এত বেড়ান কিভাবে? আপনার কি ‘অনেক টাকা’?

পাঁচফরেন (পর্ব- ১)

0

বাঙালির পায়ের তলায় শর্ষে।  বাঙালি ছুটি পেলেই ছুটে। ছুটতে গিয়েই ছুটির বাহানা খুঁজে। বেড়ানো অনেকের নেশা। তেমনিই একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ভ্রমণপ্রিয় রাজীব নন্দী।  ১৮ বছর ধরে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া ও ভারত এই পাঁচটি দেশ ঘুরেছেন। পাঁচটি ভিনদেশ ঘুরে ‘পাঁচফরেন’ তাঁর ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী। পড়ুন আজ প্রথম পর্ব।

ইবনে বতুতা বলেছিলেন- ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে।  ইবনে বতুতা সেকালের সুখি মানুষ। আমি এই কালের জনম দুঃখি। লবণ আনতে পান্তা ফুরায়। তবুও ইবনে বতুতার মতো আজ এখানে, কাল ওখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। বছর শেষে দেখি, স্বপ্নের অর্ধেক বাস্তবায়ন হয়। ইবনে বতুতাকে কি বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে সপ্তাহান্তে হাজির হতে হতো? না। বতুতার কি মদনহাটে পেশাজীবনে হাজিরার বাধ্যবাধকতা ছিলো?  না। তবুও বতুতার উৎসাহে ব্যাগ গুছাই। কিন্তু না। কারণ, সুসান হেলার নামের আরেকজন মাথা বিগড়ে দিয়েছেন এই বলে যে, ভ্রমণের আগে আপনার সব জামা কাপড় আর টাকা এক জায়গায় করুন। তারপর সেখান থেকে অধেক কাপড় এবং দ্বিগুন টাকা নিয়ে যাত্রা করুন।

এই তো মুশকিল!

কাপড়-চোপড় না হয় অর্ধেক করা যাবে। কিন্তু, টাকা? টাকা যেখানে জোগাড়ই হয় না, সেখানে দ্বিগুণ করবো কিভাবে?

হ্যাঁ। টাকা দ্বিগুণ করা সত্যিই সহজ। ধরুন, আমার মতো চা, বিড়ি, সিগারেট, পান, বিরিয়ানি খাওয়া বাদ দিলেন। দুই-তিনশ টাকার সেকেণ্ড হ্যান্ড শার্ট ও চারশ’ টাকার মধ্যে পুরাতন প্যান্ট কিনে অন্তত এক বছর কাটান। আত্মীয়দের সাথে আজ এই পার্টি, কাল সেই পার্টি আর খানাপিনা বাদ দিন। বহুমূল্যের খাসীর মাংস বছরখানেক না খান। আমি এই পথেই বছরজুড়ে বেড়ানোর অনেক টাকা বাাঁচাতে পারি। এটা বলতে গেলে আমার পালন করা অনুশাসন।

কারণ, আমি বিশ্বাস করি- অসৎ উপায়ে বা সৎ উপায়ে হউক যেভাবেই মানুষ টাকা কামিয়ে বড়লোক হোক না কেন, সেই টাকা কাজে লাগানো সম্ভব নয়, যদি সে বিনিয়োগ না করে। সে টাকা তেজপাতা ছাড়া কিছুই নয়, অবশ্য এখানে তেজপাতার সুগন্ধকে খাটো করা হচ্ছে না! আমার চারপাশে এরকম অনেকেই আছেন যার রয়েছে বান্ডিল বান্ডিল টাকা। বছরে পর বছর, নিতান্ত মূল্যহীন টাকাগুলো সাথে নিয়ে অসুখী জীবন যাপন করছেন। হুট করে একদিন যমরাজ এসে বলবে- চল। শত আবদারেও কি তখন সম্ভব জমানো টাকার একটা পয়সাও সাথে নিয়ে যাওয়া?

কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনের পথে। বন্ধুদের সাথে লেখক

আমি হিসেব করে দেখলাম, সারা বছর কিছুটা কৃপণতা করে চললে পুরো এক মাস চমৎকারভাবে নেপাল-ভূটান-ভারত ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। এইসব সাশ্রয়ী সিদ্ধান্তের ফলে গত এক বছরে দারুণভাবে উপকার পেয়েছি আমি। যেমন, আমার  নিকটাত্মীয় জ্ঞাতির মৃত্যুতে শাস্ত্রীয় অনুশাসনে ১৫ দিন নিরামিষ খেয়ে বাঁচিয়েছি অনেক টাকা। স্বল্পাহারে তখন শরীরও তখন ফিট!

