কেন থামছে না হালদার কান্না?

0

হালদা এখন ড্রেজারমুক্ত। অবৈধভাবে জাল ফেলে মাছ ধরতে পারছে না কেউ। হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানে সব ড্রেজার জব্দ হওয়ায় বালু তোলা বন্ধ। তবুও কাটছে না শঙ্কা। থামছে না প্রকৃতির নিবীড় পরিচর্যায় বয়ে যাওয়া হালদার কান্না। এখনো হালদায় কখনো ভেসে উঠছে মা মাছ, আবার কখনো ডলফিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হালে হালদার প্রধান শত্রু শিল্প কারখানার বর্জ্য, বাঁধ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত জাহাজ, ইট-ভাটা ও হালদাপাড়ে তামাকচাষ।

বাংলাদেশতো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ারও একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। প্রকৃতির নিজস্ব রীতিতে প্রতিবছর জানুয়ারিতে এ নদীতে আসতে থাকে কার্পজাতীয় রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ প্রজাতির মা-মাছ। তিন থেকে সাড়ে তিন মাস নদীতে অবস্থান করে মা মাছগুলো। এপ্রিল মাসের যেকোনো দিন আকাশে মেঘের গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টিতে ডিম ছাড়ে মা মাছ।

গবেষকদের মতে, মায়ের পেটে সন্তান যেভাবে বড় হয়, পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়; ঠিক সেভাবেই প্রকৃতির নিবীড় পরিচর্যায় এ নদীতে মাছের প্রজনন হয়ে থাকে। ৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ নদীর তলদেশ, পানি, পানিতে থাকা খাদ্যকণা, অনুজীব দেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে আলাদা।

বর্তমানে বেড়িবাঁধ তৈরির সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য বড় আকৃতির জাহাজ চলাচল করছে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে। এসব জাহাজ চলাচলের কারণে হালদা নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্ন হচ্ছে। ইতোমধ্যে জাহাজের ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে মরেছে ডলফিন। ১৪ নভেম্বর সকালে রাউজানের আজিমের ঘাট এলাকার হালদায় একটি মৃত ডলফিন ভেসে উঠে। ডলফিনের গায়ে বড় জখমের চিহ্ন মিলেছে। চলতি বছরের জুনে এই নদীতে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল। এমোনিয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মাছগুলো মারা গিয়েছিল।

হালদা নদী রক্ষা কমিটির সদস্য আমিন মুন্না জয়নিউজকে জানান, হালদায় এখন বালু উত্তোলনের ড্রেজার নেই। জালও ফেলতে পারে না কেউ। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিনের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে হালদা। কিন্তু এরপরও রাউজানের আজিমের ঘাট এলাকায় ১৪ নভেম্বর হালদা নদীতে একটি ডলফিন মরে ভেসে উঠে। তার শরীরে আঘাত ছিল।

এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রফেসর ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া জানান, হালদা ঘিরে প্রভাবশালীদের শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য রয়েছে। কেউ কেউ হালদাপাড়ে গড়ে তোলেছে ইটভাটা। ইটিপিবিহীন পেপার মিলসহ নানা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যরে শেষ ঠিকানা হালদা। আবার সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বেড়িবাঁধ নির্মাণ সামগ্রী আনা-নেওয়ার কাজে নদীতে বড় জাহাজ চলাচল। ১৪ নভেম্বর যে ডলফিনটি মৃত পাওয়া যায়, তার শরীরে বড় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অথচ আমরা বেড়িবাঁধ নিয়োজিতদের ছোট ট্রলারে করে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহনের অনুরোধ করেছিলাম।

তিনি আরো জানান, জানুয়ারি থেকে হালদায় মা মাছ আসতে শুরু করে। ডিম ছাড়ার আগে যদি হালদায় বড় বড় জাহাজ চলাচল করে তাহলে মা মাছের আনাগোনা কমে যাবে। আগামী মৌসুমে ডিম আহরণে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন জয়নিউজকে বলেন, হালদায় এখন ড্রেজার চলাচল বন্ধ। বন্ধ বালু উত্তোলনও। অবৈধভাবে জাল ফেলে কোথাও মাছ ধরা হচ্ছে না। কিন্তু শিল্প কারখানার বর্জ্য পড়ছে নদীতে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন করতে ব্যবহার হচ্ছে জাহাজ। মাছের উপর এর নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি মাছও মারা যাচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। নদীপথে জাহাজের মাধ্যমে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন না করে সড়কপথে পরিবহন করলে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশে কোনো প্রভাব পড়বে না।

