বিশৃঙ্খলা দূর করতে জরুরি সুশৃঙ্খল বাহিনী

শাহ আমানত বিমানবন্দর

0

যাত্রীর বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ‘অবৈধ অর্থের জন্য’ চলে হয়রানি। ব্যাগেজ (মালামাল) নেওয়ার সময় প্রবাসীরা দেখেন সব পণ্য নেই। অনেক সময় ব্যাগের তালাও থাকে ভাঙা। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ অর্থের বিনিময়ে নিষিদ্ধ পণ্য কিংবা শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য পণ্য বের করে দেওয়ার।

এ চিত্র চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। এমন সহস্র বিশৃঙ্খলায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে প্রবাসীদের। এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা। এসব অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা দূর করতে দেশের সুশৃঙ্খল বাহিনীর সহায়তা কামনা করেছেন তারা।

বিমানবন্দরের বেশ কয়েকজন যাত্রী জয়নিউজকে জানান, প্রবাসী যাত্রীদের হয়রানি বর্তমানে চরম পর্যায়ে। পুলিশ, কাস্টমস, সিভিল এভিয়েশনসহ প্রতিটি বিভাগের কিছু দুর্নীতিবাজ প্রতিনিয়ত তাদের জিম্মি করছে। অনেক সময় দেখা যায়, ব্যাগেজের তালা ভাঙা এবং পণ্যও পাওয়া যায় ঠিকমতো।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অর্থের বিনিময়ে একটি চক্র যাত্রীদের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্নে সহায়তা করেন। এক্ষেত্রে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীর বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ পেতে তাদের হয়রানি করা হয়।

মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যবসায়ী জয়নিউজকে বলেন, আমার ব্যবসা সংক্রান্ত কাগজপত্র থাকার পরও ইমিগ্রেশন কর্মীরা প্রায়  আড়াই ঘণ্টা আমাকে আটকে রাখে। ভিসার মেয়াদ কম, ছবি ঠিক নেই- এসব অজুহাতে আমাকে অর্থ দেওয়ার আবদার করে বসে। শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, প্রায় সব যাত্রীর সঙ্গেই এমন হচ্ছে। আমরা যাত্রীরাও বাধ্য হয়ে এই অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে মেনে নিচ্ছি। এসব বিশৃঙ্খলা দূর করতে তিনি বিমানবন্দরে সুশৃঙ্খল বাহিনী তথা সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কয়েকদিন আগে দুবাই থেকে এসেছেন আনোয়ার। বিমানবন্দরেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করেন, আমি তিনদিন আগে দুবাই থেকে এসেছি। আমার কিছু পণ্য পরে আসার কথা। আমাকে বলা হলো, মালামাল নিতে পরদিন আসতে। পরদিন যাওয়ার পর বলা হলো, কাল আসেন। আজসহ তিনদিন এলাম কিন্তু পণ্য পেলাম না। এমন অনেক যাত্রী আছেন যারা নিজেদের মালামালের জন্য চার দিন ধরে বিমানবন্দরে আসছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের থেকে নির্দিষ্ট কোনো সূচি কিংবা তথ্য পাচ্ছেন না। এ অনিয়ম দূর করা প্রয়োজন। যদি সেনাবাহিনীর হাতে বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব থাকত তাহলে এমন অনিয়ম হতো না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তদারকি ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি যেমন রয়েছে, তেমন নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় বন্ধ হয়নি। বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে শুরু করে বোর্ডিং লাউঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যাত্রীদের কাছ আদায় করা হয় বাড়তি অর্থ। প্রবেশ এবং প্রস্থানের সময় আনসার বাহিনীর সদস্যদের যাত্রী হয়রানি প্রতিদিনের চিত্র। অনেক সময় যাত্রীরা অনুমোদিত মুদ্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ দেশি ও বিদেশি মুদ্রা বহন করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা কর্মীরাই যাত্রীদের কাছ থেকে তা কেড়ে নেন।

আবার শুল্ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ অর্থের বিনিময়ে নিষিদ্ধ পণ্য বা শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য পণ্য বিশেষ করে টিভি, সোনার বার, মোবাইল ফোন, শাড়ি বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়ার সুযোগ করে দেন। এক্ষেত্রে তারা সর্বনিম্ন ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আদায় করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা পণ্যের একাংশ নানা অজুহাতে রেখেও দেন তারা।

এসব ঝামেলা শেষ করে বিমানবন্দর থেকে বের হয়েও শান্তি নেই। প্রবাসীদের পড়তে হয় অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস সিন্ডিকেটের কবলে। মনিটরিং না থাকায় তারাও সিন্ডিকেট করে প্রবাসী যাত্রীদের তাদের পরিবহন ভাড়া নিতে বাধ্য করে। আর এ সুযোগে আদায় করে অতিরিক্ত অর্থ।

এসব বিশৃঙ্খলার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার এবিএম সারওয়ার-ই জাহানের। তিনি জয়নিউজকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল বিমানবন্দর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর। আমি ২০১৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠেছি। গেল বছর সরকারকে ৫৯ কোটি টাকা প্রফিট এনে দিয়েছি। আমরা বিমানবন্দর থেকে ১ হাজার সোনার বার ও ১৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেছি। কোনো যাত্রী হয়রানির অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। তাই সুনাম ও সফলতায় টিআইবি থেকে আমাকে প্রশংসাপত্র দিয়েছে। সেখানে যাত্রীদের এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন।

ছোটখাটো কিছু অভিযোগ থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাগেজের তালা ভাঙার অভিযোগে দেখা যায় তালা ভাঙা হয়েছে বাইরের দেশের বিমানবন্দরে। যেটার দায়ভার আমাদের উপর চাপানো হয়। আর পরিবহনের ক্ষেত্রে যাত্রীদের হয়রানি রোধে আমরা পরিবহন সমিতিকে ভাড়ার চার্ট করে দিয়েছি। যেখানে ২ হাজার টাকার ভাড়া কমিয়ে ১ হাজার ২শ’ টাকায় আনা হয়েছে।

উল্লেখ, ২০০০ সালে ‘চিটাগাং এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’র আওতায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। যা বছরে ৬ লাখ যাত্রীকে সেবা দিতে সক্ষম। কিন্তু বর্তমানে একই অবকাঠামোয় সাড়ে ১২ লাখের বেশি যাত্রীকে সেবা দিতে হয়। এদিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ২০১৮ সালে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের যাত্রী ছিলেন ১৬ লাখ ৯৩ হাজার। একই সময়ে কার্গো পরিবহন হয়েছে ৭ হাজার ৯১৮ টন। ২০১৭ সালের তুলনায় যাত্রী পরিবহনে ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কার্গো ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বাড়তি এ চাপ সামলাতে দেশের সুশৃঙ্খল বাহিনী প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন মহল।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...