সন্দ্বীপে বড় দু’দলেই কোন্দল

চট্টগ্রাম-৩

0

সমুদ্র-কন্যা সন্দ্বীপ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা। এটি বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন একটি দ্বীপ। বিগত কোরবানির ঈদের পর সন্দ্বীপের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু নতুন মেরুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সর্বত্র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা কানাঘুষা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। নৌকার মালিক যিনিই হন শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে সকলেই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন এ রকম কথাই শোনা যাচ্ছে। এর বিপরীতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত বিএনপিও। জয়নিউজের বিশেষ নির্বাচনী সংবাদ আয়োজনে আজ পড়ুন সন্দ্বীপ প্রতিনিধি ইলিয়াস কামাল বাবু’র প্রতিবেদন

কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আসছে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অন্যান্য স্থানের মত দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপের রাজনৈতিক ময়দান সরগরম হয়ে উঠছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি মনোনয়নকে ঘিরে দু’দলে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। মাঠে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের অনুগতদের মধ্যে মারামারি-হানাহানিতে বিগত বছরগুলোতে প্রাণ হারিয়েছে তিন-চার জন কর্মী, আহত হয়েছে অনেকে। দলীয় গ্রুপিং এর কারণে থানায় জমা হয়েছে অনেক মামলা।

এদিকে প্রকাশ্যে মারামারির ঘটনা না ঘটলেও দলীয় আধিপাত্য ধরে রাখতে বিএনপি’র দু’গ্রুপের মাঝে চলছে সম্পর্কের ঠান্ডা লড়াই। কিন্তু বিএনপি বলে কথা। এ নির্বাচনে জামায়াত হয়তো কোন প্রার্থী দেবে না তাই যদি বিএনপি-জামায়াত জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় এবং নির্বাচনী মাঠ যদি সকল প্রার্থীর জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ থাকে এবং ভোটাররা যদি স্বত:স্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বিনা বাধায় ভোট দিতে পারে সেই ক্ষেত্রে অনেক হিসেবে-নিকেশ উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। বিগত নির্বাচনে দেখা গিয়েছে বিএনপি’র অভ্যন্তরে যতই দ্বন্দ্ব থাকুক নির্বাচন এলেই তারা ধানের শীষের বিপরীতে অবস্থান না নিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়।

বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনা মোহনায় জেগে ওঠা দ্বীপটির একটি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-৩ সংসদীয় আসন গঠিত। ২০১১ সনের আদমশুমারি মতে সন্দ্বীপের মোট জনসংখ্যা ছিল মোট ২৭ লক্ষ আট হাজার ছয়শ’পাঁচ জন,  তন্মধ্যে পুরুষ ১২ লক্ষ আট হাজার ছয়শ’৫৬ জন এবং মহিলা ১৪ লক্ষ নয় হাজার ৪৯ জন।

নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, এখানকার মোট ভোটার ২০ লক্ষ তিন হাজার দুইশ’ ৮৫ জন, তার মধ্যে পুরুষ ১০ লক্ষ আটশ’৫৮ জন এবং মহিলা ১০ লক্ষ দুই হাজার চারশ’২৭ জন। বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দু’বার সংসদ সদস্য বিজয়ী আওয়ামী লীগের সাবেক  এমপি দ্বীপবন্ধু মুস্তাফিজুর রহমানের পুত্র রূপালী লাইফ ইন্সুরেন্সের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান মিতা। এবারও মনোনয়ন প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি আশাবাদী। স্থানীয় কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিগুলো প্রায় তার অনুগতদের নিয়ে গঠিত। বিগত সাড়ে তিন বছরে তার প্রচেষ্টায় রাস্তা-ঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক  উন্নয়ন ছাড়াও তিন শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সারা সন্দ্বীপে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ, দুই শ’ ৪০ কোটি টাকায় বেড়িবাঁধ উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেটি নির্মাণ প্রকল্পগুলোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি আশাবাদী, মনোনয়ন পেলে পিতার জনপ্রিয়তা আর এ মেয়াদে তার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা বিবেচনা করে সন্দ্বীপবাসী তাকে আবার ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে গত এক বছর ধরে দ্বীপের আনাচে-কাঁনাচে চষে বেড়িয়ে  সাধারণ ভোটারদের সাথে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীর তালিকায় আরো রয়েছেন পর পর দু’বারের নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাস্টার শাহজাহান। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির কান্ডারী হিসেবে পরিচিত এ প্রবীণ নেতার সাথে রয়েছেন উপজেলা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কমিটির বেশীর ভাগ নেতা-কর্মী। বেশীর ভাগ ইউপি চেয়ারম্যানও তার অনুগত। এছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুব-ক্রীড়া সম্পাদক মেয়র জাফর উল্যা টিটু বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণের সক্ষম হয়েছেন। তিনি এবার মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি এ কারণে বর্তমান সংসদ সদস্যের রোষানলে পড়ে ১১মার্চ অনুগত কাউন্সিলর ও সমর্থিত নেতা-কর্মীদের নিয়ে এলাকাছাড়া হয়ে দীর্ঘদিন এলাকার বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, দীর্ঘ সময় উন্নয়ন ও ভালবাসার মাধ্যমে সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছি, প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নানা কল্পকাহিনী সাজিয়ে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য অনেকে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্বাচিপ নেতা ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ডা. জামাল উদ্দিনও নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষদের সাথে যোগাযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করছেন। তিনিও এলাকায় বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকান্ড করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া সাবেক এমপি ওবায়দুল হকের পুত্র চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র পরিচালক সারওয়ার হাসান জামিল শামীম, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ সদস্য আওয়ামী লীগের প্রয়াত জেলা নেতা আকরাম খান দুলালের ছেলে শিল্পপতি আফতাব খান অমি, যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান চেয়ারম্যান ও ক্রীড়া সংগঠক হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু, উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাজিবুল আহসান সুমনসহ ইউরোপ-আমেরিকায় অবস্থানরত সন্দ্বীপের অনেক প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

সারাদেশে আওয়ামী লীগের জয়-জয়াকারের মধ্যেও ২০১০ সালে সন্দ্বীপ আসনে তৃতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল পাশা। এবারও তিনি মনোনয়ন পেতে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে তার অনুসারীরা একরকম নিশ্চিত যে সন্দ্বীপের বিএনপি’তে তার বিকল্প কেউ নেই এবং বিএনপি থেকে তিনি নমিনেশন পাবেন। তার সাথে বিএনপির উত্তর জেলা নেতা বেলায়েতসহ সন্দ্বীপ বিএনপির প্রবীণ নেতা-কর্মী ও মাঠ পর্যায়ের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছেন। কিন্তু মূলত এক/এগারো’র জরুরি অবস্থা পরবর্তী মোস্তফা কামাল পাশাকে চ্যালেঞ্জ করে জেলা নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুগত হিসেবে স্থানীয় বিএনপি’র একটি অংশ প্রকাশ্যে তার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী নুরুল মোস্তফা খোকন ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশ বজায় থাকায় সন্দ্বীপে বিএনপি’র উভয় গ্রুপের সাংগঠনিক কার্যক্রম খুবই সীমিত। জাতীয় পার্টি পৃথক নির্বাচন করলে উপজেলা জাপা সভাপতি এমএ সালাম এবারও মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছেন। এছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন থেকে মাওলানা মনছুরুল হক জেহাদীও হাতপাখা মার্কায় নির্বাচন করার জন্যে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

 

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...