শব্দদূষণ: ঝুঁকিতে নগরবাসী

0

ব্যস্ততম নগর হিসেবে রাজধানী ঢাকার পরই বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অবস্থান। প্রতিদিন এই নগরে লক্ষাধিক যানবাহন চলাচল করে। এরমধ্যে অধিকাংশ যানবাহনেই রয়েছে হাইড্রোলিক হর্ন। যত্রতত্র বাজানো হয় এই হর্ন। নিয়ম মানা হচ্ছে না হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনেও। এর ফলে নগরীতে বেড়ে গেছে শব্দদূষণ। এছাড়া কল-কারখানার জেনারেটরের শব্দ ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে কনসার্ট ও মাইকের উচ্চ শব্দের কারণেও মাত্রাতিরিক্ত শব্দদূষণ হচ্ছে নগরে। সহনীয় মাত্রার চেয়ে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে নগরবাসী। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের প্রভাষক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ইমতিয়াজুর রহমান জয়নিউজকে বলেন, অতিরিক্ত শব্দদূষণের কারণে কমবেশি সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। হৃদরোগী ও স্ট্রোকের রোগীদের সমস্যা বেড়ে যায়।
তিনি জানান, অতিরিক্ত শব্দ দূষণে সব বয়সী মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। মানসিক চাপ তৈরি হয়। অস্থিরতা বেড়ে যায়। মেজাজ হয় খিটখিটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের দাবি, পথের শব্দের কারণে একজনের হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে থাকলে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। শব্দ দূষণের কারণে ব্লাড প্রেশার, শ্বাসের সমস্যা এমনকি হজমের সমস্যাও হতে পারে।
বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপেও উঠে এসেছে অতিরিক্ত শব্দদূষণের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি। জরিপ মতে, উচ্চশব্দ জনসাধারণের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার কারণ। এটি উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ হৃদস্পন্দন, মাথাব্যথা, বদহজম ও পেপটিক আলসার সৃষ্টির কারণ। এমনকি গভীর ঘুমকেও ব্যাহত করে। যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো স্থানে আধঘণ্টা বা তার অধিক সময় ধরে ঘটা ১০০ ডেসিবেল বা তার অধিক শব্দ দূষণের ফলে বধির হয়ে যেতে পারে। উচ্চমাত্রার শব্দের কর্ম পরিবেশে দীর্ঘসময় কাজ করলে যে কোনো ব্যক্তির সম্পূর্ণ বধিরতা দেখা দিতে পারে। শব্দদূষণ গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। দেখা গেছে, বড় বিমানবন্দরের সন্নিকটে বসবাসকারী গর্ভবতী মায়েরা অন্যান্য স্থানে অবস্থানকারী মায়েদের তুলনায় অধিক হারে পঙ্গু, বিকৃত এবং অপরিণত শিশুর জন্ম দিয়ে থাকেন।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (গবেষণাগার) ও উপ সচিব নুরুল্লাহ নুরী জয়নিউজকে বলেন, গত ২২ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরে নীরব, মিশ্র, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে শব্দের মাত্রা রেকর্ড করেছি আমরা। এতে নীরব এলাকায় যেখানে শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল থাকার কথা সেখানে সর্বোচ্চ ৭৮ ডেসিবেলও পাওয়া গেছে। একই অবস্থা মিশ্র, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও।
তিনি জানান, ২২ ফেব্রুয়ারি নীরব এলাকা হিসেবে যেসব হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে শব্দের মাত্রা রেকর্ড করা হয়, সেগুলোর মধ্যে সব জায়গাতেই অতিরিক্ত শব্দ দূষণের রেকর্ড পাওয়া গেছে। এরমধ্যে ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ৭০ দশমিক ৩ ডেসিবেল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনে ৭২ দশমিক ৩, চট্টগ্রাম কলেজের সামনে ৭৩, সিটি কলেজের সামনে ৭৪ দশমিক ১ ও নগরের একেখান আল আমিন হাসপাতালের সামনে ৭৮ ডেসিবেল শব্দ রেকর্ড করা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি নগরের কসমোপলিটন আবাসিক এলাকায় ৫০ ডেসিবেলের জায়গায় ৬৪ ডেসিবেল, হালিশহর কে ব্লক আবাসিক এলাকায় ৬৫ ও খুলশী আবাসিক এলাকায় ৬৬ দশমিক ৯ ডেসিবেল শব্দ রেকর্ড করা হয়।
একইদিন বাণিজ্যিক এলাকায় যেখানে ৭০ ডেসিবেল থাকার কথা, সেখানে আগ্রাবাদ মোড়ে পাওয়া গেছে ৭৯ এবং জিইসি মোড়ে ৯৫ দশমিক ৬ ডেসিবেল।
অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল হওয়া উচিত। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল ও রাতে ৫৫ ডেসিবেল, শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডেসিবেল ও রাতে ৬৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দের মাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল থাকা উচিত।
এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশের জন্য যথার্থ শব্দমাত্রা হচ্ছে নীরব এলাকায় দিনে ৪৫ ডেসিবেল ও রাতে ৩৫ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় (আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা) দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল থাকা উচিত।

জয়নিউজ/আরসি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...