আজব শহর ‘ঢাকা’

0

‘মোস্ট ডেঞ্জারাস অ্যানিমেল’ বলে একটা অনুষ্ঠান দেখছিলাম টিভিতে। গন্ডার সেই তালিকায় দুই নাম্বারে। প্রতি বছর হাজার হাজার লোক নাকি মারা যায় এই গন্ডারের আক্রমনে। নানা বিস্ময়কর তথ্যে ভরপুর সেই ডকুমেন্টারির এক পর্যায়ে সদ্যই নদী থেকে উঠে আসা একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গন্ডার কথা নেই বার্তা নেই জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে এঁটেল মাটির আঠালো কাদা পানিতে গলা ডুবিয়ে বসে পড়লো। আমি হায় হায় করে উঠলাম। এ কি!

আরে ব্যাটা নদী থেকে এত সুন্দর করে গোসলই যদি করে আসলি, এসেই আবার কাদার মধ্যে বসে পড়লি কেন? নোংরা হয়ে গেল না শরীরটা? আমার এই অস্বস্তির কথা বোধকরি টের পেলেন ডকুমেন্টরির ন্যারেটরও। তিনি একটু কৌতুকের সুরেই বললেন, যাদের মনে গন্ডারের কাদায় বসা নিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে তাদের মনে রাখা উচিত, কাদাতে থাকাতেই তাদের সুখ!

কথাটা শোনার সাথে সাথেই চট করে আমার একটা সাম্প্রতিক অস্বস্তিও দুর হয়ে গেল। বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকা দ্বিতীয় হওয়ায় আমার ফেসবুকের একটা বড় অংশকে কয়েকদিন হয় খুব অদ্ভুত কিছু স্ট্যাটাস দিতে দেখছিলাম। সেসবের মমার্থ না করতে পেরে দুইদিন খুব অস্বস্তিতেও ছিলাম। তাদের মূল বক্তব্য হলো সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য একটা পক্ষ এমন জরিপ করে ঢাকাকে এমন র‌্যাংকিং দিয়েছে। ঢাকা আসলে মোটেও নগর হিসেবে খারাপ না। পুরোটাই ষড়যন্ত্র!

আমি বুঝতে পারছিলাম এদের কারওরই ঢাকার জীবন হয়তো শুরু হয়নি আরামবাগের নোংরা স্যাতস্যাতে অন্ধকার মেসে, এরা কখনো লোকাল বাস বা টেম্পুতে চড়ে ঘামতে ঘামতে স্কুল কলেজে যায়নি, এদের কখনো পরীক্ষার আগের রাতগুলোয় বাবে রহমতের মাইকের শব্দের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধ করতে হয়নি, এদের কখনো মতিঝিল ৬ নাম্বার বাস থেকে হেলপার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর ইঞ্চি খানেকের জন্য পেছনের চাকায় না পড়ার ভয়াভয় অভিজ্ঞতা হয়নি, এদের কখনো পরীক্ষার দিন রিকশাসহ নোংরা পানিতে উল্টে পড়ে ভেজা কাপড়েই হলে বসে তিন ঘন্টা পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি, এদের কখনো ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া হিসেবে বাড়িওয়ালার অমানুষিক মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি…!

ঢাকায় আসার শুরুর দিকে আমার মনে হতো নগর বুঝি এমনই। এভাবে লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই শহর। এখানে হাত পা ছড়িয়ে দৌঁড়ানো যাবে না, এখানে আকাশ দেখা যাবে না, শীতকালে এখানে ধুলার কারণে নিশ্বাস নেওয়া যাবে না, চাইলেই ফুটবল নিয়ে নেমে পড়ার কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না…জ্যামে বসে বসে সেদ্ধ হতে হবে, কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে না…! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে হলে অবশ্যই নগরের বাইরে যেতে হবে।

নগর বলতেই আমরা দেশ বিদেশের উঁচু উঁচু দালান কল্পনা করে ঢাকার দালানকে তাদের সাথে তুলনা করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। সেটা অপরিকল্পিত সেটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। মতিঝিলের ৩২ তালা নিয়ে আমরা গর্ব করেছি। রাতের বেলার এয়ারপোর্ট রোডের ঘুরোনো প্যাঁচানো ফ্ল্যাইওভার দেখে অনেককেই বলতে শুনেছি, দেখ দেখ একদম বিদেশ বিদেশ লাগে।

