মূক মুখের স্বর আইয়ুব বাচ্চু

বিশেষ প্রতিবেদন

0

দুর্গাপূজার নবমীর ঢাকের আওয়াজ মিইয়ে গেল বাংলার সুরের আকাশ থেকে এক মহাতারকার পতনে।  বাংলা ব্যান্ডের উন্মাতাল তারুণ্যদীপ্ত শ্রোতারা নিজের ‘স্বর’ খুঁজে পেত যে কণ্ঠে, সেই ‘স্বর’ আজ শোকের ‘সুর’। নিজের ‘রূপালী গিটার ফেলে’ মহাপ্রস্থানে গেলেন নব্বই পরবর্তী বাংলা ব্যান্ডের মহানায়ক ও উপমহাদেশের ঈর্ষণীয় গিটারবাদক আইয়ুব বাচ্চু। পড়ুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজীব নন্দী’র বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদন-

বাংলা পপগানের প্রধান বৈশিষ্ট্য গতি। সুর সেখানে গৌন, মুখ্য হলো বাদ্যের ঝনঝনানি। বাংলা গানের কোমল-শাস্ত্রীয়ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারাটির প্রতিনিধি আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর প্রতিটি গানের ভাষার সঙ্গে বাদ্যের মিলন যুথবদ্ধ; যাকে বলে সুরে-স্বরে।  ৫৬ বছরের এই গিটার মাস্টার স্বর ও বাদ্যের মালা গাঁথা একদল শ্রোতা উপহার দিয়েছেন আমাদের।

নব্বই পরবর্তী বাংলা ব্যান্ড আমাদের ঘুণেধরা সমাজকে উঠে দাঁড়াবার তাগাদা দিলেও বাচ্চু তেমনটি নন। তিনি শ্রেণী বিন্যাসের প্রশ্ন তুলে সংগ্রামের কথা বলেননি। একান্তই ব্যক্তির পতন আর ব্যক্তির অর্জনই তার কাছে মুখ্য। বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলা’ হওয়ার আগেই তিনি এনালগ তারুণ্যকে কাঁপিয়েছেন।  তাঁর অমর সৃষ্টি ‘রূপালী গিটার’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘সেই তুমি’, ‘সে তারা ভরা রাতে’ আর ‘সুখের পৃথিবী’। তিনি এমন এক গায়ক, যিনি ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ গাওয়ার পরে ‘মেয়ে’কে দেখে গাইতেন ‘আমি বারো মাস তোমার আশাই আছি’!

রাজনৈতিক নেতার পর মানুষের মনে ঠাঁই করে নেয় তাঁর প্রিয় শিল্পী। সেই হিসেবে বাচ্চুর নাম-নিশানা বাঙালি হৃদয়ে আরো বহুবছর দাগ কাটা থাকবে। বাচ্চুর একেকটি গান তারুণ্যের মনের কথা বলতো। বলতো হৃদয়ভাঙা তারুণ্যের বেদনার কথা।  নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে বয়সন্ধিকালে যে কিশোরটি তার প্রেমিকা হারানোর শোকে মূক হতো, সেই মূক মুখের সুর ও স্বর আইয়ুব বাচ্চু। যিনি মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগের অজস্র বেদনাকাব্য গেয়ছেন মঞ্চ থেকে মঞ্চে। তিনি ক্লান্ত তরুণের প্রস্থানপর্ব রচনায় গন্তব্য ঠিক দেন ‘রূপালী গিটার’র মতো প্রিয় সঙ্গীকে ফেলে একদিন সবাইকে চলেই যেতে হবে। বেশি বিরক্ত করলে আকাশই হয়ে উঠবে তাঁর উর্ধমহাপ্রস্থানিক গন্তব্য। হ্যাঁ, সেই তিনি কথা রাখলেন। বৃহস্পতিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে মৃত্যু হয়েছে বাংলা ব্যান্ডের এই মহাতারকার। যিনি সুর ও স্বর দিয়ে দুই বাংলা মাতিয়েছেন সারাটি জীবন।

গিটারের তারে আঙ্গুল ছোঁয়ালেই সুর উঠতো, সুর উঠলেই যিনি হয়ে উঠতেন অন্য এক মানুষ। মাথার উপর রোদ থাকুক বা নাই থাকুক, চোখে থাকত তাঁর কালো চশমা। গায়ে কালো টিশার্ট, মাথায় পশ্চিমা টুপি, কালো জিন্স প্যান্টের অনন্য এক ব্র্যান্ড তিনি। বাংলার বেকার-বাংলার হতাশ-বাংলার ক্ষোভ-বাংলার ক্ষুধা আর বাংলার না-পাওয়ার বেদনাকাতর লাখো তারুণ্যের সামনে তিনি দিতেন পালানোর আয়োজন। গণসমাজের অবধারিত পরিণতি গণবিচ্ছিন্নতা। তাঁর সুরেই তিনি রেখে গেছেন সেই প্রমাণ।  গণসমাজের ‘সেই তুমি’ সারাজীবন অচেনাই থেকে যায়। আজ থেকে ২৫ বছর আগে মালিবাগের বাড়িতে বসে যখন লিখছেন তিনি এই গান, হয়ত জানতেন না, এতটা জনপ্রিয় হবে। ‘হাসতে দেখে, গাইতে দেখে’ নব্বইয়ের পরবর্তী বিচ্ছেদী তারুণ্যের মুখে মুখে, স্বরে স্বরে গোটা বাংলা মেতেছে বাচ্চুর সৃষ্ট ‘পপ কালচার’-এ। জনপ্রিয় সংস্কৃতির শক্তিই তো এটি।  পরিবর্তনের হাওয়া নিয়ে না আসলেও যুগের অন্য এক হাওয়া নিয়ে আসে এই শক্তি। এনালগ তারুণ্যকে ‘স্থবির যুগ’ থেকে গতিশীল তারুণ্যের দিকে ধাবিত করেন তিনি; সুরের টানে, বাদ্যের আহ্বানে।

