আ’লীগের ইশতেহার: হোক সমৃদ্ধি-সুশাসনের সনদ

0

বিজয়ের মাসে দেশবাসীর আরেকটি নতুন অর্জন হলো, বিগত ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বৈশি^ক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে চারটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রসহ সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে স্থান পেয়েছে। সব দেশের মধ্যে ১ম স্থান অধিকার করার ক্ষেত্রগুলো হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের সমতা, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েদের সমতা, সরকার প্রধান হিসেবে নারীর সময়কাল ও জন্মের সময় ছেলে ও মেয়ে শিশুর সংখ্যাগত সমতা।

উন্নয়ন ও অর্জনের সাথে সুশাসন সংশ্লিষ্ট বিধায় আওয়ামী লীগের ইশতেহার ২০১৮-কে দেখতে চাই সমৃদ্ধি ও সুশাসনের সনদ হিসেবে। একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মানেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে আরও ব্যাপক একটি প্রত্যয় কালের বিবর্তনে তা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তেমনটি একসময় সরকারি প্রশাসনের তিনটি ধ্রুপদি ‘ই’ ছিল : ইকনোমি (সুলভ্যতা), ইফিসিয়েন্সি (দক্ষতা) ও ইফেক্টিবনেস (কার্যকারিতা)। তবে, কোনো সরকার ইকনোমিক্যালি, ইফিসিয়েন্টলি ও ইফেক্টিবলি কাজ করলেই কি তাকে ভালো সরকার বলা যাবে? দু’টি কারণে বলা যাবে না।

প্রথমতঃ সরকারি কাজে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, অন্যথায় সরকারের উপর আস্থা ধীরে ধীরে কমে যাবে। দ্বিতীয় কারণটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এর সাথে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্রদের ব্যাপার জড়িত। তাই এই তিন ধ্রুপদি ‘ই’ এর সাথে সঙ্গত কারণেই যোগ হয়েছে চতুর্থ ‘ই’- ইকুইটি (সমতা)। যার মাধ্যমে প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্যের পূর্ণাঙ্গ রূপ বিকশিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কোনো সরকার যদি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের যথাযোগ্য বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সবচেয়ে ইফিসিয়েন্ট (দক্ষ) পদ্ধতিও টেকসই হবে না। কারণ তখন সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধগুলো প্রকট হয়ে উঠবে এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগণের সহযোগিতা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে।

তবে আনন্দের বিষয় হল, আওয়ামী লীগ সরকার ইতোমধ্যে নিজেকে দরিদ্রপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে এবং ক্ষমতায় আসীন হবার পর থেকে সাধারণ জনগণের প্রয়োজন ও পছন্দসমূহে গুরুত্ব প্রদানের গুরুদায়িত্ব পালন করে সাধারণ মানুষ ও বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করেছে। এবং তা ধরে রাখতে হবে সুশাসনের নির্দিষ্ট পথে ও অভীষ্ঠ লক্ষ্যে অবিচল থাকবার নিমিত্তেই। জবাবদিহিতাকে বলা হয়, সুশাসনের মূলভিত্তি। জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া কার্যকর ও ফলপ্রদ না হলে কোনো পদ্ধতিই ভালোভাবে কাজ করে না।

দুর্নীতি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা। জবাবদিহিতা কাঠামোর সাথে দুর্নীতির বিস্তার ও দমন সরাসরি সম্পৃক্ত। যত উন্নয়নই করা হোক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানো না গেলে উন্নয়নকে টেকসই করা যায় না। উন্নয়নের সার্থক ফলভোগীও হতে পারে না সাধারণ জনগণ। আমাদের দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণ হিসেবে দুর্বল বেতন কাঠামোকে দোষারোপ করা হতো। সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি করে তাঁদের দুর্নীতি না করার পথ সুগম করে দিয়েছে।

সুতরাং আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তাকে উচ্চাভিলাষী মনে করার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকর ভূমিকা আবশ্যক। এর জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের সঠিক ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব প্রয়োজন। তবে সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক দুর্নীতিবাজকে পাকড়াও করার মাধ্যমে যে গতিধারা সৃষ্টি করেছে, তাকে আরও বেগবান ও ক্ষুরধার করা বাঞ্ছনীয়।