কিন্তু যতই পড়ছি, যতই ঘুরছি ততই বুঝতে পারছি উঁচু উচুঁ বিল্ডিং, ফ্লাইওভার দিয়ে শহরকে মাপা হয় না কোথাও। শহরকে মাপা হয় তার নাগরিক সুবিধা দিয়ে, তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। একটা নগর তার নাগরিককে কতটা শারীরিক ও মানসিক ভাবে ভালো রাখতে পারলো সেটাই আসল বিষয়। আমি অন্যদের কথা জানি না, আমি আমার ২২ বছরের ঢাকা জীবনে নিজে এবং অন্য কাউকে কখনো ঢাকার নাগরিক জীবনের সুবিধায় ভালো থাকার তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে দেখি নাই। ঢাকার নাগরিক জীবন মানেই গড়পড়তা এমন—জ্যাম ঠেলে অফিস যাওয়া, আবার অফিস থেকে জ্যাম ঠেলে বাসায় ফেরা। অফিস থেকে বের হওয়ার টাইম টেবলবিহীন গাধার খাটুনি, বাচ্চার স্কুল, ব্যবসা করতে গেলে মাস্তান সামলানো আর বিনোদন বলতে টিভিতে টকশো না হয় বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়া। এমন স্ট্রেসফুল জীবন বিশ্বের আরও অনেক নগরেই আছে। কিন্তু সেই সব নগরে স্ট্রেস কাটানোর নানা ব্যবস্থা আছে। ঢাকায় একটা মধ্যবিত্ত বাঙালির স্ট্রেস কমানোর একটা জায়গার কথা বলেন যেখানে সে সহজে অবলীলায় যেতে পারে! যেখানে গিয়ে সে অফিসের পরে একা অথবা পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটাতে পারে। পারবেন বলতে? পারবেন না।

২.
দীর্ঘ আটারো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমি বেশ কিছু শিশু-কিশোরদের পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। বিডিনিউজের কিডজ ডটকম, প্রথম আলোর গোল্লাছুট, কিশোর আলো। সেই সময়গুলোতে প্রায়ই ফোন পেতাম বিদেশ থেকে সামারে ঢাকায় আসা বাবা-মায়ের। তাদের একটাই প্রশ্ন, এক সপ্তাহ হয় ঢাকায় এসেছি, ঘরে থাকতে থাকতে বাচ্চাটার অবস্থা খারাপ, ওকে নিয়ে ঢাকায় কোথায় যেতে পারি? বাসার কেউ বলতে পারছে না ঠিকমতো আপনি কি কিছু সাজেস্ট করতে পারেন? আমি নিজেও খুব অসহায় বোধ করতাম এই প্রশ্নটা শুনে। কী বলবো তাদের? শিশু পার্কে যেতে? বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেতে, চিড়িয়াখানায় যেতে? এই ঢাকায় বাচ্চাদের জন্য আমরা ঠিকমতো একটা পার্ক বানিয়ে মেইনটেইন করতে পারিনি, একটা ইনডোর খেলার জায়গা বানাতে পারিনি, একটা ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারিনি, একটা সাইকেল চালানোর জায়গার ব্যবস্থা করতে পারিনি, শিশুপার্কটাকেও শিশুবান্ধব রাখতে পারিনি। আমাদের স্কুলগুলোও আমরা জেলখানা বানিয়ে ফেলেছি পড়াশোনা আর পরীক্ষার বোঝা দিয়ে। বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে আবার কোচিংয়ে যাচ্ছে, আমরাও গাধার মতো তাদের পেছনে খরচ করে যাচ্ছি আর জিপিএ ফাইভ পেলে খুব মিষ্টি বিলিয়ে বেড়াচ্ছি। একটা বাচ্চার শৈশব আর কৈশোর কেমন হওয়া উচিত একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো! কেমন? এখন আপনার সন্তান যেমন কাটাচ্ছে তেমন? ঢাকা কি একটা নগর হিসেবে শিশুবান্ধব?

