কোন ‘গণ’রা মিলে গণপিটুনি দেয়? কী বলছে গবেষণা?

চট্টগ্রামে সোহেল হত্যা

0

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজারের ব্যবসায়ীরা ‘চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে গত সোমবার, ৭ জানুয়ারি সকালে ‘গণপিটুনি’তে সরকারদলীয় নেতা মহিউদ্দিন সোহেলকে হত্যা করেছে বলে পুলিশ জানায়। কিন্তু পরিবার দাবি তুলেছে, এই ঘটনা পূর্বশত্রুতার রেশ ধরে ঘটেছে, যা ’গণপিটুনি’র আড়ালেই ঘটানো হয়েছে। জয়নিউজের অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদক ফারুক মুনীর তুলে ধরছেন এই ঘটনার ব্যাখ্যা ও সমাজে গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনের গবেষণাধর্মী তথ্য। পড়ুন বিস্তারিত-

চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার পাহাড়তলী কাঁচাবাজার। ঘিঞ্জি এবং জনবহুল একটি এলাকা। দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে জনতার উপস্থিতি। সরব এলাকা, মুখর চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজার। স্থানটি অন্য দশদিনের মতো ছিলো না ৭ জানুয়ারি, সোমবার। সকাল ১০টার পর থেকে এলাকাটি পরিণত হয় উত্তেজিত জনতার সমাবেশস্থলে। ঘটলো চট্টগ্রামের বুকে সাড়া  ও আতঙ্ক জাগানো হত্যাকাণ্ড, যার সহজ পরিচিতি- গণপিটুনিতে মৃত্যু!

গণমাধ্যমসহ সেদিন টক অব দ্যা কান্ট্রি ছিল এই খবরটি- ‘গণপিটুনিতে চাঁদাবাজ নিহত’। সেদিন গণপিটুনির কবলে পড়েছিলেন মহিউদ্দিন সোহেল নামের ৪০ বছরের এক যুবক। সোহেলের রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় সহজেই ভাইরাল হয় নিউজটি। পরিবার, স্বজন এই ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় থাকায় তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ করতে পারেনি। কিন্তু মোড় ঘুরে যায় ঘটনার পরদিন। যখন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক প্রেস কনফারেন্সে উঠে আসে পরিবারের পক্ষ থেকে ছুড়ে দেয়া নানা প্রশ্ন।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজারের আলোচিত গণপিটুনির ঘটনার দৃশ্যবন্দী করেছেন জয়নিউজের নিজস্ব আলোকচিত্রী বাচ্চু বড়ুয়া

গণপিটুনিতে নিহতদের শরীরের সুরতহাল আর সোহেলের লাশের সুরতহালে বিশাল গরমিল। সোহেলের শরীরে অনন্ত ২৬টি ছুরির আঘাত রয়েছে বলে দাবী পরিবারের। ওই দিন সোহেলের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের বিষয়টিও জানিয়েছিল পুলিশ। পাহাড়তলীতে গণপিটুনিতে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন সোহেলের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এলাকাঘুরে নিহত সোহেলের ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। যে স্থানটি তিনি গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতেন, সেটি ওই পাড়ার লাশ গোসলের জায়গা ছিলো। ওই স্থানে নিজস্ব স্থাপনা হিসেবে গুদামঘরটি বানানোয় কিছু স্থানীয় মানুষের মধ্যে সোহেলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জন্ম নেয়। কিন্তু সোহেলের পরিবারের দাবি, জায়গাটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় লিজ নিয়ে সোহেল গুদামঘর তৈরি করে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে বাজারের আলোচিত গণপিটুনির পর সোহেলের গুদামঘরে আগুন দেয়া হয়। ঘটনার দৃশ্যবন্দী করেছেন জয়নিউজের নিজস্ব আলোকচিত্রী বাচ্চু বড়ুয়া

স্থানীয় দোকানদার ফকির আহমেদ জানান, আমার দোকানে নিহত সোহেলের এক অনুসারী একে একে আটটি বেনসন সিগারেট বাকিতে খায়। টাকা চাইলে সে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে। বিষয়টি সোহেলের নজরে পড়ার পর সোহেল আমাকে একশ টাকা দিয়ে অতিরিক্ত চার টাকাও ফেরত নেয়নি। যাওয়ার সময় বলে গেছে, ’পোলাপাইনগুলোকে আর মানুষ করতে পারলাম না। ভবিষ্যতে এরকম কিছু হলে আমাকে জানাবেন চাচা।’ সেই সোহেলের মৃত্যুতে দুঃখ করে বলেন- ‘গণপিটুনিতে মারা যাবে সে, আমি তার মুত্যু মেনে নিতে পারছি না’।এলাকাঘুরে জানা গেছে, সাংবাদিক পরিচয়ে প্রশ্ন করলে অনেকেই নিহত সোহেলের ব্যাপারে মুখ খুলেতে চানননি। কারণ হিসেবে বলছেন অনেকে, নিহতের সাথে সরকার দলীয় পরিচয় রয়েছে। আবার অনেকেই বলছেন, শত অভিযোগ থাকলেও দেশের প্রচলিত আইনে সোহেলের বিরুদ্ধে এতদিন ব্যবস্থা নেয়া হলো না কেন?

