৩ কারণে পিছিয়ে পড়ছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ

0

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জকে। তবে তিন কারণে জৌলুস হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসাকেন্দ্র।

১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা, যানজট এবং জলজট- এ তিন কারণে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ঐতিহ্য হারাচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

সীতাকুণ্ডের বড় দারোগাহাটে স্থাপন করা হয়েছে ওজন পরিমাপ যন্ত্র। যেখানে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে দেওয়া হচ্ছে না চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই একটি সিদ্ধান্তের কারণে ব্যবসায়িকভাবে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।

সীতাকুণ্ডের বড় দারোগাহাটে ওজন পরিমাপ যন্ত্র

সাম্প্রকিত বছরগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই এখানে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। ভারি বর্ষণে এখানে জমে যায় কোমরপানি। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে নষ্ট হয় লাখ লাখ টাকার পণ্য।

এদিকে যানজটের কারণেও লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আগে যেখানে একবারে ২৫-৩০ টন পণ্য পরিবহন করা যেত এখন সেই পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে দু’বারে। এতে ব্যবসায়ীদের বাড়তি অর্থের পাশাপাশি প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় পণ্যবাহী গাড়ি যানজটে আটকে থাকার কারণে লোকসান গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের।

যানজটের কারণে লোকসান গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের

জানা যায়, অনেক ব্যবসায়ী লোকসান দিতে দিতে ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে। অনেকে বাপ-দাদার ব্যবসা গুটিয়ে শুরু করেছেন ভিন্ন ব্যবসা। এসব কারণে ওয়াল স্ট্রিট খ্যাত এই বাণিজ্যকেন্দ্রের এখন কাহিল অবস্থা।

চট্টগ্রামে সমুদ্রবন্দর থাকায় চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী চাল ও মসলা আমদানি করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করতেন। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আমদানিকারক ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকেও চাল আমদানি করতেন। আর মসলা আমদানি করতেন ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার ও চীন থেকে।

বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চাল-মসলা আমদানি করা হলেও একসময় দেশের সব আমদানি হতো চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ঘিরে। পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গায় আমদানি শুরু হলেও বৃহত্তর চট্টগ্রাম আর চট্টগ্রাম বিভাগের সম্পূর্ণ চাহিদা একমাত্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকেই পূরণ হতো। কিন্তু নানা কারণে চাক্তােই-খাতুনগঞ্জের একক সেই কর্তৃত্ব খর্ব হচ্ছে।

ব্যবসায়ী নুরুল আমিন শান্তি জয়নিউজকে বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ীদের দুঃখ-কষ্ট দেখার কেউ নেই। প্রতিবছর জলাবদ্ধতার কারণে হাজার কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়। দুয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কোমরপানি জমে থাকে। তারওপর ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা, সবমিলিয়ে আমাদের ব্যবসা লাটে উঠেছে।

দুয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে জমে থাকে পানি

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমদ জয়নিউজকে বলেন, ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন করার কারণে পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ১৩ টনের অধিক কোনো মালামাল পরিবহন করতে দেওয়া হচ্ছে না। আগে একটি গাড়িতে ২৫-৩০ টন পর্যন্ত পণ্য বহন করা সম্ভব হতো, সেখানে এখন দুই গাড়িতে করে পণ্য বহন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বেড়ে গেছে পরিবহন ব্যয়। তারওপর যানজটতো আছেই। সবমিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এখানকার ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রামের আমদানি-রপ্তানিকারকদের দ্বিমুখী ভাড়া গুণতে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা উৎপাদিত পণ্য চট্টগ্রামের বাইরে এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাজারে আনতে পারছে না। প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতার বাজার হারাচ্ছে ব্যবসায়ীরা। যে কারণে হারিয়ে যাচ্ছে চাক্তাই-খাতুগঞ্জের সোনালি দিন।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. সোলাইমান বাদশা জয়নিউজকে বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসার জৌলুস কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে বড় দারোগাহাটে ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপন।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ দেশের অন্য কোনো জেলার মহাসড়ক এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। এটি বৈষম্যমূলক আচরণ। এই বৈষম্যে প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রাম চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শান্ত দাশগুপ্ত জয়নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যজুড়ে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এখন প্রায় নেই বললেই চলে। জরুরি ভিত্তিতে চাক্তাই ও রাজাখাল খনন এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পানিপ্রবাহ সচল করতে হবে। তা না হলে জলজটের যন্ত্রণা থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তি পাবে না।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...