দৃশ্যমান হচ্ছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল

0

ব্যবসা-বাণিজ্যে, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানাসূচকে বিশ্বের অনেক দেশকে পেছনে ফেলে ঈর্ষনীয় সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভূতপূর্ব প্রসারের প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরেও। প্রতি বছর বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধি। এই প্রবৃদ্ধিকে মোকাবেলা করার জন্যই সরকার পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) প্রকল্পের নির্মাণকাজ হাতে নিয়েছে। আশা করা যায়, আগামী ২০২০ সালের মধ্যেই সম্পন্ন হবে এই প্রকল্পের কাজ।

দেশে প্রথমবারের মতো এ প্রকল্প নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে মরিচা প্রতিরোধী ও লবণ সহনীয় বিশেষভাবে তৈরি রড। যে হারে বন্দরের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে আগামী চার বছর তা সামাল দিয়ে যেমন ভারমুক্ত থাকতে পারবে চট্টগ্রাম বন্দর, তেমনি চালুর ৩-৪ বছরের মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল খরচের পুরো টাকাটাই উঠে আসবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে বছরে চার লাখ ৫০ হাজারেরও অধিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়বে বলে মনে করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে কনটেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি ক্রয়ে, অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় হবে অবকাঠামোগত নির্মাণে। টার্মিনালটিতে ২৭.৫০ একর জায়গায় অভ্যন্তরীণ ইয়ার্ড সুবিধাসহ প্রতিটি ২০০ মিটার করে ৩টি জেটি ও ২২০ মিটার দৈঘ্যেও একটি ডলফিন অয়েল জেটি নির্মাণ করা হবে।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু করতে ৭ মাস অতিরিক্ত সময় লেগে যায়া। তাই ২০১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ সমাপ্ত না হয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে আগামী বছরের শুরুতেই ২টি জেটি অপারেশনে যাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পিসিটিতে যা থাকছে
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের ৩২ একর পশ্চাৎসুবিধাসহ ৬০০ মিটার দীর্ঘ ৩টি জেটিতে একসঙ্গে ৩টি কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে। এছাড়া থাকবে তেলবাহী জাহাজের জন্য ২২০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ডলফিন অয়েল জেটি। ১ লাখ ১২ হাজার বর্গমিটার এলাকায় থাকবে টার্মিনাল, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ইয়ার্ড ও রাস্তা, যেখানে সাড়ে ৪ হাজার কনটেইনার রাখা যাবে। থাকবে ২ হাজার ১২৮ বর্গমিটার সিএফএস (কনটেইনার ফ্রেইট ষ্টেশন) শেড, টার্মিনালের চারপাশে ৬ মিটার উচ্চতার ১ হাজার ৭৫০ মিটার কাস্টস বন্ডেড ওয়াল, ৫ হাজার ৫৮০ পোর্ট অফিস বিল্ডিং, ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার যান্ত্রিক ও মেরামত কারখানা, ২ হাজার ৫০০ মিটার রেলওয়ে ট্রাক নির্মাণ, ৪২০ মিটার ফ্লাইওয়ে নির্মাণ, ৪ লেইন বিশিষ্ট ০.৭৫ কি.মি. এবং ৬ লেনবিশিষ্ট ১০ কি.মি. মিটার রাস্তা স্থানান্তরপূর্বক পুনর্নির্মাণ। এতে আরো থাকছে সিকিউরিটি পোস্ট, গেট হাউস, ফুয়েল স্টেশন, লেবার শেড ও ক্যান্টিন।

এছাড়াও প্রকল্পের অবকাঠামোগত স্থাপনা নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনায় কেনা হবে ২টি ফায়ার ট্রাক, ১টি ফায়ার কার, ৩টি নিরাপওা পেট্রোল কার, ১পি এম্বুলেন্স, ৪টি কিগ্যান্ট্রি ক্রেন, (কিউজিসি), ৪টি স্ট্র্যাডেল কেরিয়ার, ৪টি রিচ স্ট্যাকার, ৮টি রাবার টায়ার্ড গেন্ট্রি (আরটিজি), ৪টি লো-মাষ্টফর্ক লিফট, ৪টি ফর্ক লিফট, ১টি রেইলমাউন্টেড গ্যান্টি ক্রেন (আরএমজি। ২টি টাগ বোট (প্রতিটি ৫০ টন), ২টি পাইলট বোট, ২টি ফাস্ট স্পীড বোট।

জানা যায়, যন্ত্রপাতিসমূহ ধাপে ধাপে ওটিএম পদ্ধতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মেরিন বিভাগের মাধ্যমে জলযানসমূহ ক্রয়ের প্রক্রিয়াধীন আছে।

উল্লেখ, পিসিটি প্রকল্পের যন্ত্রপাতিসমূহ জাপান, যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইউরোপীয় দেশসমুহ থেকে ক্রয়ের জন্য বন্দর থেকে সরকারের কাছে প্রস্তাব আগেই দেওয়া আছে।

প্রকল্পের বতর্মান অবস্থা
পিসিটির ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। তারা ইতোমধ্যে স্থায়ী ব্যারাক নির্মাণ, বালি ভরাট, ভূমি উন্নয়ন, নতুন প্রস্তাবিত রাস্তা, বক্র কার্লভার্ট ড্রেইন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন।

সেনাবাহিনীও ইতোমধ্যেই কনটেইনার জেটি, ডলফিন জেটি, ফ্লাইওভার ও নতুন রাস্তার কাজ সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও প্রকল্প পরিচালনার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রস্তাবিত যন্ত্রপাতিসমূহের মধ্যে ৪টি কিউজিসি ও ৮টি আরটিজি ক্রয়ের জন্য নথি প্রক্রিয়াধীন আছে।

বন্দর প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৩৫৬.৯১ কোটি। এছাড়া ভৌত অবকাঠামোগত অগ্রগতি হচ্ছে ৩০ শতাংশ এবং মোট প্রকল্পের ১৯ শতাংশ। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) চাচ্ছে যেকোন প্রকারে ২০২০ সালের শুরুতে ১টি জেটি চালু করতে, বাকি ২টি জেটি চালু হবে বছরের মাঝামাঝিতে।

পিসিটি প্রকল্প পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সরকার জয়নিউজকে বলেন, কাজের দ্রুত অগ্রগতি ও গুণগত মানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সেনাবাহিনীকে কাজসমূহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালনার কাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসমূহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পরে ধাপে ধাপে সরবরাহ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন কারণে কাজ শুরু করতে ৭ মাস দেরি হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হতে অতিরিক্ত কয়েক মাস লাগতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক জয়নিউজকে বলেন, সর্বোচ্চ গুণগতমান বজায় রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন। আশা রাখি আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। পিসিটি অপারেশনে গেলে বন্দরের সক্ষমতা যেমন বাড়বে তেমনি বাড়বে কনটেইনার হ্যান্ডলিয়ের পরিমাণ।

সচিব আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে অনেক যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। আগামীতে আরো উন্নতমানের ইকুইপমেন্ট আসতেছে। এছাড়াও সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আরো কয়েকটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। মোটকথা, আগামীতে যাতে উন্নত বিশ্বের প্রথম কাতারে চট্টগ্রাম বন্দর স্থান করে নিতে পারে, তা মাথায় রেখে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে সরকারের নৌ মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...