শিশুবান্ধব বা প্রতিবন্ধীবান্ধব দূরের কথা, ঢাকা তো মানুষবান্ধবই না। এই শহরে একা থাকলে একটা মেয়েকে ঘরে ফিরতে হয় সন্ধ্যা লাগলেই, তাদের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের গেট বন্ধ হয়ে যায় খানিক বাদেই, ভাড়াটিয়া তরুণদেরও ১১টার পর কোথাও ফেরার উপায় থাকে না। গ্যাসের উপর ‘ভাসা’ এই দেশের রাজধানীর অনেক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দিনের পর দিন রান্নার গ্যাস থাকে না, খাবার পানি থাকে না, বিদ্যুত থাকে না, এ শহরে কাজের মেয়েদের লিফটে উঠা বারণ, এ শহরে একা একটা মেয়ে ফুটপাত দিয়ে এক কিলোমিটার হাঁটলে ন্যূনতম ৫ বার অনাকাঙ্খিত হাত এসে ছুঁয়ে দেয়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কলঙ্ক ছালবাকল উঠে যাওয়া যেই বাসগুলো রাস্তায় চলে সেসবে পুরুষরাই উঠতে পারে না ভিড় ঠেলে, মেয়েরা যদিও কেউ উঠে কী অবর্ননীয় দুর্ভোগ তাদের! নেই পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, ফলে রাস্তাঘাট ভেসে যায় মানুষের মূত্রকর্মে, ঠিকভাবে দেখে না হাঁটলে মনুষ্য বিষ্টা পায়ে লাগলে যে পা-টা ধোবেন সেই পানির ব্যবস্থাও নাই কোথাও।

ঢাকা দ্বিতীয় হয়েছে এই খবরে অনেকে মর্মাহত হন, মানুষ সেই খবর শেয়ার করলে অনেকে তাকে ঢাকা বিদ্বেষী ভাবেন, ষড়যন্ত্র ছড়াচ্ছে ভাবেন। কিন্তু এই মর্মাহত হওয়া মানুষটা আসলে শহরের কোন এলাকার লোক? তারা কি শহরের এই হাল জানে না? নাকি শহর সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই! তারা এই গরমে এসি গাড়িতে বসেও যে মামের বোতলে টুক করে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে, তার হাতের বাঁ পাশের যে রিকশা চালক, যে পথচারী গরমে ঘেমে নেয়ে ঘন্টাখানেক ধরে একটা পরিবহনে উঠার চেষ্টা করছে তার তেষ্টা পেলে কী হয় সেটা কী একবার ভেবে দেখেছেন? উষ্ণ আবহাওয়ার এই দেশে আমরা কি আমাদের নগরবাসীর জন্য কিছু বিশুদ্ধ পানির কল স্থাপন করতে পেরেছি? নাকি ভেবিছি কখনো? বাড়ি ফিরে সে যে ওয়াসার পানি খাবে সেটাও তো সুয়ারেজের ফেটে যাওয়া লাইনের তীব্র গন্ধযুক্ত পানিই। বাংলার গ্রামে-গঞ্জেও তো জীবন যাপনের এরচেয়ে ভালো ব্যবস্থা থাকে।

নাগরিক জীবনে ভালো থাকার কনসেপ্টটাই সম্ভবত আমরা খুব একটা ভালো করে বুঝতে পারিনি। আমরা মনে করছি ইটের দালানের মাঝে এসি চালিয়ে থাকাই আসলে সুখের জীবন। এই শহরে যে একটা বিনোদনের ব্যবস্থা নাই সেটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নাই। কল্পনা করা যায়, উত্তরার মতো একটা এলাকায় লাখ লাখ লোক থাকে সেখানে একটা লাইব্রেরি নাই, একটা সিনেমা হল নাই, বাচ্চাদের একটা যাওয়ার জায়গা নাই। নগর পরিকল্পনায় বিষয়টা মাথাতেই আনা হয় নাই। একটু জায়গা পেলেই খাল-বিল-পার্ক ভরাট করে আমরা বিল্ডিং তুলে দিয়ে ‘নগর’ গড়ে তুলছি। শুধুই বিল্ডিংয়ের এই নগর লইয়া আমরা কী করিব?

৩.
আমি নিজে কখনো ইউরোপ আমেরিকার কোনো শহরের সাথে ঢাকাকে তুলনা করে মন খারাপ করিনি। নিজের সাথে যুক্তি দিয়েছি, এইসব শহর-দেশ শত শত বছরে নিজেদের ডেভেলপ করেছে। আমদের দেশের বয়স এখনো অর্ধশতই হয়নি। বুঝে উঠতেও তো সময় লাগে। আমাদের দেশের প্রকৌশলীরা ইউরোপ-আমেরিকার নগর পরিকল্পনায় যুক্ত হয়ে সুন্দর সুন্দর নগর তৈরি করেছে, সময় পেলে যেদিন ক্ষেত্র তৈরি হবে নিজের দেশেও পারবে। কিন্তু সম্প্রতি একটি শহরে গিয়ে আমার সেই যুক্তি ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে।