তার শ্রোতার দেহ আর মন দুটোই দুলে ওঠে সুরের ঝঙ্কারে। লাখো স্বরের সাথে প্রতিধ্বনিত হয়ে তার স্বর বাঁধনহারা হতে চায়।  শত শত বিষণ্ন তারুণ্য দু-দণ্ড শান্তি খুঁজে পায় বাচ্চুর আলো-আঁধারি পপোৎসবে। বাংলার তারুণ্য যেন এক বাঁধনহারা সুখকে খুঁজতে চায়। কিন্তু সুখপাখির দেখা না পেলে ‘ফুর্তি’ পরিণত হয় হতাশায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, তার গানের তারুণ্য আসলেই পালাতে চায়! পালানোই আধুনিক গণসমাজের নিয়তি।

সংগীত এক ধরনের শ্রবণযোগ্য কলা যা শব্দ ও নৈঃশব্দের যুথবদ্ধ ধ্বনি। শ্রোতার চিত্তে যার নাম বিনোদন। বাচ্চুর ‘সুখের এই পৃথিবীতে’ সবাই আমরা ‘সুখের অভিনয়’কারী।  যারা নিজেকে ‘আড়ালে’ রাখি, কারণ চাওয়া পাওয়ার জটিল সমীকরণে শ্রোতারা ‘আসলে কেউ সুখী নয়’।  তবুও বাচ্চু বলেন, ‘চলো বদলে যাই’। কিন্তু বদলে যাওয়ার পেছনে তাঁর শর্ত থাকে ‘তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়’! বাচ্চু অনেক রাত কেঁদে কেঁদে জিজ্ঞেস করেন- ‘কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি’? উত্তর না পেয়ে দিয়ে যান ‘চোখের অশ্রু’। সেই অশ্রু যেন ‘গোপন করে’ রাখে, তাও বলতে ভুলেন না। বাচ্চুর ছিল এক ‘ফেরারি মন’ যেটা ‘মানে না কোনো বাধা’; কাউকে ‘পাবারই আশায় ফিরে আসে বারেবার’। এরপরও বাচ্চুর ঘোর-হতাশা ‘বোঝে না আমার কী ব্যথা, চেনার মতো কেউ চিনল না’ তাকে। বাংলার হতাশ তারুণ্যের জীবনে নামা অন্ধকার সমস্ত হিসেব তছনছ করে দেয়। ‘অনেক রাত খোলা আকাশের নিচে জীবনের অনেক আয়োজন’ করে একজন আবেগী রাতের পথিক। যিনি কেবল কষ্ট পেতে ভালোবাসেন। যিনি ‘ভুল করে এই পথে এসে’ কষ্ট পেয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যাখানের ভয়কে উপেক্ষা করে বারবার তিনি ‘ছুটে আসি’ বলতে পারেন। যদিও তখন তাঁর ‘বুকের গভীরে কষ্ট’ অনেক।

রূপালি গিটার তাঁর হাতের স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেতো। সে প্রাণ গান হয়ে সুরের সম্মোহনে ‘দরজার ওপাশে একজন’কে চেনায়, যে ভাবছে ‘সে সুখী’। কিন্তু নিঃসঙ্গতার দুনিয়ায় বাচ্চু গেয়ে উঠে- এসব মিথ্যে আয়োজন। ‘নিজ ভুবনে চিরদুঃখী’ আমরা সকলেই।  এ এমন এক দুঃখী, যিনি শরতের স্নিগ্ধ ঝকঝকে আকাশকেই বেছে নিলেন উর্ধ্বপানে মহাপ্রস্থানের জন্য। যিনি ‘সবাইকে একা করে’ আকাশেই উড়ে গেলেন। যার সঙ্গে ‘এই শহর, গাড়ি-বাড়ি’ কোনোটাই গেল না।

 

রাজীব নন্দী
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। গবেষণায় তাঁর আগ্রহের বিষয় ‘গণসমাজ’। শিক্ষকতায় ‍যুক্ত হওয়ার আগে সাংবাদিকতা করেছেন দেশের দুটি জাতীয় দৈনিকে। শিক্ষকতা ও গবেষণার পাশাপাশি তিনি কনসালটিং এডিটর হিসেবে জয়নিউজবিডি’র সঙ্গে রয়েছেন।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...