যে কারণে মুনিরীয়া ইস্যুতে উত্তাল রাউজান

0

বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় আসলেই পুরো বন্দরনগর ছেয়ে যায় সংগঠনটির ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুনে। মোড়ে মোড়ে মাইকিং হয়। এশায়াত সম্মেলনের প্রচার চলে পুরোদমে। আলোচিত এই সংগঠনটির নাম মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটি। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটির বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা। জয়নিউজের রাউজান প্রতিনিধি শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে এর কারণ জানার চেষ্টা করেছেন মুহাম্মদ জুলফিকার হোসেন

অভিযোগ ছিল অনেকদিনের। তবে প্রতিবাদের সাহস হতো না। ক্ষোভের বারুদ তাই অপেক্ষায় ছিল এক চিলতে আগুনের।

সেই পুঞ্জিভূত ক্ষোভ এবার বিস্ফোরিত হয়েছে। কাগতিয়া দরবার ও মুনিরীয়া যুব তবলীগ ইস্যুতে রাউজান এখন উত্তাল। একে একে আটটি মামলা হয়েছে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। যার মধ্যে দুটিতে প্রধান আসামি করা হয়েছে মুনিরীয়া যুব তবলীগের সভাপতি ও কাগতিয়া দরবারের পীর মাওলানা মুনির উল্লাহকে। এসব মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সাতজনকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গাউছিয়া কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার, মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল আনোয়ার, আওয়ামী লীগ নেতা মোজাম্মেল হক, আল্লামা গাজী শফিউল আলম নেজামী, আল্লামা মহিউদ্দিন, আল্লামা হাফেজ নুরুল আবছার, শ্রমিক আবদুল মান্নান, রিকশাচালক শামসুল আলমসহ রাউজানের অনেক মানুষের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ রয়েছে মুনিরীয়া যুব তবলীগের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

২০১১ সালের ১৮ এপ্রিল রাউজানের মুন্সির ঘাটায় উত্তর সর্তা গ্রামের ছাত্রসেনা কর্মী নঈম উদ্দিনকে মুনিরীয়া যুব তবলীগের সমর্থকরা পিটিয়ে হত্যা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কাগতিয়া দরবারের পীর মাওলানা মুনির উল্লাহর বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগে হাইকোর্টে রিটও দায়ের করা হয়। রিটটি দায়ের করেছিলেন রাউজানের প্রখ্যাত পীর মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিকী (রহ.)। হাইকোর্টের রায় পক্ষে গেলেও এখন পর্যন্ত জমির দখলে যেতে পারেনি আবু বক্কর সিদ্দিকীর পরিবার।

মাওলানা আবু বক্কর সিদ্দিকীর (রহ.) ছেলে মাওলানা হাসান জয়নিউজকে বলেন, আমার পৈতৃক সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন কাগতিয়া দরবারের পীর মুনির উল্লাহ। আমার বাবা রুপচান্দ মসজিদ কমিটির সভাপতি হিসেবে উচ্চ আদালতে রিট করেন। আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিলেও মুনির উল্লাহ’র কর্মী-সমর্থকদের ভয়ে আমার বাবা বা আমরা জমির দখল নিতে পারিনি।

এ ব্যাপারে কথা বলতে কাগতিয়া এশাতুল উলুম কামিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ বদিউল আলমের ফোনে যোগাযোগ করা হয়। এসময় তার সহকারী ফোন ধরে ‘উনি বাইরে আছেন’ বলে ফোন কেটে দেন।

জানা যায়, মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটিকে নিষিদ্ধ ও সংগঠনটির কর্মী-সমর্থকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রাউজানের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফুঁসে উঠলে আত্মগোপনে চলে যান কাগতিয়ার পীর মাওলানা মুনির উল্লাহ ও তার প্রধান অনুসারীরা। এরমধ্যে মাওলানা এমদাদুল হক মুনিরী, মাওলানা আনোয়ার আলম সিদ্দিকী, মাওলানা ইব্রাহিম হানিফী, মাওলানা আশেকুর রহমান আল কাদেরীসহ মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা ইতোমধ্যে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছেন।

মুনিরীয়া যুব তবলীগ কমিটির কেন্দ্রীয় সহ এশায়াত সম্পাদক ও বিনাজুরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক সৈয়দ আবদুল্লাহ আল রশিদী সম্প্রতি মাওলানা মুনির উল্লাহসহ সংগঠনের নয়জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ ও ১০-১২ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে রাউজান থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

এ বিষয়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ আল রশিদী জয়নিউজকে বলেন, সংগঠনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার অপকর্মের কারণে সংগঠন ছেড়েছি। এসব নেতা সংগঠনকে কলঙ্কিত করে ফেলছেন।

রাউজানে বিক্ষোভ মিছিল

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর মুনিরীয়া যুব তবলীগের কর্মীদের হামলার প্রতিবাদে রাউজানে চলছে একের পর এক আন্দোলন কর্মসূচি।

গত ১৭ এপ্রিল থেকে রাউজানে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে পৃথক পৃথকভাবে প্রতিবাদ সভা, সাংবাদিক সম্মেলন, বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করা হয়। এছাড়া পরিবহন ধর্মঘট করে শ্রমিকরা।

এর বাইরে মুনিরীয়া যুব তবলীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দেন আন্দোলনকারীরা।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে রাউজান উপজেলা যুবলীগের সভাপতি জমির উদ্দিন পারভেজ জয়নিউজকে বলেন, মুনিরীয়া যুব তবলীগের নেতা-কর্মীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শেষ চায় উপজেলার মানুষ। এদের বিরুদ্ধে হামলা-মারধর, এমনকি মানুষ হত্যারও অভিযোগ রয়েছে। এরা রীতিমতো ‘জঙ্গি স্টাইলে’ সংগঠন পরিচালনা করছে।

সংগঠনটির অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর অভিযান চলছে জানিয়ে তিনি দোষিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

কাগতিয়া দরবার ও মুনিরীয়া যুব তবলীগ নিয়ে শফিউল আলমের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়তে চোখ রাখুন জয়নিউজে।
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...