কাউন্সিলর মানিক: দখল-আত্মসাতে অবৈধ সম্পদের পাহাড়!

0

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক। পাহাড় কেটে করেছেন পুকুর ও টার্কি খামার। রেলের জমিতে বস্তি বানিয়ে তুলছেন ভাড়া। মসজিদ ও স্কুলের নামে মার্কেট নির্মাণ করে সেই টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে সরকারি-বেসরকারি জমি দখল করে একাধিক বাড়ি নির্মাণেরও। এমন শত শত অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি নিয়ে বর্তমানে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আলোচিত এই রাজনীতিকের নাম এ এফ কবির আহমদ মানিক। তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৪নং লালখানবাজার ওয়ার্ডের টানা তিনবার নির্বাচিত কাউন্সিলর।

স্কুল-মসজিদের নামে মার্কেট গড়ে অর্থ আত্মসাৎ

নালার জায়গা দখল করে লালখানবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে মার্কেট নির্মাণ করেছেন কাউন্সিলর মানিক। মার্কেটের ভাড়া বাবদ পাওয়া টাকা স্কুল ফান্ডে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও স্কুল কর্তৃপক্ষকে বর্তমানে এ বাবদ কোনো টাকা দেওয়া হচ্ছে না। ভাড়ার টাকার পুরোটাই যাচ্ছে মানিকের পকেটে!

লালখানবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদ ইকবাল জয়নিউজকে বলেন, স্কুল মার্কেট বলা হলেও এই মার্কেটের কোনো ভাড়া স্কুল তহবিলে আসে না। মার্কেট হওয়ার পর কাউন্সিলর মানিক ব্যক্তিগত তহবিল থেকে কিছুদিন স্কুলের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও বুয়ার বেতন বাবদ কিছু টাকা দিতেন। ২০১৪ সালের পর থেকে সেই টাকাও আর দেন না।

তবে শুধু স্কুল মার্কেটই নয়, লালখানবাজার জামে মসজিদ মার্কেট নির্মাণের নামে একাধিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে মানিকের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে মসজিদ মার্কেটের দোকান বরাদ্দের নামে লালখানবাজার এলাকার পপুলার ফার্মেসির মালিক শিবু দেবের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন মানিক।

শিবু দেব জয়নিউজকে বলেন, কাউন্সিলর মানিক মসজিদ মার্কেটে চারটি দোকান দিবেন বলে আমার কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। তিন মাসের মধ্যে দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও দোকান বুঝিয়ে দেননি, টাকাও ফেরত দেননি। আমি ব্যাংক থেকে ঋণ করে এই টাকা দিয়েছি। প্রতি মাসে আমাকে সুদ দিতে হচ্ছে।

পাহাড় কেটে জমি বিক্রি, পুকুর, টার্কি খামার

অনুসন্ধানে জানা যায়, কাউন্সিলর মানিক বনায়নের নামে মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় কেটে নিম্ন মধ্যবিত্ত কিছু পরিবারের কাছে জমি বিক্রি করেছেন। পাহাড়ের মাঝখানে নির্মাণ করেছেন রেস্টহাউস।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু রেস্টহাউসই নয়, মানিক পাহাড় কেটে তৈরি করেছেন পুকুরও। স্থানীয়দের কাছে সুইমিংপুল হিসেবে পরিচিত ওই পুকুরে চাষ করা হয়েছে কয়েক প্রজাতির মাছ।

সেইসঙ্গে এই পুকুরের পানি দিয়ে রেস্টহাউজের একপাশে থাকা টার্কি খামারে পানীয়ের জোগান দেওয়া হয়। পুকুরটিতে রয়েছে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা, অবসরে বিশ্রামের জন্য বানানো হয়েছে কয়েকটি ছাতা। এই রেস্টহাউসের সার্বক্ষণিক দেখভালের দায়িত্বে আছেন এরশাদ নামে এক ব্যক্তি। আর সবকিছু তদারক করেন মানিকের বিশ্বস্ত সহযোগী মহসীন।

রেস্টহাউসে ওঠার সিঁড়ির ঠিক নিচে আছে মানিকের একটি চারতলা বাড়ি। বাড়িটিতে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন খাদিজা। বাড়ির ১৫ জন ভাড়াটিয়ার মাসিক ভাড়ার টাকা তুলে মানিকের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় কেয়ারটেকার খাদিজার। তিনি বলেন, এই বাড়ির মালিক কাউন্সিলর মানিক। বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাকে। আমি ভাড়ার টাকা তুলে মালিককে দিই।

ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে একটু সামনে গেলেই চোখে পড়বে মানিকের একটি সেমিপাকা বাড়ি। এই বাড়ির কেয়ারটেকার মান্নান।

