চমেকের জরুরি বিভাগে ধীরগতি

0

সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়েছেন ফটিকছড়ির মনছুর। কান বেয়ে পড়ছিল রক্ত। তার পাশেই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে বসে আছেন কানু দাশ। আবার প্রতিপক্ষের হামলায় মাথা ফাটিয়ে এখানে এসেছেন হাটহাজারীর আসিফ।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিত্র এটি। মনছুর, কানু আর আসিফ যন্ত্রণায় ছটফট করলেও জরুরি ভিত্তিতে তাঁদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যিনি ছিলেন তিনি ব্যস্ত অন্য রোগী নিয়ে।

প্রায় আধঘণ্টা যন্ত্রণায় ছটফট করার পর চিকিৎসাসেবা পান মনছুররা। শুধু মনছুরদের ক্ষেত্রে নয়, এমনটি ঘটছে জরুরি বিভাগে আসা প্রায় সবার ক্ষেত্রে। মূলত চিকিৎসক সংকটের কারণে চমেকের জরুরি বিভাগের সেবা চলছে ধীরগতিতে।

সরেজমিন চিত্র
প্রতিদিন এক শিফটে গড়ে সাড়ে তিনশ’ রোগীর জরুরি চিকিৎসা দিচ্ছেন মাত্র একজন ডাক্তার! আর তাদের ওয়ার্ডে দিয়ে আসতে কাজ করছেন মাত্র আটজন ওয়ার্ডবয়। অথচ এখানে গড়ে প্রতি দুই মিনিট পরপর আসছেন নতুন রোগী।

জরুরি বিভাগের নিজস্ব ডাক্তার থাকার কথা আটজনের। কিন্তু এখন আছে মাত্র দুইজন, বাকি শূন্যপদে ছয়জন স্পেশাল অডার্র নিয়ে অন্য ওয়ার্ড থেকে এসে রোগী দেখছেন। প্রতি শিফটে একজন করে দিনে তিনজন ডাক্তার প্রতিদিন গড়ে রোগী দেখেন নয়শ’ থেকে এক হাজার!

জরুরি বিভাগের চিকিৎসা
জরুরি বিভাগে ডাক্তাররা এলেও তেমন কোনো চিকিৎসা দিতে পারেন না। তাঁরা শুধু রোগের বিবরণ শুনে রোগীকে পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন ওয়ার্ডে। অবশ্য এর চেয়ে বেশি কিছু তাদের করারও থাকে না। এ বিভাগের ডাক্তারদের লক্ষ্য থাকে দ্রুত রোগীদের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে পাঠানো।

ডাক্তার সংকটের কথা স্বীকার করেন জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত ডা. ধীমান চৌধুরী। তিনি জয়নিউজকে বলেন, একজনের পক্ষে এত রোগী দেখা অসম্ভব। তারপরও আমাদের দেখতে হচ্ছে। প্রাথমিক চিকিৎসা ও নির্দেশনা দিয়ে আমরা যত দ্রুত সম্ভব রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাঠানোর চেষ্টা করি। আবার অনেক সময় এ বিভাগ থেকে চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের বাসায়ও ফেরত পাঠানো হয়।

ওয়ার্ডবয় সংকট
জরুরি বিভাগে প্রতিদিন তিন শিফটে মোট ৩০ জন ওয়ার্ডবয় কাজ করেন। সকালের শিফটে ১০, বিকেলে ৮ এবং রাতে ৬ জন কাজ করেন। কিন্তু রোগীর চাপ এত বেশি থাকে যে রোগী স্থানান্তরে তাদের হিমশিম খেতে হয়। প্রায় দেখা যায়, তারা যখন রোগী নিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে যান তখন মারাত্মক সংকটাপন্ন কোনো রোগী এলে তাদের তাৎক্ষণিক ওয়ার্ডে নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। তখন বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনদেরই ঠেলতে হয় ট্রলি আর হুইলচেয়ার!

নেই পর্যাপ্ত ট্রলি-হুইলচেয়ার
ডাক্তার-ওয়ার্ডবয় ছাড়াও জরুরি বিভাগে ট্রলি আর হুইলচেয়ারেরও রয়েছে চরম সংকট। মাত্র ৮টি ট্রলি আর ৪টি হুইলচেয়ার নিয়ে চলছে জরুরি বিভাগ! ওয়ার্ডবয়রা রোগীদের নিয়ে গেলে তখন আবার নতুন করে আসা রোগীদের বসার বা শোয়ার জন্য থাকে না কোনো ব্যবস্থা। এ অবস্থায় কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় মারাত্মক আহত রোগীদের।

টিকিট বিড়ম্বনা
ডাক্তার আর ওয়ার্ডবয়দের সেবা পাওয়ার আগে রোগীদের টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। রোগীদের এ টিকিট কাটতে অনেক সময় পড়তে হয় লম্বা লাইনের বিড়ম্বনায়। টিকিট কাউন্টারে রয়েছেন মাত্র দুইজন টিকিটম্যান। এর ফলে নাম-পরিচয় এন্ট্রি করতে রোগীর স্বজনদের অনেক সময় লেগে যায়। আর ততক্ষণ চিকিৎসা ছাড়াই অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের।

রোগী কল্যাণ সমিতি বলছে…
সমাজসেবা কর্মকর্তা ও রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ সাহা জয়নিউজকে বলেন, চমেকের জরুরি বিভাগ রোগীদের রেফারেন্স সেন্টার হিসেবে কাজ করছে মাত্র। এ বিভাগে নামমাত্র চিকিৎসা দেওয়া হয়। ডাক্তারের সংখ্যাও কম। আমরা হাসপাতাল পরিচালককে বলেছি, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, দ্রুত জরুরি বিভাগের অবকাঠামো বাড়ানো হবে।

কর্তৃপক্ষ বলল…
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম জয়নিউজকে বলেন, কোনো বেতন ছাড়াই প্রায় সাড়ে তিনশ’ স্পেশাল আয়া-ওয়ার্ডবয় হাসপাতালে দায়িত্বরত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময় অসততার অভিযোগে তাদের ছাঁটাই করে দিয়ে এখন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে আয়া-ওয়ার্ডবয়। সংকট সমাধানে আরো আগেই আমরা ২৫০ জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি ইস্যু করেছি। আশা করি, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।

জরুরি বিভাগের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবখানেই জনবল সংকট নিয়ে আমরা হাসপাতালের কার্যক্রম চালাচ্ছি। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন যে সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসে, তাতে কমপক্ষে প্রতি শিফটে ৩০ জন করে জনবল দরকার। কিন্তু এখন সারাদিনে কাজ করে ৩৮ জন ওয়ার্ডবয়। তবে সরকারিভাবে কাজ করছে মাত্র ৪ জন। তাই পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তারওপর রয়েছে জনবল সংকট, তাই সবাইকে একটু কষ্ট সহ্য করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে ওয়ার্ডবয়ের জন্য অপেক্ষা না করে রোগীর স্বজনদেরও কাজ করতে হবে।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...