‘নার্কোস’ টিভি সিরিজের কারণে কলম্বিয়ার মেডিজিনের কথা অনেকেই জানেন। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ পর্বতমালার আবুরা উপতক্যার মাঝে অসাধারণ সুন্দর এক শহর মেডিজিন। কলম্বিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি আশির দশকের শেষের দিকে ড্রাগ লর্ড পাবলো এস্কোবারের বোমাবাজি আর গোলাগুলির কারণে একেবারে ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বের ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস সিটি’র তালিকায় এক নাম্বারে উঠে গিয়েছিল মেডিজিন। বছরে খুন হতো গড়ে সাড়ে ৭ হাজার লোক। কলম্বিয়ার সেই সময়ের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামের কথাও অনেকেই শুনে থাকবেন।

১৯৯২ সালে এস্কোবার মারা যাওয়ার পর নগর পরিকল্পনাবিদরা এই ধ্বংসস্তুপের নগরীকে ঠিক করার জন্য এক বিশদ পরিকল্পনা নিয়ে বসলেন। তারা প্রথমেই জোর দিলেন দুটো বিষয়ে, এক যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুই বাসস্থান।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় তারা দেখলেন, কোনো একটা জায়গা যত বেশি দূর্গম তত বেশি ক্রাইম। আর যত ক্রাইম তত বেশি গরীব হয়ে থাকে সেখানকার লোক। পাবলো এস্কোবারের ঘাটিঁ ছিল মেডিজিনের সবচেয়ে দূর্গম ও গরীব এলাকা কমিউনা থার্টিনে। পাহাড়ের উপরের এই কমিউনা থার্টিনে কয়েক লাখ গরীব লোক থাকতো। একদম আমাদের বস্তির মতোই অবস্থা। নগর পরিকল্পনাবিদরা কমিউনা থার্টিন নিয়ে ভাবতে বসে শুরুতেই এর দূর্গম ভাবটা কাটানোর উপায় নিয়ে চিন্তা করলেন। ২৪ তলা দালানের সমান উঁচু এই পাহাড়ের নীচ থেকে উপরে উঠতে খবর হয়ে যায় সবারই। তাই সেখান থেকে বাচ্চারা স্কুলে আসতে পারে না, সেখানকার লোকজন ডেইলি যেতে আসতে হবে এমন কোনো কাজের সাথে জড়িতও হতে পারে না, ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা ড্রাগসহ নানা ক্রাইমে জড়িত।

নগরবিদরা সেখানে একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। খোলা আকাশের নীচে পাহাড়ের গা কেটে চলন্ত সিঁড়ি বসিয়ে দিলেন। পুরো ২৪ তলা এস্কেলেটর। নীচ থেকে যে পাহাড়ে আগে উঠতে এক দেড় ঘন্টা লাগতো সেটা এখন ১০ মিনিটেই উঠে পরা যায়। কমিউনার লোকজন খুব গর্ব করে তাদের এই এস্কেলেটর নিয়ে। নিজেরাই পালা করে পাহারা দেয় কেউ যেন নষ্ট করতে না পারে।

দূর্গম এলাকা সুগম হয়ে উঠতেই সেখানকার লোকেরা ড্রাগস ব্যবসা ছেড়ে সমতলে এসে নানা ধরণের ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি বাকরির সাথে যুক্ত হতে শুরু করলো। বাচ্চারা স্কুলে ঢুকে গেলো। ‘নার্কোস’ টিভি সিরিজের কারনে টুরিস্টরাও এই এলাকায় আসতে শুরু করলো। স্থানীয় প্রশাসন এই সুযোগে এই এলাকার বাড়িঘরে দেশের বিখ্যাত গ্রাফিতি আর্টিস্টদের দিয়ে শতশত গ্রাফিতি করিয়ে ফেলল। পুরো এলাকা হয়ে উঠলো রঙিন। টুরিস্টদের চাহিদা সামাল দিতে পাহাড়ের উপর গড়ে উঠলো সুন্দর রেস্টুরেন্ট, কফিশপ, স্যুভিনির শপ। সেসব বেশিরভাগই চালায় সেখানকার মেয়েরা। এলাকায় এখন ক্রাইম নেই বললেই চলে। চারদিকে হাসিখুশি মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাচ্চারা চিৎকার করে দৌঁড়ে সেখানকার পার্কে খেলছে। স্থানীয়রা টুরিস্টদের জন্য ফ্রিতে সালসা নাচের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চারদিকে এত আনন্দিত মানুষের চেহারা দেখতে এতো ভালো লাগে!

