রেকর্ড গড়েও হার

0

প্রথমে ব্যাটিং করে অজিরা টাইগারদের ৩৮২ রানের টার্গেট দিয়েছিল। আর নির্ধারিত ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইগারদের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ৩৩৩ রান। এর মানে অজিদের কাছে ৪৮ রানের হার টাইগারদের। আর খেলা শেষে টাইগারভক্তদের মনে আফসোস অনেক! কেউ কেউ আফসোস করে বলছেন, ইশ…যদি আর ৪০টা রান কম হতো, তাহলে টাইগাররা হয়তো জিতেও যেত।

ঠিক একইভাবে অনেক টাইগারভক্ত এও বলছেন, তামিম যদি শুরু থেকে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর চড়াও হতেন কিংবা মুশফিক আর একটু মেরে খেলতেন, তাহলে ম্যাচটার চিত্র পাল্টে যেত।

এমন হাজারো আফসোস টাইগারভক্তদের মাঝে। কারণ পুরো ম্যাচে কিছু ভুলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সমানতালে লড়েও হারতে হয়েছে তাদের। অথচ তামিম ৭২ বলে ৬৪, মুশফিকের ৯৭ বলে ১০২*, রিয়াদ ৫০ বলে ৬৯ আর সাকিব ৪১ বলে ৪১ রান করেছেন এ ম্যাচে। তারপরেও বোলারদের দিশেহারা বোলিংয়ের কারণে ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ।

এদিকে হারার ম্যাচে বাংলাদেশ করেছে কিছু রেকর্ড। এদিন টাইগার ব্যাটসম্যানরা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বোচ্চতো বটে ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় ইনিংসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রানের দলীয় সংগ্রহ করেছেন। তবুও ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের পরাজয়ের ব্যবধান ৪৮ রানের।

বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের চতুর্থ ওভারেই বাংলাদেশ শিবিরে আসে বড় ধাক্কা। দুর্ভাগ্যজনক রানআউটের শিকার হন সৌম্য সরকার।

প্যাট কামিন্সের বলটি মিডঅনে ঠেলে দিয়ে দৌড় দিয়েছিলেন তামিম ইকবাল, মাঝে ভুল বোঝাবুঝিতে ফেরত আসেন স্ট্রাইকিং এন্ডে। কিন্তু ননস্ট্রাইক এন্ডে সৌম্য ফিরতে পারেননি, অ্যারন ফিঞ্চের সরাসরি থ্রোতে ভেঙে যায় স্ট্যাম্প। ৮ বলে ২ বাউন্ডারিতে সৌম্য সাজঘরের পথ ধরেন ব্যক্তিগত ১০ রানেই।

দ্বিতীয় উইকেটে ৭৯ রানের জুটি গড়েন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সাকিব ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন বিশ্বকাপে টানা পঞ্চম ফিফটির। কিন্তু দলীয় ১০২ রানের মাথায় তিনি আউট হন ব্যক্তিগত ৪১ রানে।

এর আগে অবশ্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরে ৪০০’র বেশি রান করার কৃতিত্ব দেখান বিশ্বসেরা এ অলরাউন্ডার। পাঁচ ইনিংসে ১০৬.২৫ গড়ে এখনও পর্যন্ত তার সংগ্রহ ৪২৫ রান।

সাকিবের বিদায়ের পর তামিম তুলে নেন চলতি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ফিফটি। মুশফিকের সঙ্গে তার জুটিতে দলীয় সংগ্রহটাও এগুচ্ছিলো বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই। কিন্তু সুখ যেনো বেশিক্ষণ সয়নি তামিমের।

মিচেল স্টার্কের করা ২৫তম ওভারের প্রথম বলটি ছিলো অফস্টাম্পের বেশ বাইরে। থার্ডম্যান দিয়ে গলাতে গিয়ে উল্টো স্ট্যাম্পে টেনে নেন তামিম। থেমে যায় তার ৭৪ বলে খেলা ৬২ রানের ইনিংসটি।

আগের ম্যাচের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে উইকেটে আসেন লিটন কুমার দাস। কিন্তু প্রথম বলেই তাকে মরণঘাতী এক বাউন্সার দেন স্টার্ক। যা আঘাত হানে সোজা হেলমেটে। বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে খেলা। প্রাথমিক সেবা নিয়ে খেলা শুরু করেন লিটন।

তখন আর মনেই হয়নি প্রথম বলেই মাথায় আঘাত পেয়েছেন তিনি। দারুণ ৩টি চারের মারে ১৬ বলে করে ফেলেন ২০ রান। কিন্তু আউট হয়ে যান লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ে। আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিভিউ নেন লিটন।

রিপ্লেতে দেখা যায় আম্পায়ার আউটের সিদ্ধান্ত না দিলে বেঁচে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু ‘আম্পায়ার্স কল’ আউট থাকায় ত্রিশতম ওভারের দ্বিতীয় বলে দলীয় ১৭৫ রানের মাথায় সাজঘরেই ফিরে যেতে হয় লিটনকে। এরপরই জুটি বাঁধেন মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ।

ত্রিশতম ওভারে লিটন কুমার দাস আউট হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই দেখছিলেন টাইগারদের বড় পরাজয়। কিন্তু পঞ্চম উইকেটে জুটি গড়ে এখনও জয়ের আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন দুই ভায়রা ভাই মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

