প্রচারণার নয়া দিশা ‘মাল্টিমিডিয়া’ পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন

একাদশ জাতীয় নির্বাচন

0

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব প্রচার-প্রচারণা শুক্রবার (২৮ ডিসেম্বর) সাঙ্গ হল। পক্ষকালব্যাপী ভোটের প্রচারণায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও ব্যক্তি স্ব-স্ব বক্তব্য নিয়ে সরব থেকেছেন। কেউ ভোট চেয়েছেন, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ আবার নিজ দলের প্রচার করেছেন। অতীতের সকল নির্বাচনি প্রচারণার চাইতে এবারের নির্বাচনি প্রচারের গুণগত পরিবর্তন বেশ চোখে পড়েছে। অবশ্য পরিবর্তন না বলে একে বলা দরকার অনিবার্যতা। সেটা হল, ডিজিটাল প্রচারণা। এবারের ভোটের মাঠে শুধু ডিজিটাল প্রচারণাই নয়, যোগাযোগবিদ্যার ভাষায় আমরা দেখেছি- বহুমাধ্যমাশ্রিত বৈদ্যুতিন জনপ্রিয় রাজনৈতিক যোগাযোগ। বাংলাদেশ যেহেতু সনাতনী সমাজ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে প্রাযুক্তিক সমাজে পা দিয়েছে, ফলে একে বলা যেতে পারে মাল্টিমিডিয়া পলিটিক্যাল কমিউনেকশন ইন ডিজিটাল ইলেকশন।

অনলাইনে গত মাসখানেক ধরে চলা বেশ কিছু নির্বাচনি প্রচারণার সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় ব্যাপারটি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি। ভোটের মাঠে রাজনৈতিক যোগাযোগে মাল্টিমিডিয়া প্রচারণার প্রভাব সংক্রান্ত ভবিষ্যতে বড় পরিসরে তা বিস্তারিতভাবে হাজির করার চেষ্টা থাকবে।

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ঐতিহ্যগত ধারায় মিছিল, সমাবেশ, উঠান-বৈঠক, জনসভার চাইতে এগিয়ে ছিল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ওয়েবসাইটসহ আরো অনেক নতুন নতুন বহুমাধ্যম কৌশল৷ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আলমাস কবীর নির্বাচনি প্রচারণায় ভিন্নতা আসার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ দৈনিক প্রথম আলোকে (২০ ডিসেম্বর ২০১৮) বলেছেন, ১০ বছর আগে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৯০ লাখ, এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। ব্যবহারকারী বাড়ায় নির্বাচনে অনলাইন ও সোস্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

এ ব্যাপারে কথা বলেছি বাংলাদেশের মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমের অন্যতম প্রবক্তা আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। যিনি বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আজ থেকে এক যুগ আগে আমরা অনলাইন সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজ দৃশ্যপট অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনলাইন সাংবাদিকতা ভার্চুয়াল টেক্সট নির্ভর-ই নয় কেবল, মাল্টিমিডিয়াই এখন সাংবাদিকতার প্রাণ। ডিজিটাল সাংবাদিকতার প্রসারের কারণে এখন নির্বাচনের মতো বড় বড় ইভেন্ট জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে। মাল্টিমিডিয়ার প্রসারের কারণে সংবাদ পরিবেশন, সংবাদের পাঠকপ্রিয়তা এবং আলোচিত সংবাদ ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে বহুগুণ।

আলমগীর হোসেনের কথাগুলোর প্রতিধ্বনি ফুটে উঠেছে সোস্যাল মিডিয়ায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচলিত ধারার মিছিল, মিটিং, শোভাযাত্রা, পোস্টার ও প্রচারপত্রের পাশাপাশি ডিজিটাল ঢেউ তৈরি হয়েছে। সরকারি দলের মূল ‘ফোকাস’ ছিল বিগত দশ বছরের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ছিল তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চমকে যাওয়া সব প্রচারণা। আবার বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে ছিল দশ বছরের সরকারি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বক্তব্য। এবার আলোচনায় এসেছে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের অনলাইন অংশগ্রহণ। যিনি দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লন্ডন থেকে, স্কাইপিতে৷ যদিও ফেসবুক লাইভে এসেও তিনি নেতা-কর্মীদের নির্বাচনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে৷

সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিই মূলত ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন এবার। ছিলেন ইউটিউবের প্রচারণায়। সাদামাটা চোখে প্রচারণায় সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেখা গেছে ফেসবুকে। নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতার বেশ আগে থেকেই সরকারি দল আওয়ামী লীগ ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে প্রচারণা চালিয়েছে। গত নভেম্বর মাস থেকে #ThankYouPM নামে টিভি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি বেশ পরিকল্পনা নিয়েই ডিজিটাল প্রচারণার মাঠে নামে সরকার। শেখ হাসিনার ব্যক্তিজীবন নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারিও এই ভরা নির্বাচনি মৌসুমে প্রচারণার অংশ হয়ে যায়।

জনপরিসরে রাজনৈতিক অবস্থান শূন্যের কোটায় হলেও বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী জোনায়েদ সাকির কোদাল প্রতীকে ফেসবুক বক্তৃতা আকর্ষণ করেছে অনেককে। তাঁর রাজনৈতিক দল ‘গণসংহতি আন্দোলন’ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে চালিয়েছে নির্বাচনি প্রচারণা। যেখানে গণসংযোগের নিয়মিত স্থির চিত্রে সাকি-ই ছিলেন মূল ‘ফোকাস’।

খেয়াল করছি, প্রচারণার সনাতন ধাঁচের সমাজ থেকে অন্তর্জাল ভিত্তিক সমাজে প্রবেশের উত্তরণ সময়ে সাংবাদিকতার মুখ্য বিষয়াদি আমূল বদলে যাচ্ছে। সাংবাদিকতায় কেবল এতদিন আমরা সংবাদ, ছবি ও ফিচারকেই জানতাম। এখন সংবাদ ও ছবি ছাড়াও অডিও, ভিডিও মাধ্যমের যুথবদ্ধতায় মাল্টিমিডিয়া ইন্টারএ্যাকটিভিটি বেড়ে গেছে। একাদশ নির্বাচন বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক প্রচারণায় ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরিতে ভূমিকা রাখেছে। ডিজিটাল সাংবাদিকতার মাধ্যমে এই নির্বাচনি প্রচারণার ফলে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় ব্যাপক বদলে দিয়েছে। যেখানে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে তথ্য সংগ্রহ করে ঘটনাস্থল থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সম্পাদনা করে প্রকাশ করা যায়। একটি মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন আর কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি, মুহূর্তেই ছড়িয়ে দেয়ার চটজলদি ব্যবস্থা। অপেক্ষাকৃত কম প্রতিবন্ধকতা, স্বল্পব্যয় ও বহুমুখী কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির বদৌলতে ডিজিটাল সাংবাদিকতার এই ব্যবহার বাড়ছে।

অনলাইন সংবাদ সংস্থা বাংলা ট্রিবিউন জানাচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৫ লাখ বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এদের মধ্যে ৮ কোটি ৪৭ লাখ মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী এবং বাকি ৮৩ হাজার ওয়াইম্যাক্স ব্যবহারকারী (২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮)। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পক্ষকালব্যাপী ভোটের প্রচার-প্রচারণায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও ব্যক্তি স্ব-স্ব বক্তব্য নিয়ে সরব থেকেছেন। এই নির্বাচনি প্রচারণার মাল্টিমিডিয়া ধরন-ধারণ আমাদেরকে নতুন এক তথ্য বিপ্লবের লক্ষণরেখা দেখিয়ে দিল; তা হলো মাল্টিমিডিয়া সোসাইটি। পদ্ধতিগতভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় একটি নীরব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কাগজ এবং টেলিভিশন দুই ধারার সাংবাদিকতাই এখন অনলাইনে হাজিরা দিতে বাধ্য হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সাংবাদিকতার প্রযুক্তিগত, প্রথাগত সব ধারণা নবায়নের সময় এসেছে। শুধু নবায়ন নয়, বাতিলও করে দিতে হবে বহুকিছু। এমন একটি দিন আসছে সামনে, একজন সাংবাদিককে দৃশ্য-শ্রাব্য-কথ্য-লেখ্য চার মাধ্যমেই সচল থাকতে হবে। যার নাম বহুমাধ্যম সাংবাদিকতা বা ‘মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম। একে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, কারণ এটি আপনার জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকবে।

একসময়ের দুর্দান্ত জনপ্রিয় সব সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, বিদায় নিয়েছে পরম মমতায় হাতের আলতো ছোঁয়ার ‘মব’ ঘোরানো রেডিও, ব্যস্ত মানুষ এখন টেলিভিশন দেখে না, কেবল ‘চোখ রাখে’, কাগজের পত্রিকাও যায় যায় করছে। সব মিডিয়া ঘরে আসবে— সব মাধ্যম— ফুরাবে সব লেনদেন; থাকবে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরামর্শক, জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...