহলে অবাক হব না। আমাদের ভাবতে হবে, সমাজের একাংশের মধ্যেই গতি অন্য অংশের মধ্যে ‘স্থিতি’ই কি এই দুর্গতি সৃষ্টি করছে না?

সমাজের সর্বাংশে দ্রুতি না আসলে এভাবেই আমাদের পাথর খেয়ে মরতে হবে। ভোগবাদ, শোষণ, লুণ্ঠনের সমাজের একটি অংশ গতিশীল থাকবে, আর সারা দেশে দুই হাজার নয়শ’ কিলোমিটার বিস্তৃত রেলপথের দুইপাশের বস্তি, নিম্নবিত্ত ও পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ সমাজের মানুষগুলোকে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির মনে করার কোনো কারণ আছে কি!

গতির ধর্ম কী? যখন কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে তাকে গতিশীল বস্তু বলে। আর যে প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন ঘটে তাকে বলে গতি। বিশ্বজগতের প্রত্যেকটি বস্তুই গতিশীল। কিন্তু আমরা গতির ধর্ম বদলে দিয়েছি। আমরা একদল মানুষকে গতিহীন করে রেখেছি, আমাদের সমাজে, আমাদের চারপাশেই। সমাজের একদল গতিহীন লোক চলন্ত ট্রেনের গতির উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে এই দুর্গতি ডেকে আনছে। যে সমাজে দুই শ্রেণীর জন্য দুই ধরনের গতি, সে সমাজে সুবিধাভোগী হিসেবে আমার-আপনার কপালে দুর্গতি-ই কি প্রাপ্য নয়? সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর না হলে সমাজে কি সার্বিক গতি আসবে? যে গতির চাকায় দুনিয়া দৌড়ে চলছে বাংলাদেশ কি সেই গতি থেকে ছিটকে পড়ছে? রাষ্ট্রের হর্তকর্তার মতিগতি বোঝা ভার, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এই গতি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমার-আপনারও কোনো অংশে কম নয়। সমাজের সর্বাংশে ‘দ্রুতগতি’ ফিরলেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উক্তি ‘গতিই জীবন, গতির দৈন্যই মৃত্যু’ বাস্তব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। সমাজের গতিহীন মানুষগুলোর পেশিতে গতি ফিরিয়ে দিয়ে সমাজে প্রগতি আনতে পারলেই হয়তো এই দুর্গতি দূর হতে পারে! ঘণ্টায় সত্তর কিলোমিটারের গতি যাদের জীবনে নেই, ট্রেনের গতি এবং এই গতির মধ্যে স্থির যাত্রীদের প্রতি সমাজের ধীরগতির মানুষের হিংসা, রাগ, ক্ষোভ, কৌতূহল মিশ্রিত পাথর পড়লে অবাক হওয়ার কী আছে!

লেখক: রাজীব নন্দী
সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; পরামর্শ সম্পাদক, জয়নিউজ

 

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...