চট্টগ্রামে ১৬ আসনের ১২টিতেই রাজতন্ত্র!

0

রাজনীতি এখন পৈত্রিক সম্পত্তি- এমনটিই বলছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষও! আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের তালিকায় চোখ রাখলেই এর সত্যতা মিলবে।

বাবার সঙ্গে দলের কার্যালয়ে গিয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনছেন অনেকেই। আবার নির্বাচন অফিসে গিয়ে নির্বাচন ফরম কিনছেন চাচা-ভাতিজা। একই আসন থেকে নির্বাচনি লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার খেলায় পিছিয়ে নেই দেবর-ভাবিও!

এসব কারণে গণতন্ত্রের আড়ালে ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারতন্ত্র। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য এটি কেমন হবে তা নিয়েও প্রশ্নও রয়েছে অনেকের।

এদিকে পরিবারতন্ত্রের কারণে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীরা রীতিমতো ক্ষুব্ধ। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে ১২টিতেই একই পরিবার থেকে দুইজন করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে জীবনবাজি রেখে দলের জন্য কাজ করে যাওয়া নেতাদের ভাগ্যে জুটছে না মনোনয়ন।

আওয়ামী লীগ-বিএনপির কয়েকজন পরীক্ষিত নেতা ক্ষোভপ্রকাশ করে জয়নিউজকে বলেন, এমপির ছেলে এমপি হচ্ছে, কর্মীরা যাচ্ছে জেলে। নেতার ছেলে মঞ্চে যাচ্ছে, কর্মী হাঁটছে মাঠে। দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন নেতার ভাই, ছেলে-মেয়ে, ভাগিনা, ভাতিজা। উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদ সদস্য হতে একই আসন থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন দেবর-ভাবিও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কী আওয়ামী লীগ, কী বিএনপি, সমানতালে সবখানেই বিরাজ করছে পরিবারতন্ত্র। রাজনীতিকে পিতৃতন্ত্রে আবদ্ধ করতে নেতাদের খায়েশ হলো, তাদের পুত্ররাই আসবেন উত্তরাধিকার সূত্রে। বেশিরভাগ নেতাই সন্তানদের বিদেশে লেখাপড়া করিয়ে দেশে আনছেন। তারপর সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন দলীয় কার্যালয়, সভা-সমাবেশ কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ডে। কিন্তু কর্মী সংগ্রহ, দল পরিচালনাসহ মাঠ পর্যায়ের নানা কর্মকাণ্ডে তাঁদের সন্তানদের উপস্থিতি কখনোই ছিল না।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসান মোহাম্মদ জয়নিউজকে বলেন, রাজতন্ত্রে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয় উত্তরাধিকার সূত্রে। রাজার ছেলে রাজা হয়। গণতন্ত্রে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়। জনগণই তাদের নেতা নির্বাচন করে নেন। আমরা যেহেতু গণতান্ত্রিক দেশের অধিবাসী আমাদের এখানে উত্তরাধিকারের চেয়ে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের পছন্দটা অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। কিন্তু ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক বিভিন্ন অধিকার নিয়ে জনগণ তুলনামূলক কম সচেতন বলে উড়ে এসে জুড়ে বসার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়।

ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির পোড় খাওয়া তরুণরাও ক্ষুব্দ প্রবীণ রাজনীতিবিদদের এমন আচরণে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওয়াহিদ রাসেল জয়নিউজকে বলেন, যেখানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর সুযোগ্য সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়কে মনোনয়ন দেননি সেখানে সিনিয়র নেতারা রাজনীতিতে অপরিপক্ক সন্তানদের সরাসরি এমপি বানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। বিষয়টি বিস্ময়কর। মাঠের রাজনীতির জন্যও বিষয়টি নেতিবাচক।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফেরদৌস মুন্না জয়নিউজকে বলেন, গণতন্ত্রের দেশে রাজতন্ত্রচর্চা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর ও হুমকিস্বরূপ। যে দল ত্যাগী নেতা-কর্মীদের উপেক্ষা করে উড়ে এসে জুড়ে বসাদের গুরুত্ব দিবে সে দল নিশ্চিত অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও তাঁর ছেলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান রুহেল। এছাড়া আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন।

একই আসনে বড়তাকিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম ইউসুফ ধানের শীষ প্রতীকে লড়তে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। আবার তাঁর ছেলে নিয়াজ মোর্শেদ এলিট নৌকা প্রতীকে লড়তে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন সাবেক সাংসদ মরহুম রফিকুল আনোয়ারের মেয়ে খাদিজাতুল আনোয়ার সনি ও তাঁর চাচা ফখরুল আনোয়ার। একই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তাঁর ভাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। তাঁরা দু’জনেই দেবর-ভাবি।

চট্টগ্রাম-৪  (সীতাকুণ্ড) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন  সাংসদ দিদারুল আলম।  তাঁর চাচা বিএনপির ব্যানারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়া এম মনজুর আলম। চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-হালিশহর ও পাহাড়তলী, খুলশী আংশিক) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন তিনিও!

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন ও তাঁর ছেলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকার ও তাঁর ছেলে তারেক আকবর খন্দকার।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও তাঁর চাচা কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও ) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও তাঁর ছেলে মজিবুর রহমান।

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন থেকে ধানের শীষে লড়তে বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন শামসুল আলম ও তাঁর ছেলে শোয়াইব রিয়াদ।  নুরুল ইসলাম বিএসসি ও তাঁর ছেলে মজিবুর রহমানও এই আসন থেকে নৌকার মাঝি হতে ফরম নিয়েছেন। এছাড়া এই  আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে ও দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। মনোনয়ন দৌড়ে আছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) চেয়ারম্যান ও নগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামও।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) সংসদীয় আসনে বাবা-ছেলে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপত্র কিনেছেন এবং জমাও দিয়েছেন। তাঁরা হলেন, বর্তমান সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অর্থ উপকমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য নাজমুল হক চৌধুরী শারুন।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনের বর্তমান এমপি সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের চেয়ে বড় পরিচয় তিনি আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সন্তান। তিনি এবারো এ আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি আয়েশা ওয়াসিকা খানও নিয়েছেন দলের মনোনয়ন ফরম। তাঁরও পরিচয়ও অভিন্ন। তাঁর বাবা আতাউর রহমান খান কায়সার ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আবদুল গাফফার চৌধুরী ও তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার ওসমান চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে আবদুল্লাহ কবির লিটন নৌকার মাঝি হতে চান। তিনি আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ভাগিনা।

জয়নিউজ/ফরহান অভি
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...