গৌরবে ঐতিহ্যে চট্টগ্রাম কলেজ

সার্ধশততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

0

দেশের অন্যতম বিদ্যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ।  হাজারো কৃতি বাঙালিকে শিক্ষিত করার আঁতুড়ঘর, ছায়াঘেরা বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম কলেজ গৌরবে ও ঐতিহ্যে পার করছে সার্ধশততম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠার পর হাঁটি হাঁটি পা পা করে দেড়শ’ বছর পাড়ি দিল এই প্রতিষ্ঠান। পড়ুন জয়নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক পার্থ প্রতীম নন্দী’র বিশেষ রিপোর্ট। এই প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত আছে জয়টিভির বিশেষ ভিডিও রিপোর্ট-

সময়টা ১৮৬৯ সাল। সেই থেকে পথচলা। দেড়শ বছর। মেধা, গৌরব ও ঐতিহ্যের স্বর্ণশিখরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ। সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে তার গর্বিত শিক্ষার্থী। কলেজের সাথে লাগোয়া ঐতিহ্যবাহী প্যারেড ময়দান কলেজের গৌরবের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। পুরো ক্যাম্পাসে ছায়াময় পরিবেশ। লাল দালানের ঐতিহ্যবাহী এই ক্যাম্পাসে গেলেই ভর করে স্মৃতিময় অতীত। যদিও হাঙ্গামা-মারামারিতেও চট্টগ্রাম কলেজ একসময় শঙ্কার বিশেষণ ছিলো। মৌলবাদের কড়াল থাবায় এই ক্যাম্পাস অবরুদ্ধ ছিলো যুগের পর যুগ। সময় বদলে এখন সেই ক্যাম্পাসে মুক্ত প্রাণ।

চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল হাসান বৃহস্পতিবার দুপুরে জয়নিউজকে বলেন, আমি নিজেই এই কলেজের শিক্ষার্থী, সে অর্থে এটি গৌরবের ব্যাপার। আমরা বংশানুক্রমিকভাবে সকলেই এই কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। পারিবারিকভাবে আমাদের চার প্রজন্ম ঋণী এ কলেজটির কাছে। চট্টগ্রাম কলেজ ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামীতে কলেজের নবীন-প্রবীণদের নিয়ে বর্ণাঢ্য মিলনমেলার আয়োজন করার প্রস্তুতি চলছে। আয়োজন আছে স্মৃতিচারণ ও সুভ্যনির প্রকাশের ।

চট্টগ্রাম কলেজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে প্রাক্তন শিক্ষর্থী ও চসিক মেয়র আ জ ম নাছির জয়নিউজকে বলেন, এই কলেজ ঐতিহ্যবাহী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই অঞ্চলের শিক্ষার আলো ছড়ানোর ঈর্ষণীয় নক্ষত্র। আমার ছাত্র রাজনীতির হাতেখড়ি এই কলেজ থেকে। আশা করবো, ভবিষ্যতে শিক্ষা  দান ও সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চায় চট্টগ্রাম কলেজ প্রগতির পথে অবিচল থাকবে।

জানা গেছে, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ও চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিপ্লবের অন্যতম নেতা মাস্টারদা সূর্য সেন, পাকিস্তান আমলের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও বিনোদ বিহারী চৌধুরী, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, একজন বাঙালি শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক মুহম্মদ এনামুল হক, বিজ্ঞানী প্রিয়দারঞ্জন রায়, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ মাহবুব উল আলম থেকে শুরু করে হাল আলমের জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান কলেজ জীবনের পাঠ নিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী এ কলেজ থেকে। বাদ নেই শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন; সকল কৃতি সন্তানের বিদ্যার্জন এই ক্যাম্পাস থেকেই।

নগরীর চকবাজার এলাকার কলেজ রোডে প্রায় ২০ একর জমির ওপর এটি অবস্থিত। গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য নিয়ে ১৫০ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পেয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চারবার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কলেজের খেতাব। এ কলেজ বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকে এর পরিধি আরও বেড়েছে।প্যারেড মাঠের এক কোণে একটি পর্তুগিজ আমলের স্থাপনায় এ কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিখ্যাত চট্টগ্রাম কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৩৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল হিসেবে। তার ৩৩ বছর পর ১৮৬৯ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। সেই থেকে এর নামকরণ করা হয় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ। পরে তা চট্টগ্রাম কলেজ হিসেবেই বেশি পরিচিতি লাভ করে।

জেসি বোস এখানে প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। যেখানে ১৯০৯ সাল প্রথম কলা বিভাগের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। ১৯১০ সালে এ কলেজটি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণির ডিগ্রি কলেজের স্বীকৃতি লাভ করে। গণিত, রসায়ন বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের পাঠদান শুরু হলেও ১৯১৯ সাল থেকে স্নাতক শ্রেণির বিষয়গুলোয় ইংরেজি এবং সম্পূরক শ্রেণিতে দর্শন এবং অর্থনীতি যোগ করা হয়।

প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং স্বনামধন্য এ চট্টগ্রাম কলেজ। প্রায় ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার শিক্ষার্থী, ১৭টি অনার্স, ১৮টি মাস্টার্স বিষয়সহ ডিগ্রি (পাস) ও উচ্চমাধ্যমিক কোর্সে অধ্যয়নরত। ঐতিহাসিক প্যারেড যুক্ত আছে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথেও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ড্যানিয়েল ছদ্মনাম দিয়ে এই মাঠেই দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই মাঠের এক কোণে আছে একটি জিমনেসিয়াম, শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনগুলোর মধ্যে আছে তিনটি ছাত্রাবাস এবং দুটি ছাত্রীনিবাস। এগুলো হলো শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস, শের এ বাংলা ছাত্রাবাস, ড. আবদুস সবুর ছাত্রাবাস, হজরত খাদিজাতুল কোবরা (রা.) ছাত্রীনিবাস এবং নতুন একটি ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে, যার নামকরণ করা হবে শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাস।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...