রমনা থেকে যাদবপুর, নববর্ষে একই সুর!

0

ঢাকার রমনা থেকে কলকাতার যাদবপুর। বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার সুরধ্বনি মিলেছে একই সুরে। পুরাতন বছরটিকে স্মৃতির মণিকোটায় বন্দি করে নতুন বছরকে বরণ করতে দুই বাংলাতেই পথে নেমেছে বাঙালি। বাংলাদেশের নববর্ষের আদলে পশ্চিমবঙ্গ মেতেছে তুমুল জোয়ারে। বাংলার অসাম্প্রদায়িক লোকায়ত ঐতিহ্যের উৎসব মঙ্গল শোভাযাত্রা ইতোমধ্যেই ইউনেস্কো ‘অধরা বিশ্ব ঐতিহ্য’ শিরোপায় স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের অনুকরণে এবার পশ্চিমবাংলায়ও বিপুল উৎসাহে উদ্‌যাপিত হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

যাদবপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই তেরো পার্বণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বর্ষবরণ। এদিন বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়সহ গোটা ভারতজুড়ে সম্প্রীতি এবং অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা নিয়ে পথে সামিল হন অসংখ্য মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে এমনিতেই বাংলাদেশের নববর্ষ পালন ও মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে দূর-প্রেম কাজ করে। বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের ধারাবাহিকতায় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ (২০১৭) পহেলা বৈশাখ থেকে কলকাতার যাদবপুর এলাকায় মঙ্গল পরিক্রমার মাধ্যমে তাই শোভাযাত্রার আয়োজন করছে ওপার বাংলা।

মাথার ওপর বৈশাখী তেজ আর চারপাশে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে ধর্মান্ধ ফতোয়াকে উড়িয়ে বাংলাদেশ রোববার লাখো মানুষের ঢল নামিয়েছে। ওদিকে সোমবার সকাল ৮টায় যাদবপুরের সুকান্ত সেতু থেকে শুরু হয়ে সাড়ে ৯টা নাগাদ ঢাকুরিয়া মোড়ে পৌঁছে কলকাতার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক উৎসব।

কলকাতার বর্ষবরণে মিষ্টি খেয়ে ও প্রতিবেশীকে মিষ্টি বিলিয়ে পারিবারিক পরিসরে নববর্ষ পালিত হলেও বাংলাদেশে অবশ্য আছে প্রাণের ছোঁয়া আর আবেগেভরা নানান অনুষ্ঠান। কয়েকদিন পর শুরু হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈশাখী মেলা জব্বার মিয়ার বলীখেলা।

বাংলা নববর্ষ পালনের রেওয়াজ সুদুর অতীত হতে চলে আসলেও কলকাতার বুকে মঙ্গল শোভাযাত্রার বয়স মাত্র দুই বছর। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী জয়নিউজকে বলেন, ইদানিং কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় মঙ্গল শোভাযাত্রা বেরোচ্ছে। সবাই একত্রিত হলে বিশাল শোভাযাত্রা বের করা যেত।

বহরমপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা

পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি জেলা শিলিগুড়িতেও হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শিলিগুড়ি মাস্টার দা সূর্যসেন মহাবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বিকাশ রঞ্জন দেব জয়নিউজকে বলেন, বর্ষবরণ উপলক্ষে শিলিগুড়িতে আয়োজন করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। দুই বাংলাতেই পালিত অসাম্প্রদায়িক মিলনোৎসবে অংশগ্রহণ করতে পেরে আনন্দিত। এই অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা সারাবছর যেন বহমান থাক।’

কলকাতার প্রখ্যাত সাংবাদিক অনমিত্র চট্টোপাধ্যায় জয়নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের নববর্ষ পালনের পুরোটা সময় একাত্তর টিভিতে লাইভ দেখেছি কলকাতায় বসে। মৌলবাদীদের ফতোয়া তাচ্ছিল্যে উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের বাঙালিরা অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির উদ্‌যাপনে বাঙালিয়ানাকে আরো একবার যাচাই করে নিয়েছে।

কলকাতার এমিটি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর শ্রীতন্বী চক্রবর্তী আক্ষেপের সুরে বলেন, ওপার বাংলার নববর্ষ আমাদের খুব টানে। শ্বশুড়বাড়ি বরিশাল হওয়ার কারণে বাংলাদেশের বর্ষবরণের প্রতি আবেগটা একটু বেশি।

শিলিগুড়িতে মঙ্গল শোভাযাত্রা

বাংলাদেশের তারিখের সঙ্গে সমন্বয় করে রোববার সকালে পান্তা-ইলিশ খেয়ে নববর্ষের সূচনা হয় কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে। কলকাতার বাংলাদেশ উপ হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (প্রেস) মোফাখখারুল ইকবাল জয়নিউজকে বলেন, কলকাতায় উপহাইকমিশনের উদ্যোগে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিভিন্ন মুখোশ, ব্যানার, ফেস্টুন এবং চিরায়ত বাংলার নানা প্রতীক নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই শোভাযাত্রা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরণির বাংলাদেশ গ্রন্থাগার থেকে শুরু হয় এটি। শোভাযাত্রা শেষে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের পিএইচডি স্কলার মানালি সাহা। নববর্ষে বাংলাদেশের বন্ধুকে হোয়াটসএপে শুভেচ্ছা জানাতেইে ইনবক্স ঠেলে ঢুকে গেল বর্ষবরণের গোটা কুড়িটি ছবি। কোনোটায় ইলিশ-পান্তা থেকে চিড়া-মুড়ি, নারকেল, বাতাসা, কদমার ছবি। কোনোটাতে দই–মিষ্টি খাওয়ার নানারকম ছবি। মানালি সাহা বলেন, কলকাতায় বর্ষবরণ তেমন একটা নেই। বিভিন্ন শপিং মলে আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চৈত্র সেল দেখেই বোঝা যায় নতুন বছর আসছে। বাংলাদেশের বড় পরিসরের বর্ষবরণ দেখার খুব ইচ্ছে।

শিলিগুড়িতে মঙ্গল শোভাযাত্রা

গত অর্ধশতক ধরে দিল্লিতে বসবাস করা এপিজে ইনস্টিটিউট অফ মাস কমিউনিকেশনের প্রফেসর ড. পীযুষ দত্ত আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের বর্ষবরণ খুব মিস করি। কলকাতায় বর্ষবরণ হলেও দিল্লিতে তেমন কোনো আয়োজনই নেই।

ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের বর্ষবরণ বন্দনা। ‘ফতোয়া উড়িয়ে বাংলাদেশ জুড়ে বর্ণময় বর্ষবরণ’ শিরোনামে সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আনন্দবাজার লিখেছে- রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’-র একটি বাক্য ছিল এ বারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য— ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। মেট্রো রেলের কাজ চলায় এ বার পথ বদলাতে হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার, কিন্তু মেজাজ তার বদলায়নি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
পরামর্শক সম্পাদক, জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...