একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রীর গল্প

বিশেষ সম্পাদকীয়

0

একাদশ জাতীয় নির্বাচন সমাগত। শুরু হয়ে গেছে ভোটের আয়োজন। রাজনৈতিক দলের তৎপরতা খেয়াল করা যাচ্ছে। চলছে বিভিন্ন দল ও জোটের নানা সমীকরণ। এটাই বর্তমান সরকারের শেষ মাস। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণ ভোট দিলে আবারো প্রধানমন্ত্রী হবেন। বিরোধী দল বলছে, শেখ হাসিনার পতন চাই। এতসব রাজনৈতিক ডামাঢোলের মধ্যে কিছু বিষয় আমার মনের দরজায় উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রিয় পাঠক, এই লেখায় তারই কিছু প্রসঙ্গ অবতারণা করতে আজকের কলম ধরা।

বাংলাদেশ এতদিন পেয়েছে এমন একজন প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজে স্বজনহারা, পিতৃ-মাতৃহারা, এক অর্থে অভিভাবকহীনও। অথচ দেশের দুস্থ-অসহায় মানুষের জন্য তিনি নিজেই আজ স্বজন। অনেক অসহায় কবি-সাহিত্যিক-অভিনেতার জন্য তিনি ত্রাতা। বহু অনাথের জন্য তিনি নিজেই পিতা-মাতা। আবার দুস্থ অসহায় সর্বহারা কারো কারো জন্য তিনি একজন যোগ্য অভিভাবকও বটে। এতসব গুণ যার, তাঁকে আমি বলি মানবিক প্রধানমন্ত্রী।

আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলে লেখাটি শুরু করতে চাই। গত ১৯ আগস্ট জয়নিউজে একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ হয়। যার শিরোনাম ছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রমা চৌধুরীর এখন আপনাকে প্রয়োজন’।

চট্টগ্রামের দুর্ভাগা এক নারীর নাম ‘রমা চৌধুরী’। যিনি একাত্তরে হারিয়েছেন সম্ভ্রম, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে হারিয়েছেন তিন ছেলে (প্রথম দুই ছেলে মারা যায় শ্বাসকষ্টে, আরেক ছেলে মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়)। রমা চৌধুরীকে নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই এই বীরাঙ্গনাকে গণভবনে ডেকে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বীরঙ্গনার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর কি প্রয়োজন? উত্তরে রমা শুধু বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে শুধু আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে দেন। আমার আর কিছুই প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমরা জেনেছি রমা চৌধুরীর চরম অসহায় অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া ছুটে এসেছিলেন। নিয়েছিলেন চিকিৎসার দায়িত্ব।

আমার মতো সাধারণ একজন মানুষের লেখায় সাড়া দিয়ে এভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাড়া পাবো, এটা রীতিমতো বিস্ময়। শুধু কি এই একটি ঘটনা? না। এবার লেখার বিস্তারে আসি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার মো. মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী ডা. সাবরিনা নুসরাতের চিকিৎসার জন্য এক কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। এর আগে নুসরাতের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁর কল্যাণ ও চিকিৎসা তহবিল থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ডা. নুসরাত ২০১৬ সালের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লুতে একটি ওয়ার্কশপে যোগ দিতে যাওয়ার সময় হোটেলের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। মুখ, মাথা ও ব্রেনে তিনি মারাত্মক আঘাত পান। তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এভাবেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন সকলের প্রধানমন্ত্রী। কেবল চিকিৎসাই নয়, মান-অভিমানেও বুকে টেনে নিতে দ্বিধা করেন না তিনি। মান-অভিমান ভেঙে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ছেলে সোহেল তাজকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি যে একজন মমতাময়ী মা তা আবারও প্রকাশ পায় সেই সাক্ষাতে।

আবার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, এতিম, প্রতিবন্ধী শিশু এবং আলেম-ওলামাদের সঙ্গে ইফতার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইফতারের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভবনের সবুজ লনে টানানো অস্থায়ী প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এতিম শিশুরা প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যও আমরা দেখেছি।

সবচেয়ে আলোচিত মানবিক সহযোগিতার ঘটনা ছিল গত নভেম্বরে। বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবী নেতা ও বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই গুণী নির্মাতার দুই ছেলে সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও সোহেল আরমানকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান। এ ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। বিরুদ্ধ মত প্রকাশের অপরাধে যখন এই বাংলাদেশের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রীর কোপানলে পড়তে দেখা গিয়েছিল, হাওয়া ভবনের নির্দেশে যখন একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহতের চিকিৎসায় অসহযোগিতার ঘটনা ঘটেছিল, সেই বাংলাদেশের এমন ঘটনা বিরল বৈকি।

ককটেল বিস্ফোরণে গুরুতর আহত এসএসসি পরীক্ষার্থী মিনহাজুল ইসলাম অনীকের চিকিৎসার দায়িত্ব থেকে শুরু করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি ও উপমহাদেশে বাম রাজনীতির অন্যতম পুরোধা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের চিকিৎসার দায়িত্বও নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সাবেক সদস্য অসুস্থ চামেলী খাতুনের অসুস্থ অবস্থার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে তা দেখে চিকিৎসার সার্বিক দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নরম মনের, তিনি একজন মমতাময়ী মানুষ। মাঝে মাঝে ফেসবুকে তাঁর ছবিগুলি দেখি। ভাবি, নিজের জন্য নেই একফোঁটা বিশ্রাম নেওয়ার সময়। কিন্তু সময় বের করে ঠিকই সাহায্য করছেন সবাইকে। কখনো দেখি, নাতিপুতিদের নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলছেন, কখনো আবার চুল বাঁধা থেকে শুরু করে মাংস রান্না সবই করছেন।

আচ্ছা আমরা কি ভুলে যাবো, কক্সবাজার উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেখে কিভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুকন্যা। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নারকীয় তাণ্ডব, নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের বর্ণনা শুনে কিভাবে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী, ভুলে যাবো সব?

