নীরব ঘাতক থ্যালাসেমিয়া

0

আজ ৮ মে। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) রক্তের একটি রোগ যা সাধারণত বংশগতভাবে ছড়ায়। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি কম থাকে। এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে, ভালভাবে চিকিৎসা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণও হতে পারে। প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া হয়। বাবা এবং মা উভয়ের অথবা বাবা অথবা মা যেকোনো একজনের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে, এটি সন্তানের মধ্যে ছড়াতে পারে। বাবা এবং মা উভয়ের থ্যালাসেমিয়া জীন থাকলে, সেক্ষেত্রে শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২৫ ভাগ। থ্যালসেমিয়া প্রধানত দুই ধরণের হয়ে থাকে। যথা- আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া।

আলফা থ্যালাসেমিয়া: চারটি জিন দিয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়া ধারা গঠিত হয়। এক্ষেত্রে বাবা এবং মা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুইটি করে এই জিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে এক বা একাধিক জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। সমস্যাটি কতটা মারাত্মক তা নির্ভর করে চারটির মধ্যে কতটি জিন ত্রুটিপূর্ণ তার ওপর। যেমন- একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ বা উপসর্গই দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াতে পারে। দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মৃদু উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থা আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর নামে পরিচিত। তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক ধরনের এর উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থা হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ নামে পরিচিত। চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মারাত্মক ধরনের উপসর্গ দেখা যাবে এই অবস্থা আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা হাইড্রপস ফিটেইলস নামে পরিচিত। এর ফলে প্রসবের পূর্বেই ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিটা থ্যালাসেমিয়া: ধারা দুইটি জিন দিয়ে গঠিত হয়। বাবা এবং মা প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে সর্বমোট দুইটি জিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি অথবা উভয় জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে বিটা থ্যালাসেমিয়া হয়। এক্ষেত্রেও কতটা মারাত্মক তা নির্ভর করে চারটির মধ্যে কতটি জিন ত্রুটিপূর্ণ তার ওপর। যেমন- একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে মৃদু উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থা বিটা থ্যালাসেমিয়া মাইনর নামে পরিচিত। অপরদিকে দুইটি জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে মাঝারি থেকে মারাত্মক উপসর্গ দেখা যাবে। এ অবস্থা বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর অথবা কুলিস এ্যানিমিয়া নামে পরিচিত। যেসব নবজাতক শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহন করে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকলেও জন্মপরবর্তী দুই বছর সময়ের মধ্যেই এই রোগের উপসর্গ দেখা যায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ: থ্যালাসেমিয়া রোগের ধরণ এবং এর তীব্রতার উপর ভিত্তি করে এর উপসর্গগুলোও ভিন্ন হতে পারে। তবে থ্যালাসেমিয়া হলে সাধারনত কিছু লক্ষন দেখে অনুমান করা যায়। যেমন- অবসাদ বা অস্বস্তি অনুভব, শারীরিক দূর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, মুখ-মন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, মুখের হাড়ের বিকৃতি, শারীরিক বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা পেট ফুলে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, অতিরিক্ত আয়রন, সংক্রমণ, অস্বাভাবিক অস্থি, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, হৃৎপিণ্ডে সমস্যা, ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস ইত্যাদি লক্ষণ বা উপসর্গগুলো দেখা যায়।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা: রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা, লোহিত রক্ত কণিকার আকারের পরিবর্তন, বিবর্ণ লোহিত রক্ত কণিকা, লোহিত রক্ত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের অসম থাকা, শিশুর রক্তে আয়রণ ও লৌহের পরিমাণ, হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ইত্যাদি জানা যায়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা অথবা রোগী ত্রটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিন বহন করছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। গর্ভস্থ সন্তানের থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোরিওনিক ভিলিয়াস স্যাম্পলিং, এ্যামনিওসেনটিসিস, ফিটাল ব্লাড স্যাম্পলিং ইত্যাদি পরীক্ষা করা যেতে পারে। থ্যালাসেমিয়া আছে বা হতে পারে এরূপ সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা: মাইনর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসার কোন প্রয়োজন হয় না। অপরদিকে মেজর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে, নিয়মিত রক্ত গ্রহন (প্রয়োজনবোধে বছরে ৮ থেকে ১০ বার) করতে হয়। বার বার রক্ত নেওয়ার ফলে বিভিন্ন অঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যেতে পারে এবং এর ফলে যকৃত বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই, এরকম ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে আয়রন চিলেশন থেরাপীর সাহায্যে অতিরিক্ত লৌহ বের করে দেওয়া হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে একজন ম্যাচ ডোনার লাগবে। আমাদের দেশে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না থাকায়, এই অপারেশন দেশের বাইরে গিয়ে করতে হয়। এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রণ এবং ফলিক এসিড সেবন করতে হতে পারে। আবার জীবনযাপন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন- চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিত কোন ঔষধ বা ভিটামিন সেবন না করা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, জিংক, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে ইত্যাদি।

বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র এবং পাত্রীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে, তাদের মধ্যে কেউ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কিনা। আবার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই, এ ব্যপারে সাবধান হতে হবে।

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা কতটা জরুরি: থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ বিয়ের আগে পাত্র এবং পাত্রীর রক্তের হিমোগ্লোবিনের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। স্বামী এবং স্ত্রী দু’জনেই এ রোগের বাহক হলে সন্তানের এ রোগ হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। সাধারনত থ্যালাসেমিয়ার কোনোরূপ সম্ভাবনা আছে এমন পুরুষ বা মহিলার সঙ্গে অন্য কোন থ্যালাসেমিয়া রোগী বা রোগের সম্ভাবনা আছে এমন কারও বিয়ে হলে তাদের সন্তানের এই রোগে আক্রান্তের সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং বিয়ের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

থ্যালাসেমিয়া একটি জিনঘটিত রোগ। এই রোগে রক্তের লোহিতকণিকা ভেঙে যায় এবং রোগী রক্তস্বল্পতায় ভুগতে থাকে। রক্তের সম্পর্কের মধ্য বিয়ে হলে, তাদের সন্তানদের মধ্যে এই রোগটি বেশি হতে পারে।

বারবার রক্ত দিয়েও কোনো রোগীকেই পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা যায় না। প্রথম প্রথম তিন মাস পরপর এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হলেও পরে দু’মাস পরপর রক্তের প্রয়োজন হয়। আবার বয়স্ক থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে অনেকের মাসে একাধিকবার রক্ত দেবার প্রয়োজন হয়। এ রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র মানুষের জন্য রোগাক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসার খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে যায়।

তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। তাই, বিয়ের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা এবং নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে পরিত্যাগের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করতে হবে।

জয়নিউজ/পলাশ/শহীদ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...