সুবীর নন্দী: বৃষ্টির কাছ থেকে কান্না শেখালেন যিনি

0

আচমকা বৃষ্টি নামল মুষলধারে এই পরবাসে। কাল রাতেও হয়েছিল একপ্রস্থ। আজ মেঘলা প্রাংশু আবছায়া দূর ও নিকট শ্যামলিমা ঢেকে ফেলল। সবাই তটস্থ, রাস্তায় জ্যাম, যতদূর হওয়া সম্ভব। দেশের মত এখানে মেঘদূতের ডাক মন উদাস করে না। ঘরে-ফেরার তাড়াই থাকে বেশি এই কর্মব্যস্ত উন্নত দেশের নগরীতে।

বৃষ্টির ছোঁয়াচ গায়ে লাগিয়ে খিদেপেটে ঘরে ফিরে হাবিজাবি কিছু পেটে জামিন করে দিই। ফেসবুক খুলতেই দেখি যিনি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছিলেন, হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে প্রেম বলে যে কিছু নেই তা জেনেছেন, বোবা পাহাড় আর মেঘের কান্না দেখে তাদের বেদনার কথা জানিয়েছিলেন, দিন গেলেও কথা থাকে তা মনে করিয়েছেন, কত যে ভালোবেসেছেন তা বোঝার আকুল আকুতি জানিয়েছেন, উড়ালপঙ্খীকে উড়িয়েছেন বিপুল আকাশে, বলেছেন তাঁর দুটি চোখ পাথর নয়, তিনি আজ কথা দিয়ে থাকলেন না…
কেন যেন তাঁর বিষণ্ন চেহারা দেখে ছোটবেলায় কেঁদে ফেলতাম, নরম মন আমার।

কিন্তু একটু বড় হলে তাঁর গলার প্রাচুর্যময় কারুকাজ আর মায়া অনুভব করে তাঁর অনুরক্ত হয়ে পড়ি। আনিসুল হকের উপস্থাপনায় জলসা অনুষ্ঠানে তিনি ফিডব্যাকের ‘ধন্যবাদ হে ভালোবাসা’ গানটাকে ভিন্নমাত্রা দেন। দ্বিজেন্দ্রগীতি ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার হতে’ মান্না দে’র চাইতেও আমার কাছে নিবিড়তর করে তোলেন। হুমায়ূনের সাথে তাঁর যুগলবন্দিতে সৃজনের উৎসবে মেতে ওঠেন।

পাঁচবার তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেটা তাঁর প্রতিভার পরিচয়, প্রভূত পরিশ্রমেরও। তাঁর প্রতিভা নিয়ে একটা গল্প মনে পড়ল। বিনয়ী তিনি। নিজে করেননি, সম্ভবত বিটিভিতে অন্য কেউ করেছিলেন। সিলেট বেতারে এক বালকের গান পরিবেশিত হবে, কিন্তু বালকটির বয়স অত্যন্ত কম, এগারো। নিয়মানুযায়ী সে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারে না। কিন্তু প্রকৃতিদত্ত প্রতিভার কাছে হার মানল মানবরচিত নিয়ম। রীতিমত রেকর্ড গড়ে সে সিলেট বেতারের শিল্পী হিসেবে গান করল, রেকর্ড হল সেই গান, প্রচারিতও। আর কতটা শ্রমনিষ্ঠ ছিলেন তিনি সেটা প্রায় পঞ্চাশে এসেও ‘আমার উড়াল পঙ্খী রে’ শুনলেই বোঝা যাবে। বয়স বিন্দুমাত্র টোল ফেলতে পারেনি তাঁর কণ্ঠস্বরে বা ঘুণ ধরাতে। আজকাল এই নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও সাধনার নজির খুব বেশি নেই বোধকরি।

শিবু কুমার শীলের জবানিতে পড়লাম, রিয়েলিটি শো বন্ধ করার ব্যাপারে তিনি রায় দিয়ে গেছেন। মুদ্রারাক্ষস ও খ্যাতিখুনে নেশা জেঁকে বসে শিল্পজগৎ ও শিল্পীদের গ্রাস করছে, এটা অনুভব করেই তিনি এই রায় দিয়েছেন। নিজের হাতেই গড়া স্বার্থের শৃঙ্খল, হয়ে গেছে আজ তো পৃথিবীর সম্বল, জানিয়েছিলেন তিনি আগেই। শর্টকাটে আস্থাশীল ছিলেন না তিনি, নিজের মত অন্যেরাও সুরদেবীর সাধনা করেই বরপ্রাপ্ত হবে, এই মতামতে তিনি অনড় ছিলেন। বিনীত, মৃদুভাষী, অথচ সৎ ও সাধনামগ্ন এই শিল্পীর প্রয়াণে একজন মহৎ মানুষের ঘাটতি হলো বঙ্গভূমে।

তাঁর একটা বন্দিশ আমি এখনো খুঁজে যাচ্ছি। আলাওলের জীবনকাহিনি নিয়ে নাটক, যেটায় সম্ভবত জামিল আহমেদ অভিনয় করেছিলেন, সেখানে আরাকান রাজসভায় তিনি গাইছিলেন, বাসন্তী নাগরীবর নগরবিলাসে, দুই হাতে পরো ইন্দু, ঝরে যেন সুধাবিন্দু…স্মৃতি ধূসর।

সুবীর নন্দী আন্ডারেরেটেড ছিলেন। চলেও গেলেন নীরবে। বৃষ্টি শীতল করছে চারপাশ, মন শীতল হয় না…পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই…!

লেখক : বন ও পরিবেশবিদ্যায় স্নাতক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোলে পিএইচডি স্কলার (শিক্ষাছুটি), অনুবাদক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...