ধরুন, আপনি খরচ বাঁচাতে পারেন ঘরের বানানো খাবার খেয়ে। টিফিন বক্সে করে বেশ কিছুদিন খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম কর্মস্থলে। আমি দেখেছি, অনেকেই লজ্জায় বাসা থেকে খাবার আনেন না। অথচ এই অভ্যাসটি আপনার স্বাস্থ্যকর খাওয়া এবং টাকা বাঁচানো উভয় ক্ষেত্রে দরকার। আবার ধরুন, ভালো মানের গবেষণা করলেন। তখন পাবেন বিদেশে যাতায়াত খরচের স্পন্সরও! এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষত ভারতে সারা বছরই আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন হয়। কনফারেন্সের পাশাপাশি ভিনদেশ ঘুরে নানান বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা কোন ব্যাপারই নয়।

পরিবার ও বন্ধুদের সাথে মালয়েশিয়ার বতু কেভসে

লিন ইউতাং বলেছেন, ভ্রমণ শেষে নিজ বাড়িতে ফেরার আগ পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারে না ভ্রমণ কত সুন্দর ছিল। হ্যাঁ। যে মুভি দুটি দেখে আমার মধ্যে ভ্রমণের নেশা চেপেছিলো তার প্রসঙ্গে দু চারটি কথা বলি। আমার মালায়ালাম সিনেমা প্রেমের কথা চারপাশের কয়েকজন বন্ধু জানেন। তেমনি একটি প্রিয় সিনেমা- নীল আকাশম পাচাকাড্ডাল চুভান্না ভূমি।মুভিটি একবার দেখুন। দেখবেন, দুই বন্ধু ভারতের ব্যাঙ্গালুরু, পুরী, কলকাতা হয়ে নাগাল্যান্ড চষে বেড়াচ্ছে। নিজের নিজের মোটর বাইকে। এই রোডশো মুভিটি তলে তলে একটা নিখাদ প্রেমের ছবি, বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছবি, নকশাল তথা বামধারার ছবি। এটি ভারতমাতার প্রকৃতিকে ভালোবাসার ছবি এবং ক্যাম্পাস রাজনীতিরও ছবি। নানান বিষয় ও বহুবৈচিত্র্যে ভরপুর এমন একটা ছবি বারবার দেখেও পরের বার দেখতে ইচ্ছে করে। সুতরাং কোথাও বেড়াতে গেলে নিজের বাহন ভ্রমণ ব্যয় কমিয়ে অর্ধেক করে দিতে পারে।

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন

গুস্তাভ ফ্লুবেয়ারের মতে- ভ্রমণ মানুষকে বিনয়ী করে তোলে। সে জানতে পারে দুনিয়ার তুলনায় সে কত ক্ষুদ্র। এই অমোঘ বাণীর সার্থকতা খুঁজে পাবেন আরেকটি সিনেমাতে। বন্ধুত্ব, ভ্রমণ, লাতিন আমেরিকা আর একজন চিকিৎসকের গল্প। বিশ্বখ্যাত একজন ভ্রমণপ্রিয়-মানবিক মানুষের জীবনী জানতে হলে দেখতে হবে মোটরসাইকেল ডাইরিজ সিনেমা! যদিও খেয়াল করা যায় যে, এই সিনেমায় চে’র বিপ্লবী রাজনৈতিক ইমেজের চাইতেও ভ্রমণকাতর মানবিক মানুষী ইমেজকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তো বলেছেনই- যাকে তুমি ভালবাসো না তার সাথে কখন ভ্রমণ করো না। সুতরাং আপনার ভ্রমণব্যয় কতটুকু কমছে সেটা নির্ভর করছে আপনার সাথে কে বা কারা তাদের ওপর।

সুইডেনের ইয়ংশেপিংয়ের লেক ভেতারেনের পাড়ে

আমি মনে করি, জীবনী-শক্তি থাকতে থাকতেই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ঘুরে নেয়া দরকার। নইলে শেষ জীবনে হার্ট ও ডায়াবেটিসের ডাক্তার আপনার সারা জীবনের সঞ্চয়ে নিষ্ঠুর ভাগ বসাবে। টাকা আসবে টাকা যাবে, কিন্তু সময় গেলে আর ফিরে আসবে না। এরজন্য চাই, টাকার ব্যবহার জানা। কোন টাকা, কতটা টাকা কী কাজে লাগাবেন? অর্থশাস্ত্র অবশ্য বলে, টাকায় টাকা বাড়ে। কিন্তু আমার মতো অনর্থশাস্ত্রীয়র মতে– ‘টাকা খাটাতে জানতে হয়‘।

  • রাজীব নন্দী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক। শিক্ষকতা-গবেষণার পাশাপাশি ভ্রমণ তাঁর আগ্রহের বিষয়।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...