ছালাম আর বাণিজ্যিক বিলবোর্ডে একাকার ফ্লাইওভার!

0

নান্দনিক নগর গড়তে নগরজুড়ে বিলবোর্ডের ‘অত্যাচারে’ যতি টেনেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। সব মহলের প্রশংসা কুড়োনো সেই উদ্যোগে গলার কাঁটা হয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের নামে লাগানো কিছু বিলবোর্ড।

সময় গড়িয়েছে। নগরের প্রায় সব বিলবোর্ডই সরেছে। কিন্তু ফ্লাইওভারগুলোর নিচে এখনও রয়ে গেছে বেশকিছু বিলবোর্ড। সেই বিলবোর্ডে এখনও একাকার হয়ে আছে চউক আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন।

নিয়মানুযায়ী নগরে কোনো বিলবোর্ড, ইউনিপোল কিংবা প্রদর্শনী বিজ্ঞাপন স্থাপন করতে হলে চসিকের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু চসিকের কোনো অনুমোদন না নিয়ে নগরের ফ্লাইওভারগুলোর নিচে ছোট ছোট অসংখ্য বিলবোর্ড স্থাপন করেছে চউক।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব বিলবোর্ডে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে চউকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম নিজের কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টা করেছেন। গত মাসে চউক চেয়ারম্যানের চেয়ার ছেড়েছেন আবদুচ ছালাম। এরপর ফ্লাইওভারের নিচে লাগানো বিলবোর্ড থেকে ছালামের নামে লাগানো বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলা হয়।

কিন্তু কদিন না যেতেই বিলবোর্ডের সেই খালি জায়গায় লাগানো হয়েছে ছালামের নামে নতুন কিছু পোস্টার। কিছু বিলবোর্ডে আবার ছালামের বিজ্ঞাপন সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে জেন্টেলম্যান, ইজি ও ইলিউশনের নামে তিন ব্র্যান্ডের শো-রুমের বিজ্ঞাপন!

অভিযোগ রয়েছে, বিলবোর্ডগুলো ভাড়ার নামে জেন্টেলম্যান, ইজি ও ইলিউশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম মানিক ও স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা খলিলের প্রায় দুই লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৫৪ ফুট চওড়া আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের পিলারে পোস্টার-ব্যানার লাগানো বন্ধ করতে চীন থেকে আমদানি করে লাগানো হয়েছে কৃত্রিম সিনথেটিক ঘাস। একইসঙ্গে ফ্লাইওভারের সৌন্দর্যবর্ধনে লাগানো হয়েছে নানান প্রজাতির গাছ। কিন্তু কোনোভাবেই পোস্টার-বিলবোর্ড লাগানো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা খোদ চউকের পক্ষ থেকেই লাগানো হয়েছে অসংখ্য বিলবোর্ড!

এর বাইরে প্রায় ৫০টি বিলবোর্ডে লাগানো হয়েছে জেন্টেলম্যান, ইজি ও ইলিউশনের নামে তিন ব্র্যান্ডের শো-রুমের বিজ্ঞাপন।

জেন্টেলম্যানের ডিরেক্টর শহীদুল ইসলাম লাবলু জয়নিউজকে বলেন, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিক ভাইয়ের সঙ্গে ৬০ হাজার টাকা চুক্তিতে আমরা এ বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দিয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, চউক থেকে অনুমতি নেওয়া আছে। কোনো সমস্যা হলে উনি দেখবেন।

ইজি শো-রুমের ডিরেক্টর তৌহিদ চৌধুরী জয়নিউজকে বলেন, খলিল ভাই নামে এক স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতার মাধ্যমে মোট ৬০ হাজার টাকার চুক্তিতে বিলবোর্ডগুলো লাগানো হয়েছে। খলিল ভাই বলেছিলেন, তিনি সিডিএ (চউক) ও সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে বিলবোর্ড লাগানোর ব্যাপারে অনুমতি নিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহানগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খোরশেদ আলম মানিক জয়নিউজকে বলেন, এমন কোনো লেনদেন বা চুক্তি সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে এক ছোট ভাইয়ের কাছে শুনেছিলাম, তারা ঈদ উপলক্ষে কিছু বিলবোর্ড দিয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে ছাত্রলীগ নেতা খলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুদ্দোহা জয়নিউজকে বলেন, নগরের যেকোনো স্থানে বিলবোর্ড দিতে হলে অবশ্যই সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। যদি ফ্লাইওভারের নিচে কোন বিলবোর্ড থেকে থাকে তাহলে তা বেআইনিভাবে লাগানো হয়েছে। এসব বিলবোর্ড অপসারণের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এর মধ্যে একাধিকবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। যদি চউক অবগত থাকার পরও এমন বেআইনি কাজ বন্ধ করতে কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে তা অন্যায় হয়েছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ জয়নিউজকে বলেন, আমরা এমন কোনো বিলবোর্ড স্থাপনের জন্য অনুমতি দিইনি। কেউ যদি ফ্লাইওভারের নিচে কোনো বিলবোর্ড স্থাপন করে থাকে তাহলে তা বেআইনি। এ ব্যাপারে কেউ অর্থের লেনদেন করেছে এমন কোনো কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনার কাছ থেকেই বিষয়টা শুনলাম। ইনশাআল্লাহ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরের বিলবোর্ডগুলো অপসারণের উদ্যোগ নেন। ওই সময় বিভিন্ন মহলের বাধা উপেক্ষা করে তিনি কঠোর অবস্থানে থেকে পুরো নগরকে বিলবোর্ডমুক্ত করেন। সেই থেকে চট্টগ্রাম নগর এখন বিলবোর্ডমুক্ত। এরপর থেকে নগরে অপরিকল্পিত কোনো বিলবোর্ডের অনুমোদনও দেওয়া হচ্ছে না সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। কিন্তু চউকের সাবেক চেয়ারম্যান সিটি করপোরেশনের আইন অমান্য করে ফ্লাইওভারের নিচে স্টিলের স্থায়ী কাঠামোয় ছোট ছোট বিলবোর্ড স্থাপন করেছিলেন, যা নীতিবিরুদ্ধ কাজ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জয়নিউজ/এমজেএইচ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...