উচ্ছেদ আতঙ্কে লালদিয়ার চরের মানুষ

0

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লালদিয়ার চরে ২২শ’ পরিবারকে পুনর্বাসন করেছিলেন। চরের এই বাসিন্দাদের আদি বাসস্থান ছিল নগরের পতেঙ্গা বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটি এলাকায়। বঙ্গবন্ধু সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন তথা সবুজ বিপ্লব কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে এনে লালদিয়ার চরে পুনর্বাসন করে।

লালদিয়ার চরের সরকারি খাসজমিতে তাদেরকে পুনর্বাসন করা হলেও, শুরু থেকেই সেখানে ছিল ভূমিদস্যুদের উৎপাত। ২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চরের বাসিন্দাদের ওপর প্রথম বুলডোজার চালায়। ইনকনট্রেড লিমিটেডের একটি কন্টেইনার ডিপো স্থাপনের জন্য ওই সময় চরের পাঁচশ’ পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্ট ওই পাঁচশ’ পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনও সেই নির্দেশ পালন করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ।

আবারও উচ্ছেদ আতঙ্কে দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের এই লালদিয়ার চরের বাসিন্দারা। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ দখলদারদের স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান চলছে।

এরই অংশ হিসেবে লালদিয়ার চরেও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এ কারণেই নতুন করে উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগছে চরের ১৭শ’ পরিবার।

সরকারি সিদ্ধান্তেই বিমান বাহিনীর ঘাঁটির আদি নিবাস ছেড়ে এই লালদিয়ার চরে বসতি স্থাপন করেছিলেন চরের বাসিন্দারা। সেই বসতি থেকেও যদি তাদের উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে তারা যাবে কোথায়!

প্রতিকার চেয়ে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কাছে আবেদন করেন চরের বাসিন্দারা। তারা চট্টগ্রাম নগরীতে স্থায়ী ঠিকানা চায়। বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিয়ে আর ভোগান্তি পোহাতে চায় না তারা। তাদের দাবি, তাদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।

এ প্রসঙ্গে চর এলাকার বাসিন্দা মো. ইসলাম বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা আমাদের বাপদাদার ভিটা ছেড়ে লালদিয়ার চরে বসতি স্থাপন করেছি সেই ১৯৭২ সালে। বঙ্গবন্ধু সরকার আমাদের এখানে পুনর্বাসন করেছিল। ৪৭ বছর পরে এসে এখনও আমাদের উচ্ছেদ আতঙ্কে ভুগতে হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি আরো বলেন, দেশের স্বার্থে সরকারি যে কোনো সিদ্ধান্তই আমরা মেনে নেব। তবে আমাদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। সরকার যেখানে রোহিঙ্গাদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে, সেখানে এই স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও আমরা কেন আবাসনের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হব? প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, তিনি যেন আমাদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে দেন।

লালদিয়ার চরের বাসিন্দাদের আবেদন প্রসঙ্গে মেয়র নাছির বলেন, দীর্ঘদিন লালদিয়ার চরে বসবাস করছে এই পরিবারগুলো। তাদের যদি সেখান থেকে উচ্ছেদ করতেই হয়, তাহলে অবশ্যই অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা মানবিক ব্যাপার। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস বলেন, আদালতের নির্দেশনা মেনে কর্ণফুলী নদীর তীরে যত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে লালদিয়ার চর এলাকায়ও এখন মাপজোখ করা হচ্ছে। যদি এলাকাবাসী বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে আদালত থেকে উচ্ছেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আনতে পারে, তাহলেই অবশ্যই উচ্ছেদের কবল থেকে রেহাই পাবে। অন্যথায় কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, আমার জানা মতে, লালদিয়ার চর এলাকাটি চট্টগ্রাম বন্দরের জায়গা। তাই উচ্ছেদের পর লালদিয়ার চর এলাকার বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসনের দায়িত্ব আমার নয়। এমন নির্দেশনাও নেই আমার কাছে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, লালদিয়ার চর এলাকাটি চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব জায়গা। সেখানে বসবাসরতদের কারো বৈধ কাগজপত্র নেই। তারপরও তাদেরকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা হলে অন্যত্র পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।

তিনি জানান, বন্দর-পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের নির্দেশে লালদিয়ার চর এলাকার বাসিন্দাদের একটি তালিকা তৈরি হচ্ছে। এর আগে যখন নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল করা হচ্ছিল, তখন ওই এলাকার মানুষকে নগরীর বড়পোল এলাকায় পুনর্বাসন করা হয়েছিল।

জয়নিউজ/আরসি
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...