সূর্যোদয়ে শুরু, সূর্যাস্তে শেষ

ডিসি হিল ও সিআরবিতে যত আয়োজন

0

মায়ার কুজ্ঝটিজাল দূরে ঠেলে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত চট্টগ্রাম। পুরাতন গ্লানি আর জরা ঘুচিয়ে নতুন করে শুরু করার দিন পহেলা বৈশাখ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নগরের অনুষ্ঠানস্থলগুলোতে শুরু হবে বর্ষবরণের যত আয়োজন।

ভোর থেকেই নগরের সব আনন্দস্রোত এসে মিলবে ডিসি হিল আর সিআরবি শিরীষতলায়। সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিসি হিলে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আহ্বান করা হবে নতুন বছরকে। আর সকাল ৮টায় সিআরবি শিরীষতলায় ভায়োলিনিস্ট চট্টগ্রামের ভায়োলিনে শুরু হবে নববর্ষ আয়োজন।

নতুন বছরকে বরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে নগরে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য রঙ-বেরঙের ব্যানার-ফেস্টুনসহ নানা শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের গুরত্বপূর্ণ অংশ কর্ণফুলী নদী। তাই এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে থাকছে ‘কর্ণফুলী থিম’। বিভাগের ৪৯তম ব্যাচ কাঠপেন্সিল এবারের আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছে।

কাঠপেন্সিলের সদস্য টিপু দেব জয়নিউজকে বলেন, কথিত আছে এক রাজকন্যা কর্ণফুলী নদীতে তার কানের দুল হারিয়ে ফেলেন। আর তখন থেকেই এই নদীর নাম কর্ণফুলী। এই মিথকে সামনে রেখেই তৈরি হচ্ছে এবারের ডামি। শোভাযাত্রায় থাকবে সাম্পান আর গাঙচিল। সকাল ১০টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে কাজীর দেউরি, জামালখান হয়ে আবার চারুকলায় গিয়ে শেষ হবে। এছাড়াও দিনভর ক্যাম্পাসে থাকবে শিক্ষার্থীদের আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

ডিসি হিল ও সিআরবিতে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান শুরু হয় মূলত চৈত্র সংক্রান্তির দিন (১৩ এপ্রিল) থেকে। সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন পরিষদের আয়োজনে নগরের ডিসি হিলে এবারও থাকছে দু’দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ১৩ এপ্রিল বিকাল ৪টায় ভায়োলিন বাদনের মধ্যদিয়ে বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের শিল্প সাংস্কৃতিক অঙ্গণের দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়া হবে সম্মাননা। তারা হলেন শিল্পী ডা. সুলতানুল আলম ও বাচিক শিল্পী ফজল হোসেন।

সকালে নগরের বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় আয়োজন উপভোগ করতে চট্টগ্রামের দূরদূরান্ত থেকে অনেকে ছুটে আসেন ডিসি হিলে। ভোরে শ্রুতি অঙ্গণের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মাধ্যমে শুরু হবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। চলবে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত। মাঝখানে প্রায় ৬৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের সুরের স্রোতে দিনভর মাতিয়ে রাখবে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিপ্রেমীদের।

এ বছর ডিসি হিল পার করবে বর্ষবরণের ৪১ বছর। সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক আহমেদ ইকবাল হায়দার জয়নিউজকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও মানবিক চেতনার বাংলাদেশ গড়তে এবার পহেলা বৈশাখে থাকছে নানা আয়োজন। ৪০ বছর ধরে ডিসি হিলে উৎসবমুখর পরিবেশে এ আয়োজন হয়ে আসছে। সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় পর্যন্ত নানান সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকবে ডিসি হিলে।

গত ১০ বছর যাবত চট্টগ্রামে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে সিআরবি শিরীষতলা। এদিন হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি সাতরাস্তার মোড় আর শিরীষতলা। এখানেও থাকছে দু’দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।

১৩ এপ্রিল বিকাল সাড়ে ৪টায় সিআরবিতে ঢোল বাজিয়ে শুরু হয়েছে বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠান। আর নববর্ষের দিন সকাল ৮টায় ভায়োলিন বাজিয়ে শুরু হবে দিনের মূল অনুষ্ঠান। পঞ্চাশেরও অধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকছে সিআরবির এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে।

নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান মারুফ রুমী জয়নিউজকে বলেন, একাদশবারের মতো শিরীষতলায় বর্ষবরণের আয়োজন হবে। অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এখানে দুপুর ২টায় থাকবে বলীখেলার আয়োজন। এবার প্রায় শতাধিক প্রতিযোগী বলীখেলায় অংশ নেবেন। এছাড়াও কাবাডির মতো হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোও স্থান পাবে অনুষ্ঠানে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপদ সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এবারের আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

এছাড়াও নববর্ষের দিন মানুষের ঢল নামে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতেও। এবার বদলে যাওয়া সৈকতে পর্যটক আরো বাড়বে নিশ্চিত। নগরের অভয়মিত্র ঘাটেও থাকবে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রচুর মানুষ এই স্পটে নববর্ষের উৎসব পালনে সামিল হন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও দিনভর থাকবে নানা আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও এদিন সেখানে ভিড় করে উত্তর চট্টগ্রামের মানুষ।

এদিকে বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে নগরের তিনটি স্পটকে ঘিরে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান জয়নিউজকে বলেন, বৈশাখী অনুষ্ঠান বাঙালির প্রাণের উৎসব। নগরের সিআরবি শিরীষতলা, ডিসি হিল ও পতেঙ্গা সি-বিচেই পহেলা বৈশাখের মূল আয়োজন হয়। উৎসব যাতে কোন কারণে বিষাদে রূপ না নেয় সেজন্য থাকবে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

তিনি আরো বলেন, বর্ষবরণের দিন চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। সিএমপির মোট ৫ হাজার পুলিশ সদস্য মাঠে থাকবেন।  অনুষ্ঠানস্থলের আশেপাশে সিএমপির কন্ট্রোলরুম ও ওয়াচ টাওয়ার থাকবে। প্রতিটি পয়েন্টে প্রতিজনকে সুইপিং ও স্ক্যানিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শেষ করা ছাড়াও নিরাপত্তার স্বার্থে মুখোশ পরে ও ব্যাগ নিয়ে অনুষ্ঠানে না আসতে নগরবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...