সমতলে বাস-ট্রাম-মেট্রো আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে এস্কেলেটর আর কেবল কার। পুরো মেডিজন শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাকে গত ২০ বছরে সেখানকার নগর পরিকল্পনাবিদরা এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে মেডিজিনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এখন সারা বিশ্বের মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া ‘মেডিজিন মেট্রো’ তাদের অন্যতম গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের প্রায় দশগুণ বড় দেশ কলম্বিয়ার একমাত্র এই শহরেই যে রয়েছে মেট্রোরেল।

এ বছরের জানুয়ারির যে এক সপ্তাহ আমি আর দিয়া মেডিজিনে ছিলাম তার পুরোটা সময় কাটিয়েছি স্থানীয় এক বন্ধুর বাসায়। আমরা প্রতিদিন সকালে পিঠে একটা ছোট্ট ব্যাগ ঝুলিয়ে শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতাম। কত যে অভিজ্ঞতা। মানুষগুলো একদম আমাদের বাংলাদেশের মতোই। খুবই অতিথিপরায়ন। পাড়ায় পাড়ায় ছোট্ট ছোট্ট বেকারিতে গরম গরম বেক হওয়া কেক, চনমনে স্বাদের খাবার, টসটসে ফল, কমিউনিটি পার্কে ছেলেমেয়েদের সাথে ফুটবল খেলে কি যে আনন্দে কেটেছে দিনগুলো। প্রায় দিনই অফিস শেষ করে আমাদের বন্ধুটি যোগ দিতো আমাদের সাথে। সে আমাদের তার প্রিয় প্রিয় জায়গাগুলোতে নিয়ে যেত। কোনদিন অদ্ভুত ফলের জুসের দোকান, কোনদিন ‘বুয়েনস এয়রস’ নেবারহুডের বুদ্ধিজীবি গোছের তরুণদের আড্ডা দেওয়ার স্থান। আমি সেসব জায়গা দেখতাম আর আফসোস করতাম। আমি এই আফসোস কখনোই ইউরোপ-আমেরিকার শহর দেখে করি নাই। দিয়ার সাথে বাংলায় করা আমার আফসোস শুনে একদিন সেই বন্ধুটি কিছুটা আঁচ করে বললো, তুমি মনে হয় আমাদের এই শহর দেখে খুশি না, প্রায়ই দুঃখসূচক দীর্ঘশ্বাস ফেলো।

কারন কি? আমি বললাম দেখো, তোমাদের শহর আমার এতই পছন্দ হয়েছে যে এজন্য আমার নিজের শহরের জন্য বারবার দুঃখ লাগছে। তোমাদের শহরের মানুষ যেমন, আমাদের শহরের মানুষগুলোও ঠিক তেমনই। এখানে যেমন মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি আমাদের শহরেরও একই অবস্থা। মানুষে মানুষে খুব মিল পাচ্ছি কিন্তু এক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে তোমাদের মানুষদের এত সুখী লাগছে দেখতে, এই যে একটু পরপর বাস-ট্রাম-ট্রেন থামছে তা থেকে শতশত হাসিখুশি মানুষ বের হচ্ছে, এই যে একটু পরপর বাচ্চাদের জন্য বানানো ছোট ছোট পার্ক, বড়দের খেলার জায়গা, প্রতি এলাকায় একটা করে লাইব্রেরি, ঝকমকে সিনেমা হল, থিয়েটার, সবুজ পার্কের নিচে পিকনিক করার জায়গা, আড্ডা দেওয়ার জায়গা, এই যে তোমাদের মেয়েরা এই রাত ১২টাতেও কী সুন্দর হাসিখুশি চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, চারদিকে আনন্দ করছে এসব দেখে আমার শহরের লোকদের জন্য খুব দুঃখ হচ্ছে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে এসব দেখলে খারাপ লাগে না। কিন্তু তোমরাও তো আমাদের মতোই তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক, এই তো ২০ বছর আগেও তোমাদের এই শহর ধ্বংসস্তুপ ছিলো, আমাদের চারশো বছরের পুরোনো ঢাকা কেন তোমাদের চাইতে খারাপ থাকবে। সেখানকার মানুষরা কেন এত দুর্ভোগ পোহাবে দিনের পর দিন। তাদের সুখে থাকার কথা ছিল। কেন নেই? এটা নিয়েই আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। এটা কি আমাদের নাগরিকদের দোষ নাকি যারা নগর চালায় তাদের দোষ।

