অনলাইন শপিং নাকি প্রতারণার হাট!

0

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের আকিব পড়ালেখার পাশাপাশি করেন ফ্রিল্যান্সিং। হঠাৎ তার শখ জাগে হাতে পড়বেন স্মার্টওয়াচ। অনলাইনে খুঁজতেও শুরু করেন। ফেসবুকে কিছুক্ষণ স্ক্রলিংয়ের পর পেয়ে গেলেন কাঙ্ক্ষিত স্মার্টওয়াচটির বিজ্ঞাপন।

নামি কোম্পানির পেইজে দেওয়া বিজ্ঞাপন, তাই বিশ্বাস করে বিকাশে পাঠিয়ে দিলেন আগাম টাকাও। কথা ছিল, দুই-তিনদিনের মধ্যে পণ্য পাবেন হাতে। কিন্তু পেতে সময় লাগল পাঁচদিন! তবে শুধু যে দেরি হয়েছে তা নয়, মনমতো পণ্যটিও পাননি আকিব।

আকিবের অভিযোগ, ফেসবুক পেইজে যেভাবে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়, আদতে তেমন মানসম্পন্ন পণ্য মেলে কম।

অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে আকিবের মতো প্রতারিত হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রতারিতদের প্রশ্ন, অনলাইন শপিং কী এখন মার্কেটপ্লেস নাকি প্রতারণার হাট?

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনলাইন কেনাকাটায় মানুষের আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অভিযোগও। একই ব্র্যান্ডের পণ্য একেক সাইটে একেক রকম দাম। এতে একেক গ্রাহকের একেক রকম অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

নতুন করে যেসব উদ্যোক্তা ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হচ্ছেন তাদের অনেকেরই অনলাইন ব্যবসা সম্পর্কে তেমন একটা ধারণা নেই। তাই কিছুসংখ্যক অসাধু ও অদক্ষ ব্যবসায়ীর কারণে দক্ষ ব্যবসায়ীদেরও দুর্নাম হচ্ছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের একটি সংগঠন থাকলেও তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও সন্তোষজনক নয়।

প্রতিবেদনের শুরুতে কথা হচ্ছিল আকিবের প্রতারিত হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে। আকিব আরো বলেন, আমি বিজ্ঞাপনে যে স্মার্টওয়াচটির অর্ডার দিয়েছিলাম তারা আমাকে সেটি দেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি আমাকে পুরোনো একটি স্মার্টওয়াচ পাঠিয়েছে। তাও নির্ধারিত সময়ের দুইদিন পর।

পুরোনো পণ্য পাওয়ার পর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পণ্য হাতে নিয়ে প্রথমে আমি রিসিভ করতে চাইনি। পরে কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মীর অনুরোধে রিসিভ করেছি। তারপর তার সামনেই আমি প্রতিষ্ঠানটির হেল্পলাইনে ফোন দিই। তখন আমি তাদের কাছে জানতে চাই, কেন আমাকে পুরোনো পণ্য দেওয়া হলো। তারা বলল, আমাদের স্টকে আপনার চাহিদামাফিক পণ্যটি নেই। তাই আপনাকে এ স্মার্টওয়াচটি দেওয়া হয়েছে।

এসময় অনলাইন ব্যবসায়ের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে আকিব বলেন, এভাবে সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে অনলাইনে ব্যবসা করা যায় না। কারণ একদিন যে ঠকবে, সে কখনও আর ওই প্রতিষ্ঠানের পণ্য অর্ডার করবে না।

প্রায় একই অভিযোগ ইউটিউবার রনির। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে একটি অনলাইন শপিং সাইট থেকে ব্ল্যাক কালারের ফুল স্লিভ জেন্টস ক্যাজুয়াল জ্যাকেট কিনেছিলাম এক হাজার ৪৮০ টাকায়। পরে দেখি একই ব্র্যান্ডের একই রঙয়ের জ্যাকেট আজকেরডিলডটকমে বিক্রি হচ্ছে ৪৯৯ টাকায়। পরে সেখান থেকেও একটি জ্যাকেট কিনি। মার্কেটপ্লেসের ভিন্নতায় এত বড় প্রতারণার শিকার হব তা বুঝতেই পারিনি।

এই ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনলাইন মার্কেটের জনপ্রিয়তা বাড়লেও এখনও সরাসরি বিপণিবিতান থেকে পণ্য কেনাই ভালো মনে হচ্ছে। এতে দর যাচাই করে দেখে-শুনে ভালোমানের পণ্য কেনা যায়।

যা করতে পারে ই-ক্যাব
ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) নামে এ খাতের ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি সংগঠন আছে। এই সংগঠনের নীতি-নির্ধারকদের বক্তব্য, প্রতারণা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রতারণায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রাজীব আহমেদ বলেন, প্রতারণার অভিযোগ আসে অনেক। তবে ই-ক্যাবের সদস্য হলেই আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে এজন্য আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের সংগঠনের ৯৪৫ জন সদস্য রয়েছে। এর বাইরেও হাজার হাজার অনলাইন আছে। তবে কেউ প্রতারিত হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কাছে অভিযোগ করতে পারে।

৭০০ কোটির বাজার, প্রতিদিন গড়ে ক্রেতা ৩০ হাজার
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ই-কমার্স বাজারের পরিধি বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিদিন ৩০ হাজার ক্রেতা অনলাইনে পণ্যের অর্ডার দেন। ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বছরে একবার হলেও অনলাইনে পণ্য অর্ডার করেন।

যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ পরিসংখ্যান খুবই নগণ্য। কারণ ভারতে অনলাইন গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটি, চীনে প্রায় ৪০ কোটি। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত, সেখানে বাংলাদেশে এখনও জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম অনলাইনে শপিং করেন।

প্রতারণা এড়াতে করণীয়
অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণা এড়াতে মোট নয়টি পরামর্শ দিয়েছেন এ খাতসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে- কম দামে লোভনীয় অফার এড়িয়ে চলা, প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ, ট্রেড লাইসেন্স আছে কি না যাচাই, বিকাশে পেমেন্টের ক্ষেত্রে নম্বর যাচাই, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে রসিদ ও ক্যাশ অন ডেলিভারিতে পণ্য গ্রহণ, ফেসবুকে কেনাকাটায় গ্রুপ বা পেজের রিভিউ দেখে নেওয়া, বিশ্বাসযোগ্য পেজ গ্রুপ থেকে অর্ডার করা, পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করা যায় এমন গ্রুপ পেজ থেকে কেনাকাটা এবং সব ধরনের রসিদ সংরক্ষণ করা।

জয়নিউজ/এমজেএইচ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...