জামায়াত ঠেকাতে নদভীর কৌশল

0

সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে এবারই প্রথমবারের মত জামায়াতের মুখোমুখি হতে হবে ড. আবু রেজা নদভীকে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশগ্রহণ করেনি। ফলে বেশ সহজেই সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়েছিলেন নদভী।

তবে এবার যে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হবে তাঁকে, তাও নয়। কারণ এ আসনে নির্বাচন করতে চাইছেন জামায়াতের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। এখন পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থীতা নিয়ে তারা অনড় অবস্থানে আছেন। জামায়াতের এ গ্রুপিংয়ের ফায়দা যাবে নদভীর ঘরে। শুধু তাই নয়; নদভীর জিতে আসার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন তরুণ ও নারী ভোটাররা।

এ বিষয়ে আবু রেজা নদভী জয়নিউজকে বলেন, বিগত নির্বাচনে বিএনএফ এর পক্ষে মাওলানা শামসুল ইসলামসহ গোটা জামায়াতের সংঘবদ্ধ শক্তি আমাকে পরাজিত করতে চেয়েছিল। ১৩৫টি কেন্দ্রে তারা অরাজকতা চালিয়েছিল। কিন্তু জনগণের রায় আমার পক্ষে এসেছে। তিনি বলেন, বর্তমানে জামায়াতের কোনো অস্তিত্ব সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় নেই। তবে তারা দেশ-বিদেশে পালিয়ে থাকা ক্যাডারদের দেশে এনে জড়ো করেছে। তবে আওয়ামী লীগের কর্মীরা সাধারণ ভোটারদের নিয়ে নৌকাকে জয়ী করে আনবে। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এ এলাকায়। তাই নৌকা এখন এ অঞ্চলে জনগণের আস্থার প্রতীক।

জানা গেছে, জামায়াতের শামসুল-শাহজাহানপন্থীদের দ্বন্দ্ব এখন চরম পর্যায়ে রয়েছে। এমনটাও জানা গেছে, দল যদি শামসুলকে মনোনয়ন দেয় তাহলে শাহজাহান চৌধুরীপন্থীরা গুটিয়ে রাখবে নিজেদের। আর ওই অঞ্চলে শাহজাহানের কর্মী-সমর্থকদের দল ভারি। বিপরীতে শাহজাহানকে যদি দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় মানবেন না শামসুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকেরা। এতেও ঘর পুড়বে জামায়াতের। কারণ শামসুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দক্ষিণ জেলা, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া জামায়াত-শিবিরের কমিটি।

তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবু রেজা নদভী তাকিয়ে নেই জামায়াতের দ্বন্দ্বের দিকে। নিজের দলীয় অবস্থান ও কৌশল খাটিয়ে এ আসনের প্রতিটি ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া আল্লামা ফয়জুল্লাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে টিউবওয়েল স্থাপন, মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে অনুদান দেওয়াসহ সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার আর্থসামাজিক উন্নয়নে নদভীর রয়েছে উল্লেখ করার মত ভূমিকা। এ অঞ্চলের নারী ভোটারদের টানতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও নদভীর সহধর্মিনী রিজিয়া রেজা চৌধুরীও। পিছিয়ে থাকা নারীদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তাদের রাজনীতিতে যুক্ত করতে রিজিয়ার তৎপরতা উল্লেখ করার মতো। তাই নারী ভোটারদের একটি বড় অংশের সুনজর রয়েছে রিজিয়ার প্রতি। যার সুফল যাবে আওয়ামী লীগের ঘরে।

আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত সাতকানিয়ার ৩নং নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবলীগের মহিলা বিষয়ক সহসম্পাদক তসলিমা আক্তার জয়নিউজকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে যাকেই নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিবেন আমরা তাকে জিতিয়ে আনবো। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কোন বিভেদ নেই।

তিনি বলেন, সরকারের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে এ এলাকার চিত্র বদলে গেছে। তরুণ ও নারী ভোটাররা আমাদের অন্যতম শক্তি।

এদিকে শামসুল কিংবা শাহজাহান চৌধুরী যে-ই নদভীর বিরুদ্ধে যান না কেন এতে আওয়ামী লীগের ভোটের সমীকরণে সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এ অঞ্চলের জামায়াত-শিবিরের বেশিরভাগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। ইতিমধ্যে জামায়াতের বেশিরভাগ ক্যাডারেরই ঠাঁই হয়েছে শ্রীঘরে। ফলে শামসুল কিংবা শাহজাহানের অনুসারীরা সহিংসতা চালিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন কি-না তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত।

এদিকে শামসুল ও শাহজাহানের অনুসারীরা নিজ নেতার পক্ষে যুক্তিও দিচ্ছেন নানাভাবে। শাহজাহান চৌধুরীর সমর্থকদের বক্তব্য হল, দল থেকে হালিশহর-পাহাড়তলী (চট্টগ্রাম-১০) আসনে শাহজাহানকে নির্বাচন করতে বলা হচ্ছে। কিন্তু ওই আসনের বিএনপি থেকে একক প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান। যিনি ওই আসনে বিগত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অল্প ভোটের ব্যবধানের কারণে সাংসদ হতে পারেননি। তিনি দীর্ঘদিন ওই আসনে কাজ করেছেন। ওই আসনে যদি বিএনপি বা জোটগতভাবে নোমানকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে শাহজাহান চৌধুরীর ওই আসন থেকে নির্বাচন করা কি যৌক্তিক হবে? যদি জোটগতভাবে একক প্রার্থী হিসেবে শাহজাহান চৌধুরীকে মনোয়ন দেওয়া হয় তাহলে তিনি ওই আসন থেকে নির্বাচন করবেন। আর না হয় দীর্ঘদিন ধরে যে আসনের তিনি কান্ডারী সে আসনেই তার নির্বাচন করা উচিত। জোটের প্রার্থীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে শামসুলপন্থীদের বক্তব্য, জামায়াত আদর্শিক রাজনীতির অনুসারী দল। হাইকমান্ড থেকে যাকে যেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁকে সেখানেই নির্বাচন করা উচিত।

শাহজাহান চৌধুরীর অনুসারী লোহাগাড়ার আমিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনামুল হক জয়নিউজকে বলেন, জোটগতভাবে চট্টগ্রাম-১০ আসনে যদি বিএনপি’র কোন নেতা নির্বাচন করেন তাহলে জামায়াতের কোনো প্রার্থীর ওই আসনে নির্বাচনের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে সাতকানিয়া-লোগাগাড়ার গণমানুষের নেতা শাহজাহান চৌধুরী এ আসন থেকেই নির্বাচন করবেন।

শামসুল ইসলামের অনুসারী সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল ফয়েজ বলেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শামসুল ইসলামকে এ আসনে নির্বাচনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি।

এদিকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন ঘিরে শামসু-শাহজাহান দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে নগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ শাহজাহান ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকায় শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। সেই বৈঠক থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন জামায়াতের বর্তমান আমির মকবুল আহমেদসহ নয় শীর্ষ নেতা।

জয়নিউজ/ফারুক মুনীর/জুলফিকার
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...