চট্টগ্রামে অপ্রতিরোধ্য কিশোর অপরাধীরা

0

চট্টগ্রামে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধীরা। একের পর এক খুন, মাদক চোরাচালান, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও আধিপত্য বিস্তারে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এ নিয়ে গত আট মাসে কিশোর অপরাধীদের হাতে খুন হয়েছেন ৬ জন। এছাড়া গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের কারণে নগরের বিভিন্ন থানায় অন্তত ২৫টির বেশি মামলা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেসবুক-মুঠোফোন, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এদের মাথায় খুন চেপে বসে। তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না থাকা ও পারিবারিক অনুশাসনের অভাবে খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

জানা যায়, চলতি বছরের ৬ এপ্রিল নগরের গোলপাহাড় এলাকায় এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্বের জেরে গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এমএইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে। এর দু’দিন পর পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সাইফুল।

১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের দিন ইয়াবা সেবনের টাকা না পেয়ে বাবা রঞ্জন বড়ুয়াকে ছুরিকাঘাতে খুন করে তার ছেলে রবিন বড়ুয়া। কোতোয়ালি থানার কাজির দেউড়ির ব্যাটারি গলিতে এ ঘটনা ঘটে। বাবার ঘাতক এই কিশোরের বয়সও ১৮ বছরের নিচে।

১০ মে নগরের পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর পিলখানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছুরিকাঘাতে খুন হন মোস্তাক আহমেদ (৩৫)। ছেলের সঙ্গে বখাটে কিশোরদের ঝগড়া মেটাতে গেলে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এ ঘটনায় জড়িত ১০-১৫ জনের সবার বয়স ১৮ বছরের কম।

১৪ মে নগরের ডবলমুরিং থানার হাজিপাড়ায় রিকশাচালক রাজু আহমেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় ১০-১২ জনের কিশোর। জানা যায়, তাদের ‘বড়ভাই’ ছগির হোসেন জেল থেকে নির্দেশ দেন মফিজ নামের একজনকে খুন করার জন্য। কিন্তু টার্গেট মিস করে কিশোররা রাজুকে খুন করে ফেলে। পুলিশ পরে ওই গ্রুপের ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে, এদের সবার বয়স ১৮ বছরের মধ্যে।

১৮ জুলাই রাতে পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় কিশোর অপরাধীদের নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে খুন হয় মোবারক হোসেন (২০) নামের এক কিশোর। এ ঘটনায় মো. রুবেল (১৮) ও মো. হৃদয় (১৭) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাগরিকা গরুর বাজারের বিপরীতে বসে ছিনতাই করা মালামাল ভাগ বাটোয়ারা করছিল ১০-১২ জনের গ্রুপটি। একপর্যায়ে মালের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয় তাদের মধ্যে। এসময় মোবারক থাপ্পড় দেয় রুবেলকে। গ্রুপের অন্যরা রুবেলের পক্ষ নিয়ে মোবারককে মারতে শুরু করে। এরপর বাঁশ দিয়ে মোবারকের মাথায় আঘাত করলে তার মৃত্যু হয়।

পুলিশ জানায়, মোবারক ও হত্যাকারীরা সবাই একই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তারা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ করত। ঘটনার পরে দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে রুবেল ও হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।

কিশোর অপরাধের সর্বশেষ বলি জাকির হোসেন সানি (১৮)। সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে নগরের খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজের ফটকের অদূরে ইক্যুইটি ভবনের সামনে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সানি। এ খুনের নেপথ্যে বেসরকারি ওমরগণি এমইএস কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তবে নিহতের পরিবার বলছে, প্রেমসংক্রান্ত কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। সানি ঢাকার মিরপুরের একটি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার উত্তরায় আদনান হত্যার পর সারাদেশে আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং কালচার। বর্তমানে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২০টির বেশি কিশোর গ্যাং। নগরের ৩শ’ স্পটে অন্তত ৫৫০ জন কিশোর অপরাধীর বিচরণ। নগরের এই স্পটগুলোতেই তাদের আড্ডা বসে নিয়মিত। এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের নানা নামে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে কিশোর অপরাধীরা।

স্কুল-কলেজ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা দ্বন্দ্ব মেটাতে শিশু-কিশোররা কয়েকজন মিলে গড়ে তুলছে গ্যাং বাহিনী। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এবং পাশ্চাত্যধারা অনুকরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নস্থানে নিজেদের পরিচয় করছে বিচিত্র সব নামে। এসব কিশোররা প্রকাশ্যেই জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সংঘাত-হানাহানিতে।

বিত্তশালী পরিবারের আদুরে সন্তানদের নানামুখী অপরাধমূলক কার্যক্রম ভাবিয়ে তুলেছে চট্টগ্রামের সচেতন মহলকে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এসব কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে কিছু ‘বড়ভাই’ নামধারী রাজনৈতিক নেতা। যাদের ছত্রছায়ায় এসব কিশোর অপরাধী দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ সিকান্দার খান জয়নিউজকে বলেন, অপরাধ করার সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম যদি সহজেই কিশোররা পেয়ে যায় তাহলেতো তারা অপরাধ করবেই। একশ্রেণির লোক কিশোরদের অপরাধে সংশ্লিষ্ট এসব সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। তা দিয়ে কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বয়সে যারা কিশোর তাদের সবসময় ভিন্ন কিছুর দিকে মনোযোগ থাকে বেশি। এ জন্য অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু আইনের প্রয়োগ দিয়ে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে সরানো যাবে না। এ জন্য পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। সন্তানরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে অভিভাবকদের সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে, ধর্মীয় অনুশাসন মানতে হবে এবং সমাজের প্রত্যেক মানুষকে যে যার অবস্থান থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বলছে, গত দেড় বছরে কিশোর অপরাধের ঘটনায় নগরের ১৬ থানায় অন্তত ২৫টি মামলা হয়েছে। মারামারি, খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫০ জনের বেশি কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সিএমপির কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন জয়নিউজকে বলেন, খুন, চুরি-ছিনতাই, ইভটিজিংসহ সব ধরনের অপরাধেই কিশোর অপরাধীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। কিশোর অপরাধের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তবে পুলিশ এসব অপরাধ দমনে সর্বদা সতর্ক।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক জয়নিউজকে বলেন, কিশোর অপরাধীদের ব্যাপারে পুলিশ সতর্ক আছে। তবে শুধু পুলিশি অ্যাকশন দিয়ে এ ধরনের সামাজিক অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য অভিভাবক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও ভূমিকা রাখতে হবে।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...