দুজনই রান করছেন বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। জুটিতেও পূরণ হয়েছে শতরান। তবে এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেক লম্বা পথ। কারণ জয়ের জন্য লক্ষ্যটা যে আকাশছোঁয়া। যা তাড়ায় টাইগার ভক্তদের জয়ের আশা বাঁচিয়ে রাখে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর জুটি।

ওভারপ্রতি প্রায় ১৫ রানের চাহিদায়, প্রতি ওভারেই একটি-দুইটি করে বাউন্ডারি হাঁকাচ্ছিলেন দুজনে। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের যথাযথ জবাব দিয়ে দুজন মিলে গড়ে ফেলেন শতরানের জুটি, যেখানে ফিফটি হয়ে যায় দুই ব্যাটসম্যানেরই।

লক্ষ্যটা বিশাল হওয়ায় আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পরেও শেষের পাঁচ ওভারে বাকি থাকে ৮২ রান। সে ওভার করতে এসেই মূলত বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন নাথান কোল্টার নিল।

তার করা ৪৬ ওভারের তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে ধরা পড়েন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। আউট হওয়ার আগে ৫ চার ও ৩ ছক্কার মারে ৫০ বলে ৬৯ রান করেন তিনি। পরের বলেই সরাসরি বোল্ড হয়ে সাজঘরের পথ ধরেন সাব্বির রহমান।

এরপর আর একার পক্ষে বেশিকিছু করা সম্ভব ছিল না মুশফিকের পক্ষে। তবু তিনি দলীয় সংগ্রহটাকে নিয়ে যান ৩৩৩ রান পর্যন্ত, তুলে নেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম সেঞ্চুরি।

ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তিন অঙ্কের দেখা পেলেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহীম। নটিংহ্যামের ট্রেন্টব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এ মাইলফলকে পৌঁছলেন তিনি। আজকের সেঞ্চুরিটি করতে মুশফিক বল খেলেছেন ৯৫টি। ৯ চার ও ১ ছয়ের মারে সাজিয়েছেন নিজের সেঞ্চুরি।

শেষপর্যন্ত বাংলাদেশের ইনিংস থামে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩৩৩ রানে। মুশফিক অপরাজিত থাকেন ৯৭ বলে ১০২ রান করে। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে ২টি উইকেট নেন নাথান কোল্টার নিল, মিচেল স্টার্ক ও মার্কস স্টয়নিস।

এর আগে ডেভিড ওয়ার্নারের ১৬৬ ও উসমান খাজার ৮৯ রানে ভর করে নটিংহ্যামে আগে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ৩৮১ রান সংগ্রহ করে অস্ট্রেলিয়া।

বৃহস্পতিবার (২০ জুন) বিশ্বকাপের ২৬তম ম্যাচে ট্রেন্ট ব্রিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টস হেরে আগে ফিল্ডিংয়ে নামে বাংলাদেশ। এ দিন দলে দুটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে টাইগাররা। চোটের কারণে সাইফউদ্দিন ও মোসাদ্দেক হোসেনের জায়গায় দলে ঢুকেছেন পেসার রুবেল হোসেন ও ব্যাটসম্যান সাব্বির রহমান।

ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালো করে অজিরা। দুই ওপেনার ওয়ার্নার-ফিঞ্চ মিলে গড়ে ১২১ রানের উদ্বোধনী জুটি। এর পর ২১তম ওভারে বোলিংয়ে এসে সৌম্যের অফ স্টাম্পের বাইরে বাড়তি লাফানো বলে চমকে গিয়ে শর্ট থার্ড ম্যানে ক্যাচ দেন ফিঞ্চ। ৫১ বলে ৫৩ রান করেন ফিঞ্চ। পরে তাঁর শিকার হয়ে ফিরেছেন ডেভিড ওয়ার্নার ও উসমান খাজা। ১৬৬ রান ওয়ার্নার ও ৮৯ রান করেছেন খাজা।

ওয়ার্নার এই বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। ১৪৭ বলের ইনিংসটায় আছে ১৪টি চার, ৫ ছক্কা। অথচ পঞ্চম ওভারেই ওয়ার্নারকে ফিরতে হতো। মাশরাফির বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে সহজ ক্যাচ ফেলেছেন সাব্বির। ওয়ার্নারের রান তখন ছিল ১০।

১ উইকেটে ৩১৩ রান তোলার পরও অস্ট্রেলিয়া যে শেষে সাইক্লোন ওঠাতে পারেনি, তাতে সৌম্যের ভূমিকা আছে। স্লগ ওভারে টানা ফিরিয়েছেন ওয়ার্নার আর খাজাকে। এর মধ্যে খাজা ফেরার ওভারেই রান আউটের শিকার হয়েছেন নেমেই হাত খুলে মারতে থাকা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ১০ বলে ৩২।

শেষদিকে ৪৯তম ওভারে নটিংহ্যামে আসে বৃষ্টি। তবে কিছুক্ষণ পর ঠিকই আবার মাঠে গড়ায় খেলা। ৫০তম ওভারে মুস্তাফিজ এসে ১৩ রান দিলে অজিদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ৩৮১ রান। স্টোনিস ১৭ ও অ্যালেক্স ক্যারি ১১ রানে অপরাজিত থাকেন।

বাংলাদেশের পক্ষে ৩টি উইকেট নেন সৌম্য সরকার। এছাড়া রুবেল নেন ১টি উইকেট।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...