ডিসেম্বরে চালু হতে পারে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল

0

পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের ১৭ শতাংশ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে ২০১৭ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বন্দরে কনটেইনার উঠানামার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালটি নির্মিত হচ্ছে। এ টার্মিনালে তিনটি সাধারণ জেটি ও একটি ডলফিন জেটি থাকবে। এতে তিনটি জাহাজ একসঙ্গে ভেড়ানোর সুবিধা থাকবে। এ টার্মিনালে ৪ লাখ ৪৫ হাজার কনটেইনার উঠানামার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে। গত বছরের ২৩ নভেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পের স্থায়ী ব্যারাক নির্মাণ, বালি ভরাট, ভূমি উন্নয়ন, নতুন প্রস্তাবিত সড়ক, বক্স কালভার্ট ও ড্রেন নির্মাণের কাজ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে শেষ করেছে। এছাড়া জেটি নির্মাণের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ঠিকাদার।

পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান সরকার জয়নিউজকে জানান, এটিকে একটি আধুনিকমানের স্বয়ংসম্পূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। এ টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত থাকবে রেললাইন। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ১৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ কাজে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যয় হচ্ছে ৮০০ কোটি টাকা।

জানা গেছে, এ টার্মিনালে ৩২ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত হবে ৬০০ মিটার দীর্ঘ তিনটি জেটি। থাকবে ২২০ মিটার দীর্ঘ একটি ডলফিন জেটি ও ১ লাখ ১২ হাজার বর্গমিটার অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড এবং সড়ক। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন শেড, ৬ মিটার উঁচু ও ১ হাজার ৭৫০ মিটার প্রশস্ত কাস্টমস বন্ডেড ওয়াল, ৫ হাজার ৫৮০ পোর্ট অফিস বিল্ডিং, ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার যান্ত্রিক ও মেরামত কারখানা, ২ হাজার ৫০০ মিটার রেলওয়ে ট্রাক নির্মাণ, ৪২০ মিটার ফ্লাইওভার নির্মাণ, ৪ লেনের শূন্য দশমিক ৭৫ কিলোমিটার এবং ৬ লেনের ১ কিলোমিটার সড়ক পুনঃনির্মাণ, সিকিউরিটি পোস্ট, গেস্ট হাউস, ফুয়েল স্টেশন এবং লেবার শেড নির্মাণ করা হবে।

এছাড়া টার্মিনাল পরিচালনা কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও কেনা হচ্ছে এ প্রকল্পের অধীনে। এর মধ্যে রয়েছে ২টি ফায়ার ট্রাক, ১টি ফায়ার কার, ৩টি নিরাপত্তা পেট্রোল কার, ১টি অ্যাম্বুলেন্স, ৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৪টি স্ট্রাডেল কেরিয়ার, ৪টি রিচ স্ট্যাকার, ৮টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৪টি লো-মাস্ট ফর্ক লিফট, ৪টি ফর্ক লিফট, ১টি রেইল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেন, ২টি টাগ বোট, ২টি পাইলট বোট এবং ২টি ফাস্ট স্পিড বোট।

প্রকল্পের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান সরকার আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জেটি রয়েছে ১৯টি। একইসঙ্গে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে বন্দরের প্রবৃদ্ধি। জেটিগুলো ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। পরবর্তী সময়ে যেন প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত না হয় তাই বিকল্প হিসেবে নির্মাণ হচ্ছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। এ টার্মিনালের নির্মাণ কাজের ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হলে কেনা হবে যন্ত্রপাতি।

কেন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটি টার্মিনালে আমদানি-রপ্তানির কার্গো ও কনটেইনার জাহাজ বার্থিংয়ের জন্য ১৯টি জেটি রয়েছে, যেগুলোর দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার এবং কনটেইনার সংরক্ষণের জন্য রয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার কনটেইনার ইয়ার্ড। বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ। এই হারে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে ২০২১ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করতে হবে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ না হলে ক্রমান্বয়ে বন্দরের সক্ষমতার ঘাটতি বাড়তে থাকবে।

স্ট্রাট্রেজিক মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর বছরে ৩ হাজার ২৮৯টি জাহাজ বার্থিং করার সক্ষমতা অর্জন করবে। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মিটার জেটি প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমানে বন্দরে ৩ হাজার ৬৩০ মিটার জেটি আছে। তাই বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখে ও পরিকল্পিত টার্মিনাল নির্মাণের কাজগুলো যথাসময়ে শুরু করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০১৯ সালের মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ করার কোনো বিকল্প নেই। এতে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং ও কনটেইনার ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, জেটিগুলোতে ও বহির্নোঙ্গরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল হ্রাস পাবে।

সাড়ে চার লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করবে পিসিটি
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের শতভাগ হয়ে থাকে জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটিতে। মোট কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে জিসিবির একার অংশীদারিত্ব ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ। পিসিটি বাস্তবায়ন হলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বছরে প্রায় সাড়ে চার লাখ টিইইউস।

ভিড়তে পারবে সাড়ে নয় মিটার ড্রাফটের জাহাজ
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে বন্দরের বর্তমান জেটির মতো সাড়ে ৯ মিটারের ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের জায়গাটিতে ড্রাফট ভালো থাকায় স্বাভাবিকভাবেই সাড়ে ৯ মিটার জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে এই স্থানে ৭ মিটার ড্রাফট রয়েছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অবশিষ্ট ড্রাফট বাড়ানো হবে। কর্ণফুলী চ্যানেলের বড় বাঁকের আগে টার্মিনালটি হচ্ছে বলে এখানে জাহাজ ভেড়াতে ক্যাপ্টেনদের কম বেগ পেতে হবে। ফলে বহির্নোঙ্গর থেকে অল্প সময়ে জেটিতে ভিড়ে কনটেইনার খালাস করে সহজেই চলে যেতে পারবে। এতে একদিকে সময় সাশ্রয় হবে অন্যদিকে কনটেইনার পরিবহনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

জয়নিউজ/জুলফিকার
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...