সে বলল, দেখ আমাদের এখানকার লোকরাও খুব ত্যাদড়। বদের হাড্ডিও বলতে পার। সুযোগ পেলেই নিয়ম ভাঙ্গে। তার উপর পাশের দেশ ভেনিজুয়েলার অবস্থা খুব খারাপ। দলে দলে লোক জীবিকার তাগিয়ে এদিকে আসছে। এক সময় কেউই কোনো নিয়ম মানতে চাইতো না। মোটামুটি অরাজক অবস্থাই ছিল বলতে পার। কিন্তু আইনকানুন এত কড়া এখন, কেউ আর নিয়ম ভাঙার সাহস পায় না। বিশাল বিশাল জরিমানা কে দিতে চায়! সাথে রয়েছে ট্রান্সপোর্ট আর নগর প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর অক্লান্ত পরিশ্রম। তোমাদের নিশ্চয়ই এর কোথাও এক জায়গায় ঘাটতি আছে। সেগুলো ঠিক হলেই দেখবে চারদিকের সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবি, আমাদের কোনো এক জায়গায় ঘাটতি না, আমাদের পদে পদে প্যাঁচ লেগে আছে, সবচেয়ে হতাশার হলো আমাদের অনেকে আবার একে প্যাঁচ বলেই মনে করছে না, রাজনীতিবিদরা তো নয়ই! তারা নিজেরাই হাজার হাজার লোককে থামিয়ে দিয়ে, কখনো বিকট হর্ন বাজিয়ে উল্টা রাস্তায় চলে, জনগনের কথা তো বাদই দিলাম।

৪.
অনেককে বলতে শুনছি–ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশের অনেক শহরে ঘুরেছি কিন্তু ঢাকাই বেস্ট। আবেগের কথা হলে ঠিক আছে। নিজের মাতৃভূমি, নিজের বেড়ে উঠার শহর নিয়ে আলাদা আবেগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যিই যখন নাগরিক সুবিধার তুলনা টেনে ঢাকাকে কেউ অন্য শহরের তুলনায় বেস্ট বানাতে চায় তখন আমার সন্দেহ জাগে সত্যিই তারা ইউরোপ আমেরিকার শহরে শহরে ঘুরেছে? ঘুরলে কি সেই শহরের নাগরিক সুবিধাগুলো তারা দেখতে পায়নি। কেন পায়নি? নাকি ঢাকায় বেড়ে ওঠায় না পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যাসে এই সুবিধাগুলোর মর্মই তারা বুঝতে পারেনি, দেখার চোখও হারিয়ে ফেলেছে। সেখানকার কোনো স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কি তারা কখনো কথা বলে জানতে চেয়েছে তারা কেমন আছে? তাদের নাগরিক সুবিধা কি বুঝতে চেয়েছে। তারা কী করে, কীভাবে ভাবে, সেই ভাবনার সাথে আমাদের মিল-অমিলগুলো ধরতে চেষ্টা করেছে? নাকি আইফেল টাওয়ারে এক বেলা ছবি তুলে দুই বেলা ল্যুভ ঘুরে এক বাঙালির বাসায় রাতে আলুভর্তা আর ডাল-মাছ খেয়ে ঢেঁকুড় তুলতে তুলতে খুব প্যারিস দেখলুম বলে পরের ফ্লাইটে রোমের কলসিয়ামে গিয়ে দুটো ছবি তুলে ফিরে এসেছে!

আমি একে খারাপ বলছি না। করতেই পারে কেউ। কিন্তু আমি বলছি, এই দেখা দিয়ে ‘এর চেয়ে ঢাকাই ভালো’ সার্টিফিকেট দেওয়ার আপত্তির কথা। এর সাথে আমি মিল খুঁজে পাই মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে এক সপ্তাহ থেকে জাদুঘর, চিড়িয়াখানা আর শিশুপার্ক দেখার পর যে আত্মীয়টি ‘দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, টিকিট কেটে দে বাড়ি চলে যাই’ বলে তার সাথে। আপনার স্বস্তির সাথে ভালো-মন্দ গুলিয়ে ফেলছেন। প্রত্যেকটা শহরেরই ভালো মন্দ আছে। আপনি যে শহরে গিয়েছেন সেই শহরের সাথে নিজেকে তো কোনোভাবে কানেক্টই করানোর চেষ্টা করলেন না, ভালো লাগাবেন কীভাবে, ভালোটা দেখবেন কীভাবে?

আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশের প্রায় দুই আড়াইশ শহরে ঘুরেছি। সুযোগ পেলেই চেষ্টা করেছি সেই শহরের স্থানীয় লোকজনদের সাথে থাকার। ওদের সাথে কথা বলে, ওদের সাথে ঘুরে ঘুরে শহর দেখার। কোথায় তারা যায়, কী করে, কীভাবে সময় কাটায়, দেশ নিয়ে তারা কী ভাবে, বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ধারণা ইত্যাদি জানার। প্যারিসে গিয়ে যে দম্পত্তির বাসায় তিনরাত ছিলাম তার দুজনই প্যারিস মেট্রোর ডিজাইন টিমে কাজ করে। প্যারিস মেট্রো আগামী বিশ-পঞ্চাশ-একশো বছর নাগাদ কী করতে যাচ্ছে, শহরের কোন দিকে জনসংখ্যার কী পরিমান চাপ হবে, কোন দিকে লাইন নতুন করে তৈরি করতে হবে সে বিষয়ে তার কয়েক ঘন্টার লেকচারেই আমার মাথা ঘুরে উঠেছে—এতদূর তারা ভাবে কীভাবে? আমার অতি আগ্রহ দেখে সে পরদিন আমাদের দেখাতে নিয়ে গেছে কীভাবে মেট্রো লাইন তৈরি হয় সেটা দেখাতে। কাজটাকে তারা যে একটি মহৎ কর্ম এবং জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হিসেবেই নিয়েছে সেটা সেই বিশাল কর্মযজ্ঞ আর তাদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম।

পরের একটা রাত কাটালাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণীর বাসায়। সকালে নাস্তা করতে করতে সে বলল, আমি আজকে হাঁস ধরতে যাচ্ছি, যাবে নাকি আমার সাথে? ব্যাখ্যা করতে বললাম ব্যাপারটা তাকে। সে বলল, প্যারিসের ভেতরে দিয়ে যে নদীটা বয়ে গেছে–ছেন নদী–খেয়াল করে দেখেছ কিনা সেটায় প্রচুর হাঁস আছে। শীত আসছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে এবার ভালোই শীত পড়বে। নদীর উপরের স্তর বরফে জমে যাবে। তাই হাঁসগুলোকে এখনি ধরে শেল্টারে রাখতে হবে না হয় নদীর সাথে সাথে তারাও জমে মারা পড়বে। পরিস্থিতি আবার অনুকুলে এলেই এদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তুমি হয়তবা পুরো প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হতে পারবে না তবে দেখতে পারবে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো বললাম এ কারণে যে, একটা নগরকে সুন্দর ও মানবিক করতে কত মানুষের কত ভাবনা লাগে, চেষ্টা লাগে, আন্তরিকতা লাগে, পরিশ্রম লাগে, ভালোবাসা লাগে। এই যে হাঁসগুলো–ঠান্ডায় মরে গেলে কারও কিছুই যায় আসতো না তবে গ্রীষ্মে নদীটা থাকতো হাঁসশূন্য। তাতে নদীটার সৌন্দর্য একটু হলেও তো কমতো। নগরকর্তাদের এই ছোট্ট প্রাণটার প্রতি মায়া আছে বলেই তো হাঁস সমাজেও প্যারিস একটি বসবাসযোগ্য শহর।

একটা শহরতো শুধু মানুষের নয়, এই শহরে পাখি আছে, কুকুর আছে, বিড়াল আছে, হাঁস আছে, মাছ আছে। এই শহরটা তাদেরও। কিন্তু কয়েকদিন পর পরই ঢাকায় দেখবেন সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে রাস্তার কুকুরগুলোকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে ঘাড় ভেঙ্গে বা ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলে। কী বিভৎস! এমন না যে ঘাড় ভেঙ্গে না মেরে এই কুকুরের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করতে হবে এসব খুবই অজানা বিষয়। সারা বিশ্বেই কুকুর বন্ধ্যাকরণ জনপ্রিয় ও সবচেয়ে মানবিক পদ্ধতি। এতে অটোমেটিকই এক সময় কুকুরের নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। কিন্তু কে ভাবে এইসব প্রাণীদের কথা যেখানে মানুষের জন্যই প্রসাশনের পক্ষ থেকে কোনো মানবিকতা বরাদ্দ নাই। সুযোগ পেলেই প্রশাসন সাধারণ নাগরিকদের সাধারণ মৌলিক দাবির বিপরীতে লাঠিপেটা করে, হাত-পা গুড়া করে ফেলে, গুলি করে সারাজীবনের জন্য অন্ধ করে দেয়।

