বীরের রাজ্যে বিভীষণ, বিএনপিতেও

সংসদীয় আসন ৩০০ (বান্দরবান)

0

পাহাড়ে জাতীয় নির্বাচন মানেই আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির লড়াই। এর ব্যতিক্রম নয় ৩০০ নম্বর সংসদীয় আসন বান্দরবান। গত পাঁচটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে এ আসনের ‘বীর’ সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিং। বিভীষণের বিভীষিকা দূর হলে ষষ্ঠ বারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হবেন বলেই বিশ্বাস বীরের কর্মী-সমর্থকদের। ঘরের শত্রু বিভীষণের বিভীষিকা রয়েছে বিএনপিতেও। মাঠে যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মাম্যাচিং! অপরদিকে পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকারে এ আসনে চমক দেওয়ার প্রতীক্ষায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই জমজমাট রূপ পাচ্ছে ৩০০ নম্বর সংসদীয় আসন বান্দরবান। দলের বিভিন কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠান এবং সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবের আড়ালে প্রচারণা চালাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

এ আসনে গত পাঁচটি নির্বাচনেই (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪) জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিং। যদিও এ আসনটিতে ঘরের শত্রু বিভীষণরা বড় একটা ফ্যাক্টর।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মাম্যাচিং (ধানের শীষ) পরাজিত হন মাত্র ৮৫৩ ভোটে। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী (সাচিং প্রু জেরী) পান প্রায় ১৪ হাজার ভোট! সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা পেয়েছিলেন ৩৩ হাজার ভোট!

তবে দীর্ঘ ২৫ বছর একটানা সংসদ সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিং। এ সময়ে তিনি বান্দরবানের সাত উপজেলায় ব্যাপক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করেন। তাঁর হাত ধরেই এ অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়।

সূত্রমতে, আগামী নির্বাচনেও এ আসনে মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। যদিও আগামী নির্বাচনে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ আলাদাভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ইতোমধ্যে সংগঠন দুটি প্রার্থীও চূড়ান্ত করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যে কোনো সময় ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জনসংহতি সমিতির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিরোধ প্রভাব ফেলতে পারে ভোটের হিসাবে। এ আসনে জামায়াতের কিছুটা জনসমর্থন থাকলেও জাতীয় পার্টির তাও নেই।

এদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলেই রয়েছে অন্তর্কোন্দল। আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিং’র নাম চূড়ান্ত হলেও বিএনপিতে চলছে টানাপোড়েন। সম্পর্কে মামি-ভাগিনা হলেও রাজপরিবারের সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মাম্যাচিংর বিরোধ দীর্ঘদিনের।

হালে আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দল ছাড়িয়েছে বিএনপিকে। আওয়ামী লীগের একসময়ের দুই কা-ারি বহিষ্কৃত সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবুর রহমান। বীর বাহাদুরের পরে বহিষ্কৃত এই দুই নেতারও সাত উপজেলায় কর্মী-সমর্থক রয়েছে। বহিষ্কৃত এ দুই নেতার মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ঐক্য। দু’জনের মধ্যে যে কোনো একজন আগামী সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি শঙ্কায় ফেলেছে।

অপরদিকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কথা বলে আসনটি ছিনিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস। মাঠে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত পাহাড়ের আরেকটি শক্তিশালী সংগঠন ইউপিডিএফ।

আগামী সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যাও কম নয়। এরমধ্যে আওয়ামীলীগের প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিং ষষ্ঠ বারের মতো আসনটিতে জয় পেতে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে দীর্ঘ সতের বছর ধরে একটানা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে থাকা বহিষ্কৃত নেতা প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা এবং জেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবুর রহমানের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আটঘাট বেঁধে নেমেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাচিং প্রু জেরী এবং জেলা বিএনপির সভাপতি মাম্যাচিং। মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন জেএসএস’র সম্ভাব্য প্রার্থী দু’বারের রুমা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংথোয়াই চিং। প্রচারণায় পিছিয়ে নেই ইউপিডিএফ’র জেলা সমন্বয়ক ছোটন কাান্তি তঞ্চঙ্গ্যা। তবে জাতীয় পার্টির কোনো প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না।

তৎপরতা নেই জামায়াত ইসলামীরও। জেলা জামায়াতের আমীর আব্দুচ সালাম আজাদ বলেন, জোটগতভাবে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষেই আমরা মাঠে নামব। তারপরও দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাচিং প্রু জেরী বলেন, দলের মনোনয়নের ব্যাপারেও আমি আশাবাদি। সাংগঠনিক কর্মকা-ের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। তারপরও বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে কি-না, এর উপরই নির্ভর করবে সবকিছু।

জেলা বিএনপির সভাপতি মাম্যাচিং বলেন, সাংগঠনিকভাবে ঘর গোছানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের প্রধান লক্ষ্য বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারামুক্ত করা। দেশনেত্রীকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।

কোন্দল প্রসঙ্গে মাম্যাচিং বলেন, মানুষ ভুল বারবার করে না। ভাগিনা জেরীও করবে না। দেশনেত্রী ধানের শীষ প্রতীক যাকে দিবেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারো নেই।

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সভাপতি প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, দলের বাইরে থাকলেও রাজনীতির মাঠ ছেড়ে যাইনি কখনো। তৃনমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। গতবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ৩৩ হাজার ভোট পেয়েছি। আগামী সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে সময়মতো সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে নেতৃত্ব সংকটে ভুগছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নাইক্ষ্যংছড়ি এবং আলীকদম উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে স্বজনপ্রীতি করায় আগামী সংসদ নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। নৌকার ভরাডুবি ঠেকাতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি।

তিনি আরো বলেন, তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখনো আমায় ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। তাদের আস্থার প্রতিফলন ঘটাতে আমি মাঠে কাজ করছি। নির্বাচন করবো কি-করবো না, সেটি সময় বলে দিবে।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসলাম বেবী জয়নিউজকে বলেন, বড় দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটায় স্বাভাবিক। নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে এবং থাকবে। তবে সংসদ নির্বাচনে ষষ্ঠবারের মতো নৌকার প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিং’কে নির্বাচিত করতে সবাই একসঙ্গে কাজ করছি। এ বিষয়ে দলের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা ষড়যন্ত্র করবে। কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্রই নৌকার বিজয় আটকাতে পারবে না। বীর বাহাদুর পাহাড়ি-বাঙালি সবার নেতা। এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। বিগত সময়ে মাত্র ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান ছিল। কিন্তু বর্তমানে ২৯টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান রয়েছে। এগুলো আমাদের সাফল্য। এ ধারাবাহিকতায় সংসদ নির্বাচনেও ষষ্ঠবারের মতো নৌকার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।

ইউপিডিএফ জেলা সমন্বয়ক ছোটন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ইউপিডিএফ নির্বাচনমুখী একটি সংগঠন। আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের।

জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কে এস মং মারমা বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে প্রতিহিংসার জবাব দিবে জুম্ম জাতি। পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আগামী সংসদ নির্বাচনে লড়বে জনসংহতি সমিতি। আলাপ-আলোচনা হচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিকভাবে প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নেতাকর্মীরা।

নির্বাচন অফিস জানায়, ৩৩টি ইউনিয়ন, ২টি পৌরসভা এবং ৭টি উপজেলা নিয়ে বান্দরবান ৩০০ নম্বর সংসদীয় আসনের সীমারেখা। এ আসনে ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৩। এরমধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ২৯৪ জন নারী এবং ১ লাখ ২৯ হাজার ১৯৯ জন পুরুষ। সর্বশেষ গতবছরের সেপ্টেম্বরে হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৫৮৬ জন নতুন ভোটার।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...