মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রমা চৌধুরীর এখন আপনাকে প্রয়োজন

0

রমা- বাংলা একাডেমির অভিধানে এ নামের অর্থ ‘দেবী লক্ষ্মী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী ‘লক্ষ্মী’। সনাতনীদের মতে, লক্ষ্মী ধন-সম্পদের দেবী। তবে চট্টগ্রামের রমা চৌধুরীর নামের সঙ্গে আভিধানিক এ অর্থ ঠিক যেন বিপরীত। নামে ‘রমা’ হলেও তাঁর সারাটা জীবনই কেটেছে দারিদ্র্যতার সঙ্গে সংগ্রাম করে।

চট্টগ্রামে দুর্ভাগা এক নারীর নাম ‘রমা চৌধুরী’। যিনি একাত্তরে হারিয়েছেন সম্ভ্রম, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে হারিয়েছেন তিন ছেলে (প্রথম দুই ছেলে মারা যায় শ্বাসকষ্টে, আরেক ছেলে মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়)।

এতকিছুর পরও একাত্তরের এই বীরাঙ্গনা জীবন কাটিয়েছেন বীর দর্পে। সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণা আর সীমাহীন দারিদ্রতা সঙ্গী করে কেটেছে তাঁর সংগ্রামী জীবন। জীবনের কঠিন সংগ্রামে কখনো কোনো সহায়তা নেননি। এমনকি সরকার নিজ থেকে এগিয়ে এলেও বিনয়চিত্তে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

১৯৪১ সালে বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে রমা চৌধুরীর জন্ম। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে মাস্টার্স করা রমা দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)।

উত্তাল একাত্তরের ১৩ মে ভোরে নিজ বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসরদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন রমা চৌধুরী। সম্ভ্রম হারানো রমা কোনোরকমে প্রাণে বেঁচেছিলেন পুকুরে নেমে। তবে হানাদাররা গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘর।

এরপরও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি রমা চৌধুরী। শিক্ষক হিসেবে চলে তাঁর জীবন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর ২০ বছর তিনি লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নেন। কোনোরকমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিজের লেখা বই প্রকাশ করে তা ফেরি করে বিক্রি করতে শুরু করেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে এ পর্যন্ত তিনি ১৯টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর টানা চার বছর জুতো পড়েননি রমা চৌধুরী। এরপর নিকটজনের পীড়াপিড়িতে অনিয়মিতভাবে জুতো পড়া শুরু করলেও তৃতীয় সন্তান মারা যাওয়ার পর ফের জুতো পড়া ছেড়ে দেন। জুতো ছাড়াই ১৫ বছর ধরে পথ চলছেন রমা।

এমন অজস্র কথা বলা যাবে রমা চৌধুরীকে নিয়ে। তবে হালের বাস্তবতা হলো- জীবনযুদ্ধে মাথা নত না করা সেই রমা চৌধুরী এখন অসহায়। দীর্ঘ আটটি মাস তিনি কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বেডে শুয়ে।

গতবছরের ২৩ ডিসেম্বর পড়ে গিয়ে কোমরে ফ্রাকচার হয়েছিল। সেদিনই ভর্তি করা হয় মেডিকেল সেন্টারে। এরপর ১৭ জানুয়ারি তাঁকে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকলে কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ডিসচার্জ দিলে ২৬ মার্চ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালীতে। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর রক্তবমি হলে ফের ভর্তি করা হয় চমেক হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন, ‘তাঁকে দূরে নেওয়া যাবে না। নগরেই রাখতে হবে রমা চৌধুরীকে।’ কিন্তু রমার যে শহরে কোনো বাসা নেই! অথচ এজমা, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত রমা।

রমা চৌধুরীকে নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই এই বীরাঙ্গনাকে গণভবনে ডেকে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বীরঙ্গনার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর কি প্রয়োজন? উত্তরে রমা শুধু বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে শুধু আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে দেন। আমার আর কিছু প্রয়োজন নেই।

জীবনে কখনো কোনো আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেননি রমা চৌধুরী। এমনকি নেননি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও। আজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচা এই বীরের আজ অসহায় অবস্থা।

এক স্বজনহারা নারীই আরেক স্বজনহারা নারীর কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। স্বজন হারানোর যন্ত্রণা কতটা ভয়াবহ তা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে কেউ বেশি উপলব্ধি করেছেন বলে মনে হয় না। বিশ্বে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মতো ক’জন প্রধানমন্ত্রীকে এমন যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে প্রশ্ন করা হলে ইতিহাস নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপানি মানবদরদী। আপনি এর আগেও অজস্রবার দেখিয়েছেন আপনার হৃদয় কতটা বিশাল। আমাদের বিশ্বাস, আপনি আরো একবার এটি দেখিয়ে দিবেন রমা চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে।

 

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রমা চৌধুরীর এখন আপনাকে খুব বেশি প্রয়োজন। একজন স্বজনহারা নারী হিসেবে আপনাকে প্রয়োজন। জীবনযুদ্ধের একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে আপনাকে প্রয়োজন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে পাশে পেলে রমা চৌধুরী হয়ত আবার নতুনভাবে বাঁচার শক্তি পাবেন। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস করবেন। যদি তাও না হয়, এরপরও তিনি শান্তি পাবেন। অন্তত এই ভেবে, জীবনের সাঁঝবেলায় তিনি পাশে পেয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুতনয়াকে।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...