প্রসঙ্গত, সারা দেশে এবং চট্টগ্রামে গণপিটুনির ঘটনা বেড়েই চলছে। বিচারহীনতার কারণে বিক্ষুদ্ধ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ভোর রাতে উপজেলার ঊনসত্তর পাড়া এলাকার গৌরীশংকর হাট এলাকার সিরাজ কলোনিতে দীর্ঘদিনের ‘কথিত’ ডাকাতির উৎপাতের কারণে এই গণপিটুনি ঘটেছে বলে দাবি ছিলো পুলিশের। এই ঘটনার মাত্র ৫ দিন আগে নগরীর খুলশী থানার লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এলাকায়  একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হারুন রশিদ নামের এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে স্থানীয়রা। এর আগে নগরীর আকবর শাহ থানার উত্তর কাট্টলী বেড়িবাঁধে গণপিটুনিতে তিন ডাকাত নিহতের ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এর আগে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হয়। ভোর রাতে উপজেলার ঊনসত্তর পাড়া এলাকার গৌরীশংকর হাট এলাকার সিরাজ কলোনিতে এ ঘটনা ঘটে।

গণপিটুনির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভারতীয় নাগরিকদের প্রতিবাদ

সমাজে গণপিটুনির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজীব নন্দী। ‘ভারত-বাংলাদেশে গণপিটুনির প্রবণতা ও ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার’ শিরোনামে তাঁর একটি গবেষণা প্রবন্ধ সম্প্রতি ভারতের ভূবনেশ্বরের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশে গণপিটুনির প্রবণতা নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আপাতদৃশ্যে অসংগঠিত কিন্তু উত্তেজিত জনতার ভীড় থেকেই গণপিটুনির সৃষ্টি। এই উত্তেজিত জনসমষ্টি সাময়িককালের জন্য হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে আচরণ করে। মানুষের চিন্তা ও স্বাভাবিক  আলাপের মাধ্যমেও যে সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা রয়েছে, সেটা এই গণ-মনস্তত্ত্ব মিলে নষ্ট করে দেয়। এক কথায়, মানুষের বিচারবুদ্ধি ও যুক্তিবোধ তখন ভোঁতা হয়ে যায়।

দেশে গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছে কেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সমাজে যখন বলপ্রয়োগ এবং আধিপত্যই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক প্রবণতা, তখন মানুষ যুক্তিবাদী বা সহিষ্ণু হতে ভুলে যায়। তার পাশাপাশি মানুষ যখন আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারায়, তখন উত্তেজিত জনতা সম্মিলিতভাবে বিচার হাতে তুলে নেয়, যার নাম- গণপিটুনি।

গণপিটুনির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভারতীয় নাগরিকদের প্রতিবাদ

‘ভারত-বাংলাদেশে গণপিটুনির প্রবণতা ও ভয়ের সংস্কৃতির বিস্তার’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৭ ও ১৮ সালে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে ৫০ জন গণপিটুনীতে মারা গেছেন বলে জানা গেলেও এই সংখ্যাটি পরিপূর্ণ নয়। জয়নিউজকে গবেষক বলেন, গণপিটুনির ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতে পুলিশী ভাষ্য হলো তারা হুজুগে জনতাকে সমালাতে পারেন না। গণপিটুনির সেবচেয়ে জনপ্রিয় কারণ হিসেবে বলা হয়- মানুষের মধ্যে জমাট বাধা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটছে গণপিটুনির ঘটনায়। সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশিত ঘটনাগুলোই কেবল মানবাধিকার সংগঠনগুলো পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনায় রাখেন। এর অগোচরে অনেক গণপিটুনির ঘটনা জানা সম্ভব হয় না।

গবেষক রাজীব নন্দী জয়নিউজকে বলেন, বাংলাদেশে ঢাকার অদূরে আমিনবাজারে গণপিটুনিতে ডাকাত সন্দেহে ছয়জন ছাত্রের মৃত্যু এবং কোম্পানিগঞ্জে কথিত জলদস্যু সন্দেহে সাতজনকে মৃত্যুর ঘটনা জাতিকে নাড়া দিয়েছিলো। বেশ বড় ধরণের প্রতিবাদ হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও গণপিটুনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় অব্যাহত আছে এবং গণপিটুনিতে মানুষ মারার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তার মানে, বিষয়টি নিয়ে বিশদে সমাজ-মনোবিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানে গবেষণা হওয়া দরকার।

প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিককালে গণপিটুনির ঘটনাগুলো নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে ছেলেধরা এবং পকেটমার সন্দেহে দেশে ব্যাপকহারে গণপিটুনির ঘটনা ঘটতো। সম্প্রতি যেখানে যুক্ত হয়েছে মোবাইল চুরি। প্রবাদ আছে, গুজবে কান দিতে নেই। কিন্তু গুজব এবং হুজুগে পড়ে মানুষ ঠিকই উত্তেজিত হচ্ছে এবং হরেহামেশা গণপিটুনির ঘটনা ঘটাচ্ছে। যখন পুলিশের শীর্ষ পদের একজন এই সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকায় গণপিটুনি দিচ্ছে মানুষ।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...