ভারতের পত্রিকায় ‘যুদ্ধংদেহি’ মেজাজ

মিডিয়া বিশ্লেষণ

0

দুই দেশের সীমান্ত যুদ্ধের উত্তাপ লেগেছে ভারতের দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায়। মোদী সরকার সমস্ত প্রস্তুতি সেরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছে যাতে দু-মিনিটেই পাকিস্তানের দিকে উড়তে পারে বায়ুসেনার বিমান। সংবাদকক্ষগুলোও সেজেছে যুদ্ধংদেহি মেজাজে! পড়ুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও জয়নিউজের পরামর্শক সম্পাদকের তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণ-

সভ্যতার আলোচিত শব্দ ‘যুদ্ধ’।  যুদ্ধের একপিঠে রক্ত আর ক্ষয়, অপরপিঠে হত্যা আর জয়। যুদ্ধ কখনো নীরবে, স্নায়ুঘাতি। কখনো সুসংগঠিত। কখনো আবার দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ। যুদ্ধ সহিংস একটি দিক যা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। সম্প্রতি উপমহাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দুই দেশ ভারত-পাকিস্তান জড়িয়ে পড়েছে ‍যুদ্ধে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ২-এর পর সীমান্তের আকাশে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে এসেছে ভারতে। পাল্টা উত্তর দিতে তৎপর পাকিস্তান। ভারতও এগিয়ে গেলো আকাশসীমা লঙ্ঘন করা পাক বিমানকে উচিত শিক্ষা দিতে। সবমিলিয়ে গত ৭২ ঘণ্টা ধরে দুই দেশের সীমান্ত উত্তপ্ত হয়ে আছে। নগর পুড়লে যেমন দেবালয় এড়ায় না, সীমান্তের উত্তাপ তাই এসে পৌঁছুলো ভারতের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পৃষ্ঠায়।

পৃথিবীর সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা ভাষার দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা যুদ্ধের আবহে গ্রাফিক্স করে প্রধান শিরোনাম করেছে- ’প্রত্যাঘাত’! মাত্র একটি শব্দে ভারতের পাল্টা হামলাকে বুঝিয়েছে এই পত্রিকাটি। সংবাদ প্রতিদিন প্রধান শিরোনাম করেছে- ’পাকিস্তানে ঢুকেই বদলা’। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নামের সঙ্গে শ্লেষ করে উত্তরবঙ্গ সংবাদ লিখেছে- ‘ইমরান খান খান’! এই সময় পত্রিকার মাস্ট হেডের ব্যাকগ্রাউন্ডে মিসাইলের গ্রাফিক্সের সঙ্গে প্রধান সংবাদে লেখা হয়েছে- ‘লা- জবাব’!

হিন্দিভাষী পত্রিকাগুলোর চেহারাও যথারীতি যুদ্ধং দেহি! দৈনিক জাগরণ লিখেছে ‘পুলওয়ামার প্রতিশোধ’। এই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে যুদ্ধ ও মিসাইলের গ্রাফিক্স। যেখানে বোঝানো হয়েছে- ভারতীয় বায়ুসেনার পাকিস্তান অভিমুখে ছুটে যাওয়ার দৃশ্য! হিন্দুস্তান পত্রিকা প্রধান শিরোনাম করেছে ‘হামলা সন্ত্রাসকেই’। প্রধান শিরোনামের পাশাপাশি পত্রিকাটির বিশেষ গ্রাফিক্স দেওয়া হয়েছে। দৈনিক ভাস্কর পত্রিকা লিখেছে ‘৪৮ বছর পর ভারতীয় বিমানবাহিনী পাক সীমা পেরিয়ে উড়িয়ে দিল আতঙ্কবাদীদের ডেরা’। প্রভাত খবর পত্রিকার প্রধান শিরোনাম- ‘পুলওয়ামার প্রতিশোধ: ভারতের মঙ্গলবার’। রাজস্থান পত্রিকা লিখেছে-‘পাকিস্তানে ঢুকেই হামলা’। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের গ্রাফিক্স এই পৃষ্ঠাসজ্জায় এনেছে বিশেষেত্ব। যুদ্ধের ভয়াবহতার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে অমর উজালা পত্রিকার প্রধান শিরোনাম করা হয়েছে ‘পাকিস্তানে ঢুকে জইশের ৩ ডেরা ধ্বংস’।

The Times of India লিখেছে- ’INDIA’S AVENGING FORCE’, যার ভেতর প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের সংক্ষিপ্তরূপ। Hindustan Times এর প্রধান শিরোনাম- ‘TERROR ATTACKED’। The Telegraph অনেকটা সম্পাদকীয় ভাষ্যে প্রধান শিরোনাম লিখেছে ’Chosse Wisely’। ভারতের অন্যতম ইংরেজি দৈনিক The Hindu লিখেছে ’India bombs Jaish camp in Pakistan’s Balakot’। অপর একটি পত্রিকা The Indian EXPRESS লিখেছে ‘India strikes terror, deep in Pak’। DNA পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘IAF hits jaish camp with josh’।

সাধারণভাবে ভারতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর আধেয় বিশ্লেষণ করে জানা যায়, উল্লেখিত সংবাদপত্রের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ পত্রিকাই যুদ্ধকে সরাসরি উৎসাহিত না করলেও যুদ্ধে ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ধারণ করেছে। এক অর্থে তা পাকিস্তান বিরোধী দীর্ঘদিন ধরে লালিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমে (দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা) এই মেজাজ এক অর্থে সীমান্ত উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ। লেখায় ব্যবহৃত সংবাদপত্রের প্রথম পাতার ছবিগুলোর জন্য কলকাতার সাংবাদিকতার শিক্ষক ড. উমা শঙ্কর পাণ্ডে, আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার ছবির জন্য ওই পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক অনমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং হিন্দি শিরোনামের অনুবাদ সহযোগিতার জন্য কলকাতার শিক্ষক-গবেষক সুমনা পাত্রকে বিশেষ ধন্যবাদ।

লেখক: রাজীব নন্দী
পরামর্শক সম্পাদক, জয়নিউজ; সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চবি।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...