চুনতি অভয়ারণ্যের বুক চিরে রেলপথ, বিশেষজ্ঞরা বললেন বিকল্প উপায়

0

এশিয়ান হাতির অন্যতম আবাসস্থল ও হাতির প্রাকৃতিক প্রজননকেন্দ্র চুনতি অভয়ারণ্য। ২০১২ সালে বন ও পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখায় জাতিসংঘের ইক্যুয়েটর পুরস্কার লাভ করে এ অভয়ারণ্য।

এ অভয়ারণ্যের বুক চিরে (কোর জোন) যাচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। এতে কাটা পড়বে এ অভয়ারণ্যের ৫০টি শতবর্ষী মা গর্জন গাছসহ প্রায় ১ লাখ গাছ।

পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এতগুলো গাছ কেটে রেলপথ তৈরি করতে গিয়ে এ অভয়ারণ্যের বিশাল ক্ষতি হবে। হুমকিতে পড়বে অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য। বৃক্ষ নিধন, শব্দদূষণ ও ভীতির কারণে হারিয়ে যেতে পারে শতবর্ষী গাছে বাস করা বিলুপ্ত পাখিসহ নানা বন্যপ্রাণী।

এ অবস্থায় বিকল্প উপায়ও বলে দিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, এ অভয়ারণ্যকে রক্ষা করে চুনতি বাজার থেকে হারবাং পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্বদিকে রেলপথ তৈরি হলে বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পেত।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চকরিয়া ও বাঁশখালী এলাকায় ১৯ হাজার ১৭৭ একর জমি নিয়ে চুনতি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য এলাকা গড়ে উঠেছে। অভয়ারণ্য ঘোষণার পর এ বনে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে জীববৈচিত্র্য। সংরক্ষিত এ বনে বর্তমানে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৩ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১০৭ প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। মূলত বৃক্ষ এবং বৃক্ষের ফলের উপর নির্ভরশীল এ বনের প্রাণিদের জীবনচক্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চুনতি অভয়ারণ্য শতবর্ষী মা গর্জন গাছ সমৃদ্ধ বিশাল বনাঞ্চল। বনের ভেতর রোহিঙ্গাসহ স্থানীয়দের অবৈধ বসতি এবং কাঠ ব্যবসায়ীরা এ বনাঞ্চল ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ যাচ্ছে চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর। এতে কাটা পড়বে প্রায় ৫০টি শতবর্ষী মা গর্জন গাছসহ ১ লাখ গাছ। নষ্ট হবে জলাধারসহ বিভিন্ন ছড়া।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ রেলপথ চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর প্রায় ১০ কিলোমিটার যাবে। ওই রেল লাইনের ২১টি স্থানে রয়েছে হাতির বসতি ও চলাচলের পথ।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চুনতি অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তা মঞ্জু আলম জয়নিউজকে বলেন, চুনতি বনের ভেতর মিরিখিল সুফিনগর এলাকা থেকে হারবাং পর্যন্ত অভয়ারণ্যের মাঝখানে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ তৈরি হচ্ছে। তবে এটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্বপাশে দক্ষিণ বন বিভাগ দিয়ে গেলে হয়ত অভয়ারণ্যের ক্ষতি কম হত। সুরক্ষিত থাকত বনের বিশাল জীববৈচিত্র্য।

যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান জয়নিউজকে বলেন, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই শরীর থেকে একটা অংশ কেটে গেলে তা যেমন অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি এ রেলপথ তৈরি করতে গিয়ে অভয়ারণ্যের কিছু ক্ষতি হচ্ছে। তবে এডিবির অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে বনের পরিবেশ নিয়ে সচেতন রয়েছি। যত গাছ কাটা পড়বে তার তিনগুণ গাছ আমরা লাগিয়ে দেব। হাতির চলাচলের জন্য পরিবেশবান্ধব ওভারপাস তৈরি করা হবে। বন্যপ্রাণীর জন্য তৈরি হবে কিছু জলাধার ।

এ ব্যাপারে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মো. ইয়াছিন জয়নিউজকে বলেন, এ রেললাইন যদি চুনতি এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্বদিকে যেত তাহলে অভয়ারণ্যের ক্ষতি কম হতো। দীর্ঘদিন ধরে চুনতি অভয়ারণ্যের ভেতর রোহিঙ্গাসহ নানা অবৈধ বসতি গড়ে উঠায় বনের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। রেললাইন নির্মাণের ফলে সেখানেও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবেই। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি গাছের বিপরীতে তিনটি চারাগাছ লাগিয়ে দেবে, এতে হয়ত ক্ষতি কিছুটা লাঘব করা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বললেন…

চুনতি অভয়ারণ্য নিয়ে ১৯৯০ সাল থেকে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা ফিরোজ। যোগাযোগ করা হলে তিনি জয়নিউজকে বলেন, চুনতি অভয়ারণ্য হলো এশিয়ান হাতিসহ অন্যান্য প্রাণীর প্রধান আশ্রয়স্থল। একটা অভয়ারণ্যের কোর জোনের (প্রধান অংশ) ভেতর রেলপথ নিয়ে যাওয়া কোনো মতেই উচিত না। এটা চুনতি এলাকার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পূর্বদিকে নিয়ে গেলে অন্তত অভয়ারণ্যের পরিবেশ কিছুটা রক্ষা পেত। এতে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ব্যত্যয় ঘটত না।

চট্টগ্রাম বিশ্বব্যিালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আকতার হোসেন জয়নিউজকে বলেন, চুনতি অভয়ারণ্য জীববৈচিত্র্যে ভরপুর একটি এলাকা। যেকোনো কারণে ৫০টি শতবর্ষী মা গর্জন গাছসহ ১ লাখ গাছ কাটা পড়লে তা অবশ্যই জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কাটা পড়া গাছের মধ্যে যদি কোনো বিলুপ্তপ্রায়/বিপন্ন উদ্ভিদ থাকে তাহলে ওই প্রজাতিটির সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির শঙ্কা তৈরি হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা জরুরি। বাজেট কিছু বেড়ে গেলেও রেলের এলাইনমেন্টকে বনের বাইরে দিয়ে অথবা অন্তত অভয়ারণ্যের সীমানার বাইরে দিয়ে নিয়ে যেতে পারলে অভয়ারণ্য ও তৎসংলগ্ন পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য ভালো হতো।

এ ব্যাপারে পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জয়নিউজকে বলেন, দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন তবে তা বন ও পরিবেশ ধ্বংস করে নয়।

জয়নিউজ/বিআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...