আ’লীগ-বিএনপিতে অস্থিরতা, সুযোগের অপেক্ষায় জাপা

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর)

0

লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের মনোনয়ন সামনে রেখে নানামুখী দ্বন্দ্বে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রত্যেকেই নিজেকে যোগ্য মনে করায় বিএনপিতে চলছে অঘোষিত লড়াই। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাইছেন না।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। অভিন্ন অবস্থা বিএনপিতেও। তাদেরও রয়েছে পরষ্পরবিরোধী দুটি গ্রুপ। তারা প্রকাশে প্রচারণায় না নামলেও গোপনে আগাম প্রচার চালাচ্ছেন একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী।

এবার স্থানীয়ভাবে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। জোটগত কারণে দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আসনটি জাপাকে ছেড়ে দিয়েছিল। তখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হন জেলা জাপা সভাপতি মোহাম্মদ নোমান। তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উপদেষ্টাও। এবারও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভয় আছে। যদি মহাজোট বা গতবারের মতো কোনো ধরনের সমঝোতা হয় তাহলে আসনটি আবারও জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। আর জাপা এ সুযোগটিরই অপেক্ষায় রয়েছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

একটি পৌরসভা, ১০টি ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার আংশিক ৯ ইউনিয়নসহ ১৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনটি। এ আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৯ হাজার ২০৫ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৬ হাজার ২১৯ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৮৬ জন।

সূত্র জানায়, নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ উল্লাহ। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু তখন বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারুনুর রশিদ। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া আসনে বিজয়ী হন জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া।

২০০৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি জয়ী হয়। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। তখন আওয়ামী লীগের টিকিট পান ডা. এহসানুল কবির জগলুল। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক। পরে অবশ্য জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। দলীয় সিদ্ধান্তে জগলুল মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টি নেতা মোহাম্মদ নোমান।

অপরদিকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি ‘খালেদার ঘর’ হিসেবেই পরিচিত। কারণ এ আসন থেকে খালেদা জিয়া দু’বার নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু খালেদার সেই ঘরেই বিএনপি এখন ছত্রভঙ্গ। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গাছাড়া মনোভাব আর একঘেয়ে সিদ্ধান্তের কারণে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম। এরপরও বিএনপির টার্গেট হারানো আসনটি পুনরুদ্ধার করা।

এদিকে আওয়ামী লীগ এবার স্থানীয়ভাবে জাপাকে ছাড় দিতে নারাজ। জোটগত কারণে দশম সংসদ নির্বাচনে জাপাকে ছাড় দিলেও আসনটিতে এবার নিজেদের শক্তিশালী মনে করে আওয়ামী লীগ। তবে নির্বাচনি জোট হলে এই আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত থাকবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আওয়ামী লীগ
এ আসনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত রায়পুর থেকেই নিয়ন্ত্রণ হয়। বর্তমানে এখানে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। রায়পুর উপজেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খোকন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবুল পাঠান ও পৌর কমিটির আহ্বায়ক জামশেদ কবির বাক্কি বিল্লাহ্র ব্যক্তিগত অফিসকেন্দ্রিক রাজনীতি চলছে। নেতা-কর্মীরা একজনের ব্যক্তিগত অফিসে গেলে অন্য জন সেটি ভালোভাবে নেন না।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, জ্যেষ্ঠ নেতাদের মুখে ঐক্যের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তাঁদের মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি কাজের জন্য ডাকা দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও কাজ ভাগ-বাটোয়ারায় তাঁরা এক। পছন্দের নেতার অনুসারী হয়ে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতারা নিজেদের মতো করে ‘ভাই জিন্দাবাদ’ বলে ‘হাসিখুশির রাজনীতি’ করছেন।

২০০৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ৬৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এবং ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর পৌর আওয়ামী লীগের ২৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও রহস্যজনক কারণে সম্মেলন হয়নি। সর্বশেষ গত ৩০ জুন পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিন ঠিক করেন দলের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন। ১২ মে অনুষ্ঠিত পৌর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি সম্মেলনের দিন ঠিক করেন। তবে পরে জেলা কমিটির সভাপতি গোলাম ফারুক টিংকু চিঠি দিয়ে সম্মেলন না করতে বলেন।

এদিকে দলের বর্ষীয়ান রাজনীতিককে টেক্কা দিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হারুনুর রশিদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সহসভাপতি এহসানুল কবির জগলুল, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. আলী খোকন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী এবং সাবেক রায়পুর উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহ্্ উদ্দিন রিগ্যান।

তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভোটারদের আস্থা অর্জনে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প এবং ওষুধ বিতরণ কর্মসূচি পালন করে আসছেন এহসানুল কবির জগলুল। তিনি জয়নিউজকে বলেন, ছাত্রলীগের মাধ্যমে আমার রাজনীতি শুরু। এরপর পেশাজীবী সংগঠন এবং সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। এলাকার দেড় শতাধিক ছেলে-মেয়েকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস রাখছি। আমি নির্বাচিত হলে সারাদেশের মধ্যে এ আসনকে মডেল এবং আদর্শ এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবো। বেকার যুবকদের সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে চাকরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলাকায় শিল্প-কারখানা করবো।

নূরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগ এখন সুসংগঠিত। আগামী নির্বাচনে জেলার চারটি আসনেই দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে পরিকল্পনা অনুযায়ী সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে দলের নেতাকর্মী ও জনগণের অনুরোধে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে আমি নিজেও কাজ করছি।

মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে হামলা-মামলা করে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হয়রানি করেছে। তখন আওয়ামী লীগের একজন নেতাও তাদের পাশে দাঁড়াননি। তাঁরা এলাকায়ও ছিলেন না। আমি নেতাকর্মীদের সাহায্য-সহযোগিতা করে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি উপহার দিতে পারব।

সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদ বলেন, আওয়ামী লীগের এই নয় বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে স্বাধীনতার পর এত বেশি উন্নয়ন আর হয়নি। নেত্রী যাঁকেই মনোনয়ন দেন, আমরা তাঁর হয়ে কাজ করব। আমি এমপি থাকাকালে যে অবদান রেখেছি এবং দলের জন্য কাজ করে যাচ্ছি সে কারণে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে মনে করছি।

শামছুল ইসলাম পাটওয়ারী বলেন, এলাকায় উন্নয়ন ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য আমি মনোনয়ন চাইব। দল ও জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। ছাত্রজীবন থেকে শেখ হাসিনার নির্দেশে সব আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে আছি।

এছাড়া সম্প্রতি কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী বাংলাদেশ-কমিউনিটি কুয়েতের সভাপতি ও কুয়েতের বঙ্গবন্ধু স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এনআরবি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল, বাশমী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুল বাকিন ভূঁইয়া ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাহ উদ্দিন রিগ্যান পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ।

কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল বলেন, আমি মানবসেবার রাজনীতি করি। নিতে নয়, দিতে এসেছি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাজ করছি। কাজ করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় সহযোগিতার সৈনিক হিসেবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দিলে নৌকাকে বিজয়ী করবো। নৌকার প্রার্থী যেই হোক দলীয় সভানেত্রীর সিদ্ধান্তকেই সম্মান দেবো এবং নৌকাকে বিজয়ী করতে সহায়তা করবো।

বিএনপি
জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা মাঠ কাঁপালেও হামলা-মামলা ও পুলিশের হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নেই বিএনপির। যদিও এ আসনে দলের প্রতি নীরব জনসমর্থন রয়েছে বলে দাবি বিএনপির।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে মান-অভিমান এবং বিভক্তি রয়েছে। এতে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম। দল ক্ষমতায় থাকার সময় সুফল ভোগ করা নেতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা। একসময়ের জনপ্রিয় নেতাদের রাজনীতিতে কোণঠাসা করে রাখার কারণে তৃণমূলে ক্ষোভ রয়েছে।

এ অবস্থায় আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির টিকিট চান জেলা কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের ভূঁইয়া ও খালেদা জিয়ার সাবেক প্রধান নিরাপত্তা সমন্বয়কারী কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদ।

সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, জেলা ও উপজেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও পুলিশ আমাদের নেতাকর্মীদের হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। তারা আমাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠান করতেও বাধা দিচ্ছে। শান্তিপূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জেলার চারটি আসনেই বিএনপিকে বিজয়ী করবে জনগণ।

জাপা
নির্বাচনি মাঠে রয়েছে জাপাও। সাংসদ মোহাম্মদ নোমান জয়নিউজকে বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আমার সততা দিয়ে দল-মত নির্বিশেষে জনগণের সমঅধিকার নিশ্চিত করে জনসমর্থন তৈরি করেছি। নিজে যেমন চাঁদাবাজি করিনি, তেমনি কোনো চাঁদাবাজও সৃষ্টি করিনি। জনগণ আমার সঙ্গে আছে, তারাই আমাকে বিজয়ী করবে।

এছাড়া জাপা থেকে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ মোহাম্মদ ফায়িজ উল্যাহ্ শিপন জোটগত মনোয়ন পেতে নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যানার-পোস্টার লাগিয়ে সরকারের সাফল্য প্রচার করছেন। তিনি জয়রিনউজকে বলেন, আমি কখনো ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি সেবায় বিশ্বাস করি। আমি আমার ক্ষুদ্র চেষ্টা থেকে এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করি। তাই আমি আমার মতো করে কাজ করে যাই। জনগণের ভালোবাসা আমার সঙ্গে আছে। অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। আগামী নির্বাচনে জোট থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হলে লক্ষ্মীপুর-২ রায়পুর আসনকে দেশের মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছে আছে।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...