প্লটবাণিজ্য থেকে ‘সেটেলম্যান্ট’: রেলের জমিতে সেভেন স্টারের জমিদারি!

0

ফয়’সলেক এলাকায় পাহাড় কেটে প্লট বিক্রির ফাঁদ পাতেন তারা। কম দামে শহরের মধ্যেই প্লট, নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষরা তাই টোপ গিলতেও সময় নেননি। তবে প্লট কেনাবেচার এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল জালিয়াতিতে ভরা। তাই ক্রেতাদের স্বপ্নের প্লটের স্বত্ব খোয়ানোও ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আদতে হয়েছেও তাই। সম্প্রতি প্রশাসনের নজরে আসে পাহাড়ের এই অবৈধ বসতি। চালানো হয় উচ্ছেদ অভিযান। অতঃপর নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থে, অনেক ক্ষেত্রে ধার-কর্জ করে ‘কেনা জমি’ থেকে উচ্ছেদ করা হয় বসতি গড়া পরিবারগুলোকে।

আলোচিত এ ঘটনার নেপথ্যে ছিল সেভেন স্টার গ্রুপ। নগরের ফয়’সলেক এলাকার বহুল আলোচিত এই ভূমি প্রতারকচক্রের মূল হোতা মামুন প্রকাশ হাট মামুন ও পারভেজ। নেতৃত্বে আছেন খোকন শীলও। এই তিন নেতার প্রত্যক্ষ নির্দেশে অবৈধ প্লট বিক্রিসহ এলাকায় নানা ‘সেটেলম্যান্ট’ করেন নাঈম, আল-আমিন, সুমন ও তাদের অনুসারীরা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অভিযানে এই চক্রের কাছ থেকে কেনা অবৈধ প্লটের দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়। এসময় বেরিয়ে আসে এই প্লটবাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় ১০০টি পরিবারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য।

যেভাবে পাহাড় কেটে তৈরি হয় প্লট

জয়নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় ৫০-৬০ জন শ্রমিককে কাজে নামান সেভেন স্টার গ্রুপের সদস্যরা। তাদের দিয়ে ফয়’সলেকের পাহাড় কেটে প্লট তৈরি ও রাস্তা বানানোর কাজ করানো হয়। এরপর নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষকে নিজেদের জায়গা বলে বিক্রি করা হয় সেই প্লট। এজন্য পরিবার প্রতি নেওয়া হয় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে। পরে সেখানে প্লট কেনা পরিবারগুলো নিজ উদ্যোগে বাড়ি নির্মাণ করে বাস শুরু করেন।

তাদের কষ্টের টাকা নষ্ট হলো যেভাবে

কথা হয় ফয়’সলেক এলাকার রেলওয়ের মালিকানাধীন শান্তিনগর পাহাড়ে বসবাসকারী পারুল (ছদ্মনাম) নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি জয়নিউজকে বলেন, সেভেন স্টার গ্রুপের লোকজন বলেছিল এই পাহাড়ের মালিকানা তাদের। প্রতিদিন ৪০-৫০ জন লোক দিয়ে গাছপালা কেটে পাহাড় পরিষ্কার করত তারা। তারা বলত, এই পাহাড় অনেক সুন্দর করে সাজাবে। আবাসিক এলাকা করবে। বড় বড় প্রকল্প করবে। তাই যারা আগে টাকা দেবে, তাদের থাকার জায়গা মিলবে।

তিনি আরো বলেন, আমার স্বামী মারা গেছে। ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্ট করছি অনেকদিন। আমাদের থাকার জায়গা ছিল না। তাই চারলাখ টাকা চুক্তিতে সেভেন স্টার গ্রুপ থেকে জায়গাটি কিনেছি। অনেক কষ্ট করে চারটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সেভেন স্টারের পারভেজ ও আরো কয়েকজনের সামনে মামুনকে টাকা দিয়েছিলাম। কিন্ত এখন শুনছি এ জায়গা অবৈধ। আমাদের উঠে যেতে হবে।

ভুক্তভোগী এই নারী প্রশ্ন তোলেন, দিনের পর দিন মামুনদের লোকজন যখন পাহাড় কাটত, অবৈধ জায়গা হলে তখন বাধা দেওয়া হয়নি কেন? তখন কেউ কিছু বলল না কেন?

সেভেন স্টার গ্রুপ থেকে জায়গা কেনা আরেক ভুক্তভোগী সেলিম (ছদ্মনাম) জয়নিউজকে বলেন, আমি এখানে পরিবার নিয়ে থাকি তিন বছর। সেভেন স্টার গ্রুপের কাছ থেকে জায়গা কিনে বাড়ি বানিয়েছিলাম। তখন পরিবার ছিল ২০-৫০টির মতো। এখানে আসার পরও দেখেছি প্রতিদিন লোক এসে পাহাড় কাটছে। পাহাড়ের গাছপালা কেটে রাস্তা তৈরি করছে, ঘর বাঁধার জায়গা তৈরি করছে। তখন প্রশাসন তাদের অবৈধ বলেনি, অথচ এখন আমরা অবৈধ হয়ে গেলাম?