জানা গেছে, গত ২০ মে হালদা পরিদর্শন করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার। তখন তিনি বলেছিলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটি দখল-দূষণ থেকে হালদা রক্ষায় একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে ২৩টি সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা চিত্রের চেয়েও হালদার দখল-দূষণের বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। তিনি এ সময় রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে অবৈধ দখলদাররা নদী দূষণ করে আর্থিক ফায়দা নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।

হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, হালদাপাড়ের একটি ইটভাটাও প্রভাবশালী মহলের কারণে বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন। কারণ ইটভাটার মালিক একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। অথচ দূষণমুক্ত করতে হালদা নদী রক্ষায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা আসার পরও এখনো তা শতভাগ কার্যকর হয়নি।

তবে গত ৫ এপ্রিল হালদা নদী থেকে ১৭টি বালুমহাল বিলুপ্ত করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। উপমহাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে গত বছরের মে মাসে নির্দেশনা দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়। বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় থেকে ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হালদা নদী থেকে বালু মহাল উচ্ছেদে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। তবে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন ছাড়া এ বিষয়ে অন্য উপজেলা প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

এর আগে গত ২০ জুন থেকে হালদা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাছের মড়ক দেখা দেয়। শুরুতে ছোট মাছ মরলেও ২২ জুন থেকে মরে ভেসে উঠতে থাকে বড় আকৃতির মা মাছও। হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানের বন্যার পানির সঙ্গে হালদা নদী ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য মিশে পানিতে এমোনিয়ার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় এক’শ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ ল্যাবেরটরি ও পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম। এতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। তাই মাছ মরা শুরু করে।

হালদা নদীতে মিশে যাওয়া প্রায় পাঁচটি খাল বর্ষার আগে বর্জ্যে ভরপুর থাকে। সারাবছর বর্জ্যগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলেও বর্ষার সময় শিল্প কারখানা কর্তৃপক্ষ বর্জ্যগুলো খালে ছেড়ে দেয়। এতে খাল হয়ে নদীতে পড়ছে বর্জ্য। যার প্রভাব পড়ছে মাছের উপর।

এছাড়া নদীর উজানে ফটিকছড়ির ভূজপুর এলাকায় দুটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে শুকিয়ে যাচ্ছে হালদা নদীর একটি অংশ। এছাড়া নদীর আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটভাটা। এসব ইটভাটার জন্য নদী থেকেই বেশিরভাগ মাটি ও পানির যোগান নিশ্চিত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলো নদী থেকে মোটরের সাহায্যে নিয়মিত পানি তুলছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ হচ্ছে এ নদী থেকে। খাগড়াছড়ি বিভিন্ন পয়েন্টে চাষ হচ্ছে তামাক। তামাক ক্ষেতের রাসায়নিক দ্রব্য মেশা পানি এসে পড়ছে হালদায়। এছাড়া তামাক ক্ষেতের পানিও নেওয়া হচ্ছে নদী থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, হালদা নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানাগুলোতে ইটিপি থাকলেও বেশিরভাগ সময়েই এসব বন্ধ থাকে। তাই সরাসরি নদীতে পড়ছে বর্জ্য। হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ এলাকার এশিয়া প্যাসিফিক পেপার মিলস লিমিটেড ও জননী পেপার মিলস কারখানার বর্জ্যও খাল বেয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ছে হালদায়।

তবুও প্রকৃতির পরিচর্যায় পরিচালিত হালদা নদী থেকে এ বছর ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ২০১৭ সালে সম্ভব হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৬৮০ কেজি। পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) হালদার মা মাছ রক্ষায় কাজ করছে। চবি হালদা রিসার্চ ল্যাবটরির পক্ষ থেকে এ সংস্থাগুলোকে পরিকল্পনা প্রদান করা হয়। তাদের পরিচর্যায় এ বছর হালদায় সর্বোচ্চ পরিমাণ ডিম ছেড়েছে মা মাছ।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...