অপারেশন জ্যাকপট: চট্টগ্রাম অপারেশন

0

অপারেশন জ্যাকপট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচালিত সফল নৌ-গেরিলা অপারেশন, যা যুদ্ধের মোড় অনেকাংশেই ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এটি শুধু হানাদার বাহিনীর মনোবলেই ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়নি, বরং সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আগস্ট মাসে ১৪৮ জন নৌ-কমান্ডোকে চারটি দলে ভাগ করা হয় দু’টি সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম ও মংলা) ও দু’টি নদীবন্দর (চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ) আক্রমণের উদ্দেশ্যে।

আকাশপথ ভারতীয় বাহিনী বন্ধ করে দেওয়ায় নৌপথেই হানাদাররা প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান নিশ্চিত করছিল। তাদের প্রয়োজনীয় যোগান বন্ধ করতে এবং তাদের প্রতি বাড়িয়ে দেওয়া বৈদেশিক সাহায্যের হাত রুখতেই এই বন্দরগুলো আক্রমণ করে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই অপারেশনের এও উদ্দেশ্য ছিল, বিদেশি গণমাধ্যমকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা জানানো এবং বিদেশি সহায়তাকারী রাষ্ট্রগুলোকে হুঁশিয়ারি দেওয়া যে তাদের জাহাজ আর পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে নিরাপদ নয়।

অপারেশন জ্যাকপটের পটভূমি:
মাতৃভূমির টানে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসেন মো. আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, মো. সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, মো. রহমতউল্লাহ, মো. শেখ আমানউল্লাহ, মো. আবদুর রকিব মিয়া, মো. আহসানউল্লাহ, মো. বদিউল আলম ও মো. আবদুর রহমান আবেদ। এরপর তাদের সঙ্গে আরো কয়েকজন মিলে ২০ জনের গেরিলা দল গঠন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে দেখা হয় কর্নেল ওসমানীর। তিনি নৌ-সেক্টর গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে ১৯৭১ সালের ২৩ মে নদীয়া জেলার পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয়, যার সাংকেতিক নাম ছিল সি-টু-পি।

ত্রিপুরা থেকে তাদের চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অপারেশন জ্যাকপট কবে শুরু হবে তা এমনকি জেনারেল ওসমানীকেও জানানো হয়নি।
১৪ই আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা দিবসের দিন আক্রমণের জন্য ধার্য করা হয়। দুটি বাংলা গানকে আক্রমণের নির্দেশ হিসেবে আকাশবাণীতে প্রচার করার কথা ছিল। প্রথম সংকেত ছিল ‘আমার পুতুল যাবে শ্বশুরবাড়ি’, গানটি। যার অর্থ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণ করতে হবে বা আক্রমণের সময় কাছাকাছি। পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান’ গানটি ছিল দ্বিতীয় সংকেত, যার অর্থ আক্রমণের জন্য ঘাঁটি ত্যাগ কর।
১৩ ও ১৪ তারিখ গান দুটো বাজানো হয়। গান দুটিই যে সংকেত তাও শুধুমাত্র অপারেশনের কমান্ডাররাই জানতেন।

চট্টগ্রাম অপারেশন :
চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে। হরিনা ক্যাম্প থেকে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আসা ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিনভাগে ভাগ করা হয়। ১ ও ২ নং দল তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট বেজ ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রা করে। ১৪ আগস্ট প্রথম সংকেত পাওয়ার পর তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীরে চরলক্ষ্যায় তাদের বেজ ক্যাম্পে পৌঁছায়। তৃতীয় দলটির তখনো কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ১৫ আগস্ট তারা ট্রানজিস্টরে চূড়ান্ত সংকেত পান এবং অপারেশনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। এ অপারেশনে ৩১ জন কমান্ডো অংশ নেয়। ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে রাত ১টায় নৌ কমান্ডোরা অপারেশনের জন্য যাত্রা করেন। রাত সোয়া ১টায় তারা পানিতে নেমে জাহাজের উদ্দেশে সাঁতরানো শুরু করেন এবং দ্রুত বাছাই করা টার্গেটে জাহাজের গায়ে মাইন লাগিয়ে সরে পড়েন। রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে।

এরপরএকে একে সব মাইন বিস্ফোরিত হয় । এ সফল অপারেশনে তিনটি বড় অস্ত্রবাহী জাহাজ ধ্বংস হয়। এর মধ্যে ভি হরমুজ, ১৪ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে আসে ৯৯১০ টন অস্ত্র ও গোলা–বারুদ নিয়ে। এই জাহাজটি ১৩ নম্বর জেটিতে নোঙর করা ছিল । এম ভি আল-আব্বাস ১০ হাজার ৪১৮ টন সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে ৯ আগস্ট ১২ নম্বর জেটিতে অবস্থান নেয় এবং ওরিয়েন্ট বার্জ ৬ হাজার ২৭৬ টন অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে ফিশ হারবার জেটির সামনে অবস্থান করছিল।

জয়নিউজ/পলাশ/আরসি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...