৩০ হাজারের বরাদ্দ এখন দুই কোটির ঘরে

চবির গবেষণা প্রকল্প

0

১৯৮৮ সালে একটি দফতরের গোটা বছরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১০ হাজার টাকা। ২০১৫ পর্যন্ত এ বরাদ্দ বেড়ে ঠেকেছে ৩০ হাজার টাকায়। এরপর গত ৩ বছরে এ বরাদ্দ তিন দফায় লাফিয়ে হয়েছে ২ কোটি টাকা। বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরের জন্য বরাদ্দের কথা। যে দফতরের জন্য আসবাবপত্র কেনার অর্থ বরাদ্দ ছিল না গত দুই যুগ ধরে, সে দফতরের জন্য এখন হয়েছে নিজস্ব কার্যালয়।

কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে এ দফতরের অর্জনের খাতায়ও যুক্ত হয়েছে সমৃদ্ধির পালক। ২৭ বছরে যে দফতর ২৬০টি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, সে দফতর গত ৩ বছরেই বাস্তবায়ন করেছে ১৯৯টি গবেষণা প্রকল্প!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর্যন্ত গবেষণা দফতরের অর্জন বলতে তেমন কিছু ছিল না। নির্দিষ্ট কোন কার্যালয়ও ছিল না এই দফতরের। অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে শিক্ষকদের আনাগোনা ছিল না তাতে। পাশাপাশি ছিল পরিকল্পনার অভাব। প্রতিষ্ঠাকালীন বছরে মাত্র দশ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল এই দফতরের।

এরপর বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় বিশ হাজার টাকা, পরে আরেক দফা বাড়িয়ে করা হয় ত্রিশ হাজার টাকা। ১০টি আহ্বায়ক কমিটি ২৭ বছর পর্যন্ত টানা এই দফতর পরিচালনা করে। কিন্তু অপ্রতুল এই বরাদ্দ দিয়েই দায়সারাভাবে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে তারা। ফলে বছরে গড়ে গবেষণা প্রবন্ধ জমা হয়েছে দশটিরও কম।

২০১৫ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব নেন প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। দায়িত্ব নিয়েই গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরের দায়িত্ব দেন প্রফেসর ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে। তিনি দায়িত্ব নিয়েই ২৭ বছর ধরে দেওয়া ত্রিশ হাজার টাকার বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করেন।

এরপরের গল্পগুলো বদলে যাওয়ার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ দফতর হয়ে ওঠে গবেষকদের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। কারণ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ১০ লাখ টাকা। প্রতি গবেষণা প্রকল্পের জন্য গবেষকদের দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা করে। ওই অর্থবছরে ২২টি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন হয়।

তারপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গবেষণার জন্য বরাদ্দ দেয় ৬০ লাখ টাকা। এই অর্থায়নে ৬৮টি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন হয়।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ রাখা হয় দুই কোটি টাকা। এই বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ। এই অর্থায়নের ফলে বর্তমানে ১০৯টি গবেষণা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চার ক্যাটাগরিতে ভাগ করে এই দফতরের অধীনে গবেষণা প্রকল্প মঞ্জুর করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এক থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পের জন্য।

চবি গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এ দফতরের অধীনে ৪৫৯টি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ দফতরের অধীনে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় ২৬০টি। বিপরীতে গত ৩ বছরে বাস্তবায়িত হয় ১৯৯টি গবেষণা প্রকল্প! এ দফতরের বরাদ্দকৃত অর্থে ১০টি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে আরো দু’টি।

চবি গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরের পরিচালক প্রফেসর ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জয়নিউজকে বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাই বলে দেয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রার সমৃদ্ধ ইতিহাস রচিত হলেও গবেষণায় ছিল না তেমন অবদান। কিন্তু বিগত ৩ বছরে ১৯৯টি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রদানে আন্তরিক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সার্বিক নির্দেশনায় আমরা বিশেষভাবে মনিটরিং করছি। ভবিষ্যতে চবি গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরকে বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার ইতিহাস তেমন সমৃদ্ধ ছিল না। ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনা দফতরের যে বরাদ্দ ছিল তা দিয়ে ওই দফতরের কোন কার্যক্রম পরিচালনাই অসম্ভব ছিল। কারণ মানসম্মত গবেষণার জন্য মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ গবেষকদের অবশ্যই যৌক্তিক অংকের অর্থের প্রয়োজন হয়। আমি দায়িত্ব নিয়েই এ দফতরকে ঢেলে সাজাতে বরাদ্দ কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি করি। মাত্র ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকা এই দফতরের বরাদ্দ বাড়িয়ে ২ কোটি টাকায় উন্নীত করতে সক্ষম হই। তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সর্বোচ্চ আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করেছে। যার ফলাফল হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রযুক্তি ও গবেষণা খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে।

জয়নিউজ/জুলফিকার
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...