মান্নান জয়নিউজকে জানান, এই বাড়িসহ মানিকের আরো তিনটি বাড়ি আছে এখানে। একটা খাদিজা দেখাশোনা করেন। মাছ বাজারের বাড়িটা ফারুক দেখে। আর এই বাড়িটা আমি দেখাশোনা করি।

মানিকের তৃতীয় বাড়িটি মাছ বাজার সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে। সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা পাঁচতলা এই বাড়িটির কেয়ারটেকার ফারুক জয়নিউজের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে তার অনুপস্থিতিতে ভাড়াটিয়া সেজে ফারুকের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে জানা যায়, দুই রুমের একটি বাসার জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা করে। এই বাড়ির মালিক কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়ির মালিক কাউন্সিলর মানিক।

এছাড়া এলাকার পাবলিক হেলথ গলির ১৬৮ নম্বর বাড়িতে ১০টি ফ্ল্যাট রয়েছে মানিকের। ভবনটির বাকি ফ্ল্যাটগুলোর মালিক কাউন্সিলর মানিকের শ্বশুর। ওই বাড়ির দ্বিতীয়তলায় মানিকের ব্যক্তিগত অফিস। বাড়িটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন ইসমাইল নামে একজন কেয়ারটেকার।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনেক

নিজেকে জনগণের বন্ধু দাবি করা কাউন্সিলর মানিকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ অনেক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লালখানবাজারের এক বাসিন্দা জয়নিউজকে বলেন, কাউন্সিলর মানিক এতদিন দিদারুল আলম মাসুমের সঙ্গে ছিলেন। তার কাছ থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। এখন তিনি মাসুমের প্রতিদ্বন্দ্বী বেলালের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। এভাবে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত করে রাখার কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন লালখানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি জয়নিউজকে বলেন, কাউন্সিলর মানিক একজন সুবিধাবাদী প্রকৃতির লোক। স্কুল, মসজিদ, সিটি করপোরেশনের প্রকল্প- এমন কোনো জায়গা নেই যেখান থেকে তিনি টাকা লুট করতে দ্বিধা করেননি। মতিঝর্ণা এলাকায় গেলে তার মাদক আর দখল বাণিজ্যের প্রমাণ পাবেন।

প্রায় একই অভিযোগ করেন লালখানবাজার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলাল। তিনি জয়নিউজকে বলেন, মানিক সাহেব নানা অপকর্ম করেছেন। মসজিদ মার্কেটের নামে টাকা আত্মসাতের জন্য আমি তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলাম। আপনি এখনও এলাকায় ঘুরে দেখলে তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে আমার করা ব্যানার দেখবেন।

অভিযোগ এড়িয়ে গেলেন মানিক

সরকারি জমিতে একাধিক বাড়ি ও রেস্টহাউসের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কাউন্সিলর মানিক অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ারে চেষ্টা করেন। তিনি জয়নিউজকে বলেন, মতিঝর্ণা এলাকায় আমার ও আরো কয়েকজনের শেয়ারে একটি বাড়ি আছে। তবে রেস্টহাউস নয়, আমি পাহাড়ে বনায়ন করেছি। সেখানে অসংখ্য বিরল প্রজাতির গাছ লাগিয়েছি।

তদন্ত করছে দুদক

২০১৮ সালের ৮ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয় থেকে কাউন্সিলর মানিকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য দুদকের চট্টগ্রাম-১ এলাকার উপ-পরিচালক বরাবর চিঠি ইস্যু করা হয়। চিঠি পাওয়ার পর কাউন্সিলর মানিকের এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক হোসাইন শরীফকে। পরবর্তীতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মানিককে ডেকে তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেন দুদকের কর্মকর্তারা।

দুদক সূত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশন ও রেলওয়ের বেশ কিছু জায়গা দখল করে অবৈধভাবে বস্তি তৈরি করেছেন মানিক। এসব বস্তিতে নিম্নআয়ের মানুষকে ভাড়া দিয়েছেন এবং সেই ভাড়ার টাকা তিনি নিজেই ভোগ করছেন। এছাড়া চাঁদাবাজির কয়েকটি অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া গেছে।

এর বাইরে ওয়ান ব্যাংকে কাউন্সিলর মানিকের থাকা একটি ব্যক্তিগত একাউন্টের হিসাবে গরমিলের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-১ এর উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন জয়নিউজকে বলেন, কাউন্সিলর মানিকের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি জায়গা দখল করে অর্থ আত্মসাৎসহ একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তদন্ত শুরু করি। তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে। আমরা খুব শিগগির রিপোর্ট প্রকাশ করব।

জয়নিউজ/এমজেএইচ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...