দলিল ছাড়া কেন টাকা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তারা আমাদের বলত দশের যে গতি আমারও সে গতি। বাকি সবাই তাদের টাকা দিয়ে ঘর বানিয়েছে। আমিও তাই করেছি। আমাদের এই ১০০ পরিবারের কোনো ঝামেলা হলে তারা এসে সমাধান করত। এমনকি পুলিশ আসলেও তাদের খবর দিলে সব সমাধান হয়ে যেত। তাই সেভেন স্টার গ্রুপের মামুন, পারভেজ, খোকন শীলের মাধ্যমে জায়গাটি কিনেছি। ওই গ্রুপের হয়ে কাজ করা আল-আমিনের মাধ্যমে আমি তাদের টাকা দিয়েছি।

জেলা প্রশাসনের অভিযানে মিলেছে পাহাড় কাটার প্রমাণ

সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা ফয়’সলেক চিড়িয়াখানার পার্শ্ববর্তী শান্তিনগর পাহাড়ে প্রায় ১০০টি পরিবারকে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসবাসরত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাদের উচ্ছেদ করা হয়।

এসময় রেলওয়ের পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে এই চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশও দেন জেলা প্রশাসনের দুই ম্যাজিস্ট্রেট।

সরেজমিন: প্রথমে লুকোচুরি, পরে হুমকি

বিষয়টি নিয়ে সেভেন স্টার গ্রুপের মামুন ও পারভেজের বক্তব্য নিতে তাদের অফিসে যান এ প্রতিবেদক। ফয়’সলেক এলাকার আনসার কার্যালয়ের বিপরীত দিকে একটা আবাসিক হোটেলের নিচতলায় তাদের অফিস। সেখানে গেলে অফিসে ঢুকতে বাধা দেন দুজন ব্যক্তি। এসময় অফিসে আরো কয়েকজন যুবক অবস্থান করছিলেন। মামুন-পারভেজের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে সেখানে অবস্থানরত এক যুবক বলেন, তারা অফিসে আসেননি। কিছু জানার থাকলে তাদের বলতে।

অভিযোগের বিষয় জানালে তিনি বলেন, পাহাড় কাটার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে শান্তিনগর পাহাড়ে বসবাসকারীরা নানা ঝামেলায় আমাদের ডাকে। আমরা গিয়ে মিটমাট করে দিয়ে আসি। শুধু ওই এলাকাই নয়, ফয়’সলেকের অন্য বাসিন্দাদের কোনো ঝামেলা হলেও আমরা সেখানে যাই।

সেভেন স্টার গ্রুপের কাজ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কনস্ট্রাকশন বিজনেস করি। রেস্টুরেন্ট বিজনেসও আছে। আর মানুষের ঝামেলায় মধ্যস্থতা করে সমাধান করার চেষ্টা করি।

কথার এক পর্যায়ে মামুন ও পারভেজের নাম্বার চাইলে রাসেল নামে এক ব্যক্তি জয়নিউজকে বলেন, তাদের নাম্বার দেওয়ার অনুমতি নেই।

ওই গ্রুপের অপর নীতিনির্ধারক খোকন শীল সম্পর্কে জানতে চাইলে অফিসে অবস্থানরত অপর এক ব্যক্তি বলেন, খোকন শীল ইউনিট আওয়ামী লীগের নেতা। তিনি ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জসিম ভাইয়ের অনুসারী। কাউন্সিলরের নির্দেশে তিনি এলাকার মানুষের বিভিন্ন ঝামেলায় মধ্যস্থতা করে থাকেন।

প্রতিবেদক খোকন শীলের নাম্বার চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আপনি যাকে খুঁজছেন আমিই সেই খোকন শীল। আমি কাউন্সিলরের লোক। সেভেন স্টার গ্রুপ বা আমাদের নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না।

অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বিক্রি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব জায়গা অবৈধ আপনাকে কে বলেছে। এই জায়গা ব্যক্তি মালিকানাধীন। কিছু জায়গা চিড়িয়াখানার ছিল। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সে অংশে দেয়াল তুলে দিয়েছে।

এসময় সেখানে অবস্থানরত অপর এক যুবক নিজেকে মামুন পরিচয় দিয়ে বলেন, আমরা পাহাড় কাটি, কাটবও। পরিবেশ অধিদপ্তর, ম্যাজিস্ট্রেট বা কোনো সাংবাদিক আমাদের কিছু করতে পারবে না। যান, কিছু করতে পারলে করে দেখান।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক আবুল মনসুর মোল্লা জয়নিউজকে বলেন, রেলওয়ের মালিকানাধীন শান্তিনগর পাহাড়ে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যাবত অবৈধভাবে পাহাড় কেটে জায়গা বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে। সেভেন স্টার গ্রুপ নামের ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে।

তিনি আরো বলেন, তদন্তে সেভেন স্টার গ্রুপের প্রধান মামুন ও পারভেজসহ আরো কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক বরাবর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনসহ চিঠি পাঠানো হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশগুপ্ত জয়নিউজকে বলেন, সেভেন স্টার গ্রুপ নামে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে রেলওয়ের মালিকানাধীন পাহাড় কাটা ও বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রুপটির সদস্যদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আবদুল হাই জয়নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামের বেশিরভাগ পাহাড়ের মালিকানা বাংলাদেশ রেলওয়ের। সম্প্রতি আমাদের বেদখল হওয়া জায়গাগুলো দখলমুক্ত করতে কিছু পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। ফয়’সলেকের পাহাড় দখলের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

জয়নিউজ/এমজেএইচ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...