আজ থেকে আট বছর আগে নিমতলির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড যাঁদের এতিম, নিঃস্ব করে দিয়েছিল, যাঁদের ঘর বাঁধার স্বপ্ন পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে, সাত দিনের মাথায় সাড়ম্বরেই তাঁদের বিয়ে হয়েছিল দেশের প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে। অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল গণভবনের ব্যাংকুয়েট হলে। ফুলে ফুলে সাজানো বিবাহমঞ্চে বর-কনেদের বসার ব্যবস্থা। আট ভরি করে ২৪ ভরি স্বর্ণের গয়না তিন কন্যাকে পরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে। প্রধানমন্ত্রী বরদের হাতে কন্যাদের তুলে দেন। রাতেই নবদম্পতিরা গণভবন থেকে নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান। এই তিনকন্যা হয়ে ওঠেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর ‘কন্যা’!

একজন নেত্রী শুধু একটি দেশকে চালনা করবার জন্য জন্মান না। সমস্যায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় তার একটি গুণ। শুধু তাই নয়, দেশের গুণী মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া নেতার কদর সবার কাছে বেশি। ঠিক এমন একজন মানুষ হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই গুণের উদাহরণ বহুবার দেখা গেছে।

কবি হেলাল হাফিজের চিকিৎসার দায়িত্ব কিছুদিন আগেই নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রূপালী পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী আনোয়ারা বেগমের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। স্বামীর অসুস্থতার কারণে আনোয়ারা বেগম দুর্দশার মধ্যে জীবন-যাপন করছিলেন, এ খবর পেয়ে মুহুর্ত বিলম্ব হয়নি তাঁর। গণভবনে ডেকে ক্রিকেটারদের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে থাকার দৃশ্য তো এখন নিয়মিত। ক্রিকেটে বাংলাদেশের অসংখ্য জয়ের সাক্ষী শেখ হাসিনা নিজে। বহুবার তিনি ছুটে গেছেন স্টেডিয়ামে। অনেক জয় উদ্‌যাপন করেছেন তিনি মাঠে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে।

কত অনাথ, কত অসহায় এবং কত দরিদ্রজন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অনুদানে গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সে সংখ্যা জানলে অবাক হতে হবে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের শিকার কিশোরী পূর্ণিমার ঘটনা জানেন কি? বঙ্গবন্ধুকন্যা সেই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকেই পূর্ণিমা এবং তার পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। লেখাপড়া শিখিয়ে নিজ সন্তানের মতো বড় করেছেন তাকে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার ঘোর বিরোধীরাও স্বীকার করেন, তাঁর মধ্যে অনেক ব্যতিক্রমী মানবিক গুণ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সৎ গুণগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন হলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে ভালো কিছু সৃষ্টি হবে। আমরা জানি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আজ দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। যিনি সরকারপ্রধান থাকার সময় বখে যাওয়া সন্তানকে প্রশ্রয় আর বাৎসল্য দিয়ে গেছেন সমানে। প্রিয় পুত্রদের অন্যায় আড়াল করে প্রশ্রয়দায়ী মায়ের কাজ পালন করে ব্যর্থ হয়েছেন আদর্শ মায়ের দায়িত্ব পালনে। তাই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, খালেদা জিয়ার দুঃসময়ে নেই আজ তাঁর পুত্র! বিপরীতে শেখ হাসিনা একজন পরিশ্রমী, বিদূষী, ধর্মপরায়ণা ও মানবিক মানুষ। খেয়াল করে দেখুন, মানবিক শব্দের মধ্যেই ‍লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরতার এবং শ্রদ্ধেয়’মা’ শব্দটি!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যেই গঠন করা হয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল। এই তহবিলের সব অর্থই মানবতার সেবায় ব্যয় হয়। দেশের মানুষের অনেকেই জানে না, গণভবন থেকে কিভাবে পরিচালিত হয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে প্রাপ্ত আর্থিক অনুদানের চেক উত্তোলনের আবেদন করতে হয় ৫টি ধাপে। দেশের যে কেউ অনলাইন আবেদনের সময় সতর্কতার সঙ্গে ফরম পূরণের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারি ওয়েবসাইটে। এতে একটি ধাপে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে হয়। পূরণকৃত তথ্যসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিস্টেমে সংরক্ষিত হয়ে সরাসরি চলে যায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এভাবেই প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল কায়দায় সংযুক্ত থাকেন দেশের অসহায় দুস্থদের সঙ্গে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই তহবিলের বেশিরভাগ অর্থই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবার জন্য। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যখন অসুস্থ হন বা বিপদে পড়েন, তখন সহযোগিতা চাইলে এই ত্রাণ তহবিল থেকে তাদের সহযোগিতা করে থাকি। এর প্রতিটি অর্থ আর্তমানবতার কল্যাণে ব্যয় হয়ে থাকে।

লেখক: সম্পাদক, জয়নিউজ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...