সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে সিএমপির নেই আলাদা ইউনিট

0

বদলে গেছে অপরাধের ধরন। গতানুগতিক চুরি, ছিনতাই, পকেটমার এসবের মাত্রা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু বেড়ে গেছে সাইবার ক্রাইম। তবে এ ধারার অপরাধ বাড়লেও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাছে এটা প্রতিরোধের জন্য নেই কোনো আলাদা ইউনিট। নগর গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরাই এ সংক্রান্ত মামলাগুলো দেখভাল করেন এবং প্রতিকারের চেষ্টা করেন।

সাইবার ক্রাইম কি: সাইবার ক্রাইম বলতে সাধারণত ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্মার্টফোন অথবা কম্পিউটারে কারো ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য চুরি করে ব্ল্যাকমেল বা ক্ষতি করার চেষ্টাকে বোঝায়। তবে সাইবার ক্রাইমেরও রয়েছে নানা ধরন।

পরিচয় চুরি: আজকাল অনলাইনে কেনাকাটা করছেন অনেকে ৷ এরজন্য নাম, ঠিকানা, ই-মেল, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ইত্যাদি দিতে হয়৷ সমস্যাটা এখানেই৷ যেসব ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো নয়, সেখানে এই তথ্যগুলো দিলে তা অপরাধীর কাছে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকে৷ সেক্ষেত্রে অপরাধী আপনার তথ্য ব্যবহার করে আপনার ক্রেডিট কার্ড শূন্য করে দিতে পারে। কারণ আপনার পরিচয় যে চুরি হয়ে গেছে!

স্প্যাম ও ফিশিং: একদিন ই-মেল খুলে দেখলেন আপনি অনেক টাকার লটারি জিতেছেন৷ সেটা পেতে আপনাকে কিছু তথ্য দিতে বলা হচ্ছে৷ হঠাৎ করে বড়লোক হওয়ার লোভে আপনি সেই তথ্যগুলো দিয়েও দিলেন৷ ব্যস, যা হবার হয়ে গেল৷ পরে দেখলেন টাকা পাওয়ার বদলে আপনার কাছে যা আছে সেটাও চলে যাচ্ছে! অর্থাৎ আপনি ফিশিং-এর শিকার হয়েছেন৷

ব়্যানসমওয়্যার: উন্নত বিশ্বে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে৷ অপরাধীরা ম্যালওয়্যার ঢুকিয়ে অন্যের কম্পিউটারের ফাইলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়৷ তারপর ওই কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠায়, ফাইল ফেরত পেতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হবে ৷
সাইবার মবিং বা সাইবারবুলিং: হয়তো মজা করার জন্য কিংবা ইচ্ছে করে একজনকে কষ্ট দিতে তার বন্ধুরা একজোট হয়ে হয়রানি করে থাকে৷ বাস্তবে স্কুল-কলেজে এমনটা হয়ে থাকে ৷ আজকাল ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে ওঠায় ভার্চুয়াল জগতে এমন ঘটনা ঘটছে ৷ কিন্তু অনেক সময় বিষয়টি আর মজার পর্যায়ে না থেকে ভয়ানক হয়ে ওঠে ৷ যাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছে, সে এমন কিছু করে বসে যা কারও কাম্য থাকে না ৷

ম্যালভার্টাইজিং: ধরুন আপনি কোনো ওয়েবসাইটে আছেন ৷ সেখানে একটি বিজ্ঞাপন দেখে ক্লিক করলেন ৷ ব্যস, আপনার কম্পিউটারে একটি কোড ডাউনলোড হয়ে গেল ৷ এটি কোনো নিরীহ কোড নয় ৷ অপরাধীরা এর মাধ্যমে আপনাকে হয়রানির পরিকল্পনা করবে ৷
ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড স্কিমিং: রেস্টুরেন্ট, সুপারমার্কেটের বিল পরিশোধ, এটিএম থেকে টাকা তোলা, অর্থাৎ এমন কোথাও যেখানে আপনার ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডকে যন্ত্রের মধ্যে ঢোকাতে হয়, সেখান থেকেও তথ্য চুরি হতে পারে ৷ এটাই কার্ড স্কিমিং৷ স্কিমার যন্ত্রের মাধ্যমে এই তথ্য চুরি করা হয় বলে এর এমন নামকরণ হয়েছে ৷

ফোন ফ্রড: অচেনা কোনো নম্বর থেকে (বিশেষ করে বিদেশ থেকে) মিসড কল পেলে সঙ্গে সঙ্গে কলব্যাক না করাই ভালো ৷ কারণ কে জানে হয়তো ফোন ফ্রড অপরাধীরা এই কলটি করেছিলেন ৷ আর আপনি কলব্যাক করতে যে টাকা খরচ করলেন, তার একটি অংশ পেয়ে গেল অপরাধীরা!
নগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গড়ে এখন প্রতিমাসে ১০-১৫টি সাইবার ক্রাইমের মামলা আসে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না। অনেকক্ষেত্রে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়েই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। এসব অপরাধের বেশিরভাগই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও মোবাইল ব্যাংকিংভিত্তিক। বিশেষ করে ফেসবুক থেকে মেয়েদের ছবি নিয়ে তা আপত্তিকরভাবে এডিট করে অনলাইনে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি, প্রেমের প্রলোভনে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও করে সেগুলো ভাইরাল করে দেওয়া, সিম কার্ড ক্লোনিং করে বিকাশ কিংবা রকেট একাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

তবে সাইবার ক্রাইম রুখতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনের আওতায় অপরাধীদের জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে অনেকেই জানেন না এ আইন সম্পর্কে।

আইনে বলা হয়েছে, বেআইনিভাবে কারো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে তাকে ৭ বছরের জেল ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হবে৷ এছাড়া বেআইনিভাবে অন্য সাইটে প্রবেশ করার পর যদি কেউ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷

কেউ যদি বেআইনিভাবে কারও ডিভাইসে প্রবেশ করেন, তাহলে এক বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷ কেউ যদি কারও ডিভাইসে প্রবেশে সহায়তা করেন, তাহলে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে৷

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যদি জনগণকে ভয় দেখায় এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করে, তাহলে তার ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে৷

২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখান, তাহলে তাকে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে ৷

৩০ ধারায় বলা হয়েছে, না জানিয়ে কেউ যদি কোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করে ব্যাংক-বীমায় ই-ট্রানজেকশন করেন, তাহলে তাকে পাঁচ বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে ৷

৩১ ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করলে তাকে সাত বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে৷

এই আইনের ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৪ ধারার সব অপরাধ জামিন অযোগ্য৷ তবে ২০, ২৫, ২৯ এবং ৪৮ ধারার সব অপরাধ জামিনযোগ্য ৷

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) এস এম মোস্তাইন হোসাইন জয়নিউজকে বলেন, বর্তমানে সাইবার ক্রাইম বেড়ে গেছে এ কথা সত্য। তবে চট্টগ্রামে সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে আলাদা কোনো ইউনিট নেই। গোয়েন্দা পুলিশের কিছু সদস্য ঢাকার সাইবার ক্রাইম ইউনিট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে মামলাগুলো দেখভাল করেন। তবে দেশের প্রতিটি বিভাগেই সাইবার ক্রাইমের আলাদা ইউনিট খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, যুবসমাজ, বিশেষ করে টিনএজাররা সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে বেশি। তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের এ বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। প্রযুক্তির যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি খারাপ দিকও আছে। ভালো দিকটা গ্রহণ করে খারাপ দিক থেকে দূরে থাকতে হবে।

জয়নিউজ/আরসি
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...