৫.
উন্নত বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতেও প্রচুর খারাপ বিষয় আছে। বিতর্কিত নানা আইন আছে, নানা বিপদ আছে। সেখানেও ছিনতাই হয়, খুন হয়। তেমন খারাপ অভিজ্ঞতার সামনে আমিও পড়েছি। কিন্তু কোনো খারাপ অভিজ্ঞতাতেই শেষ পর্যন্ত নিজেকে কখনো অসহায় মনে হয়নি। সবসময়েই সে শহরের প্রতিনিধি কাউকে না কাউকে পাশে পেয়েছি। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে যে বাসায় কিছুদিন ছিলাম সেটার সামনে মাসে দুই মাসে একবার গোলাগুলি হতো। মুহূর্তেই পুলিশের গাড়ি, হেলিকপ্টার ইত্যাদি দিয়ে প্রধানত বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করতেন। কিছুদিন পর আরেকটা বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে আমরা ‘ব্রাউন’ বলে যখন ভাড়া দিতে গড়িমসি করছিল তখন সিটি কাউন্সিলে গিয়ে অভিযোগ জানাতেই আইনি নোটিশ খেয়ে সুরসুর করে ভাড়া দিতে রাজি হলো তখন মনে হয় এই শহরে রাষ্ট্র আমার পাশে আছে। একটা ভরসা পাওয়া যায়। আমি বলছি না ঢাকাকে এখনই এমন হতে হবে। আমার চাওয়া ছিনতাইকারী আমাকে ছিনতাই করার সময় যাতে পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থাকে। অন্যের উপকার করতে গেলে পুলিশ যেন আমাকেই উল্টো হয়রানী না করে, আমার পকেটেই যেন ইয়াবা ঢুকিয়ে না দেয়। প্রসাশনের কাছে যেতে যেন আমাকে উল্টো ভয় না পেতে হয়।

৬.
যাদের শৈশব, কৈশোর বা তারুণ্য কেটেছে ঢাকায় তাদের ঢাকার প্রতি একটা আলাদা মায়া আছে। সেই মায়ার বাঁধনে আমরা সবাই নানাভাবে জড়িয়ে আছি। পৃথিবীর যে শহরেই ঢাকাবাসী থাকুক না কেন মনের গহিন কোনে তারা এই শহরটার জন্য একটা মমতা বোধ করে। এই শহরের কোনো খারাপ হলে আমাদের বুক ছিড়ে যায়, এই শহরে কোনো খারাপ সংবাদে আমরা মর্মাহত হই। কারণ এই শহর আমাদের জন্য একটা ম্যাজিকাল শহর। হুট করে এই শহরের রাজপথে হেলে দূলে চলে বেড়ায় মস্ত হাতি, লাল ফাইলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ইঁদুরের খোঁজে গম্ভীর মুখে রাতের মতিঝিলের ইলেকট্রিক পোলে বসে থাকে শতশত প্যাঁচা, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসঅলা গাড়িতে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে বঙ্কিম-জীবনানন্দ-মার্ক টোয়েন-ম্যাক্সিম গোর্কি, বর্ষায় আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে নামে বৃষ্টি, গভীর রাতে ডেকে ওঠা কাকের ডাকে বুকে জাগে হাহাকার। এসব ম্যাজিক পৃথিবীর আর কোনো শহরে নেই। কিন্তু এতসব ম্যাজিকের ভিড়ে এই সত্যিটাও আমাদের মেনে নিতে হবে যে, আমাদের এই ভালোবাসার শহর ভালো নেই, রোগে-শোকে-অমানবিকতায় মৃতপ্রায়। এই শহরের প্রাণ যায় যায় অবস্থা।

অন্ধ ভালোবাসা কোনো কিছুকে ভাসায় না, ডুবিয়ে দেয়। তাই আমাদের অন্ধ ভালোবাসায় আর এই শহরের বেঁচে উঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। শহরকে যদি সত্যিই আমরা বাঁচাতে চাই তবে গ্রহণ করতে হবে এর ভালো-মন্দ সকল সমালোচনা। এরপর সেই সমালোচনার জবাব দিতে হতে সত্যিকারের কাজ দিয়ে।

আর রবীন্দ্রনাথও বলে গেছেন, ‘এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।’

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক। 

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...