গণতন্ত্রে যেহেতু ক্ষমতার আসল জিয়নকাঠি সাধারণ জনগণের হাতে, জনগণের প্রতিক্রিয়ার প্রতি তাই সংবেদনশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে কি পদক্ষেপ নিচ্ছে এ ব্যাপারে জনগণকে অবহিত রাখার জন্য স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। একসময় তথাকথিত গোপনীয়তার আবরণে জনগণকে হরহামেশাই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতো। যার ফলে সরকারি সেবা গ্রহণকারীদের অহেতুক বিলম্ব ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হতো। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন পাশ করে সে বিড়ম্বনায় ইতি টানার ব্যবস্থা করে।

তবে কিছুদিন আগে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিক সমাজের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মূলত গুজব সৃষ্টিকারী এবং ভুয়া সংবাদ পরিবেশনকারীদের লক্ষ্যবস্তু করে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং এ পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক অহেতুক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানা যায়নি। ইশতেহার ২০১৮-তে এ আইন বা অন্য কোনো আইনের অপব্যবহার করা হবে না বলে আশ^স্ত করা হয়েছে। তারপরও মুক্তচিন্তার ধারক-বাহক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনের পর আইনটিকে আরও পরিশীলিত করবে, এটি বলা যায়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহার ২০১৮-তে এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, একটি গণমুখী ও সেবামুখী প্রশাসন জোরদার করা হবে এবং যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। প্রথম শ্রেণির চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করে সরকার তার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করেছে। কোটা ব্যবস্থা অনেকদিন চালু থাকলেও হঠাৎ করে এ ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসার পেছনে স্বার্থানেষী মহলের মদদ ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করা।

যে দেশে বছরে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, সে দেশে কয়েকশ’ সরকারি চাকরির জন্য যুবসমাজকে উন্মাতাল করে তোলা কোনো কারসাজি ছাড়া সম্ভব ছিল না। তবে আওয়ামী লীগ তার ইশতেহারে ব্যাপকহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (আগামী ৫ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ) ও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতেই যুব সমাজের অমিত সম্ভাবনা নিহিত আছে। বিসিএস ক্যাডার না হয়েও যে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনসহ জাতীয় উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা যায়- তার প্রমাণ এ দেশে অসংখ্য।

আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশের অসহায় ও অক্ষম মানুষের জন্য অনেক ধরনের ভাতার প্রচলন করেছে। বেকার ভাতা দেওয়ার ব্যাপারটিও বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি সম্ভব না হলে ইশতেহারের অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবারে অন্তত একজনের রোজগারের ব্যবস্থা করার ব্যাপারটিও আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। চাকরিজীবী হওয়ার চেয়ে চাকরিদাতা হওয়া অনেক বেশি গৌরবের। যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা ও চাকরিদাতা সৃষ্টির সংস্কৃতি ও অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা আগামীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আরেকটি সোনালী সাফল্য হতে পারে।

বাংলাদেশে আমলাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এত তাড়াতাড়ি আমূল পরিবর্তন হয়ে যাবে না। তবে তাদের জনগণের প্রতি সাড়া প্রদানের হার ও প্রকৃতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। সরকারি কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রভাব একে সহজতর করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এক্ষেত্রে সাফল্য দাবি করতেই পারে। পুলিশের চাকরিতে বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হওয়া ইতিবাচক।

জনবান্ধব পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে সুশাসন নিঃসন্দেহে জোরদার হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১০ বছর ক্ষমতায় থাকায় কর্মী-সমর্থক বৃদ্ধির সাথে সাথে হাইব্রিডদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এরা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথাসাধ্য করেছে। এসব অযোগ্য এবং সুবিধাবাদীরা যেন আর কোনো অবৈধ সুযোগ না পায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কোনো ভুলের যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে ব্যাপারে অধিক সতর্কতাও প্রত্যাশিত।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরোত্তর প্রজ্ঞাময় হয়ে ওঠা গণমানুষের নেত্রী ও উন্নয়ন-সমৃদ্ধির রোল মডেল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার নির্বাচিত হলে দেশবাসীকে আরও জনকল্যাণমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুশাসনের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একটি সরকার উপহার দিতে না পারার কোনো কারণ দেখি না। কেন না তাঁর যোগ্যতা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও ঐকান্তিকতার প্রমাণ দেশবাসী আওয়ামী লীগের বিগত ১০ বছরের শাসনামলে আক্ষরিক অর্থেই পেয়েছে।

লেখক :

প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...