বিএনপির দুর্গে আ’লীগের ঘাঁটি

লক্ষ্মীপুর সদর-৩

0

লক্ষ্মীপুর-৩ সদর। বিএনপির দুর্গ এখন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। পূর্বের দুর্গ ফেরত পেতে চেষ্টা করছে বিএনপি। অপরদিকে চলমান উন্নয়নকে প্রধান্য দিয়ে আসনটি ধরে রাখতে চাইছে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থায় নির্বাচন ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সন্ত্রাস আর খুনাখুনির জনপদ হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর এখন অনেকটাই শান্ত। শান্ত জনপদে একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আগেভাগেই রাজনীতিকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে যে দলের হোক না কেন, প্রার্থীতায় বিদ্রোহী থাকলে বেকায়দায় পড়তে হবে আসনটি ফিরে পেতে।

একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-৩ সদর আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৯ হাজার ২০৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫২ হাজার ২১৯ জন। নারী ১ লাখ ৫৬ হাজার ৯৮৬ জন। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের শাহজাহান কামাল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৩ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দশম সংসদ ছাড়া বাকি সব নির্বাচনে জয়লাভ করেছে এখানে বিএনপি। এ জন্য এ আসনটিকে বিএনপির দুর্গ বলা হয়। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে পড়েছেন মাঠে।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বেশ কয়েকজন। এর মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার, সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম। নির্বাচনী সভা সমাবেশসহ দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন প্রার্থীরা। চালাচ্ছেন প্রচার-প্রচারণা।

নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ছবিসংবলিত পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকা। আসনটি বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও গত স্থানীয় সরকার ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের।

বর্তমান সাংসদ শাহজাহান কামাল বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় লক্ষ্মীপুরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আমার এলাকায়ই রাস্তা, স্কুল-কলেজসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় প্রায় তিনশ’ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গত ১৪ মার্চ লক্ষ্মীপুরে জনগুরুত্বপূর্ণ যে ২৭টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করেছেন তা বাস্তবায়নে আমি কাজ করছি। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার সরকারের বিকল্প নেই।

নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন গোলাম ফারুক পিংকু। তিনি নিয়মিত ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ ও ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জনগণের কাছে সরকারের সাফল্য তুলে ধরছেন। এ সময় তিনি শেখ হাসিনার জন্য নৌকা প্রতীকে ভোট চান।

পিংকু বলেন, একসময় সন্ত্রাসের জনপদ ছিল লক্ষ্মীপুর। আওয়ামী লীগ সরকারই কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূল করে জনগণকে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ করে দিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন, সাফল্য তুলে ধরে আমি প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি। দলে আমার ত্যাগ ও শ্রমের মূল্যায়ন করে জননেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।

অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার বলেন, আমি আওয়ামী লীগের একজন আদর্শিক কর্মী হয়ে তৃণমূল মানুষের কাছে যাচ্ছি। নেত্রী যদি আমাকে যোগ্য মনে করেন তাহলে মনোনয়ন দেবেন।

সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেম বলেন, শেখ হাসিনার হাত ধরেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমি আগেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছি। নেতাকর্মী ও জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে ছিলাম। আমাকে মনোনয়ন দিলে আসনটি দলকে উপহার দিতে পারব।

অপরদিকে আসনটি পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও দুইবারের নির্বাচিত সাংসদ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ মুহূর্তে দেশনেত্রীর মুক্তির আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তারা।

দলের নেতাকর্মীদের মতে, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। দেশনেত্রীকে মুক্ত করার ব্যাপারে দলীয় কোনো গ্রুপিং নেই দাবি করেন তারা। তবে বড় দল হিসেবে এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ্যানীকে ছাড় দিতে নারাজ জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি এবং পরে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এলাকায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং হামলা-মামলার শিকার নেতাকর্মীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের দল সুসংগঠিত। বিএনপি আন্দোলনের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। এর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তির পরই অধিকার আদায়ের জন্য নির্বাচনমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আমি সব আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়ে আসছি। হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে গুলি করা হয়েছে। তবুও আমি আদর্শচ্যুত হইনি। সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে আমি দলকে সংগঠিত রেখেছি। ত্যাগ ও শ্রমের মূল্যায়ন করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস রাখি।

অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম আর মাসুদ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ( জেএসডি) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

মাসুদ বলেন, দলের দুঃসময়ে ২০০৮ সালে আমি লক্ষ্মীপুর-২ ও ৩ আসনে প্রার্থী ছিলাম। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগত কারণে দলের সিদ্ধান্তে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিই। আমি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রয়েছি।

জেএসডি নেতা সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, জনগণ যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারে সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে। খুনোখুনি আর সন্ত্রাস বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে আমি নির্বাচনে অংশ নেব।

জয়নিউজ/আরসি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...