‘স্বজন’ বিড়ম্বনা

0

বোয়ালখালীর গৃহবধূ রোকসানা আক্তারকে সাপে কামড়ায় ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে। আহত রোকসানাকে নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ভর্তি করা হয় ১৬নং (মেডিসিন) ওয়ার্ডে।

রোকসানার সঙ্গে মেডিকেলে আসেন তাঁর পাঁচ আত্মীয়। ইন্টার্ন ডাক্তাররা চিকিৎসা শুরু করলেও আত্মীয়রা ঠাঁয় বসে থাকেন রোকসানার পাশে। এতে ডাক্তারদের চিকিৎসা দিতে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। বারবার বলার পরও তারা সেখানেই বসে ছিলেন। অথচ নিয়ম হলো, রোগীর সঙ্গে শুধু একজন স্বজন থাকতে পারবেন।

এ নিয়ম মানেন না বেশিরভাগ রোগীর স্বজনরা। রাত-দিন একাধিক স্বজন বসে থাকেন রোগীর পাশে। মূলত ওয়ার্ডের গেটম্যানদের টাকা দিয়ে তারা ভেতরে ঢুকে পড়েন। ডাক্তার ও নার্সরা তাদের থাকতে নিষেধ করলেও রোগীর শয্যা পাশ থেকে সরেন না তারা। এতে ব্যাহত হয় চিকিৎসাসেবা।

জানা যায়, চমেক হাসপাতালে অনুমোদিত শয্যার তিনগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে প্রতিদিন। এর সঙ্গে যোগ হয় রোগীর স্বজন। প্রতিনিয়তই হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার অনেক বেশি স্বজন ভিড় করেন। এ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে রোগী সেবার সঙ্গে তাদের স্বজনদের নিয়ন্ত্রণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

হাসপাতালের মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, নিউরো মেডিসিন, অর্থোপেডিক এবং শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের সামনে অনেক স্বজন ভিড় করেছেন। অনেকেই ওয়ার্ডে প্রবেশ করতে গেলে নিরাপত্তা প্রহরীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। আবার অনেকে নিরাপত্তা প্রহরীর হাতে টাকা গুজে দিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছেন।

অর্থোপেডিক ওয়ার্ডের সামনে রাকিব নামের এক যুবক জয়নিউজকে বলেন, আমার বড় ভাই ভেতরে ভর্তি আছেন। তার সঙ্গে আমার আম্মা ও খালা আছেন। আমি ওষুধ আনতে নিচে গেছি। কিন্তু এখন ঢুকতে আবার দারোয়ানকে ১০ টাকা দিতে হবে। না হলে ঢুকতে দিবে না।

জানা গেছে, ১৯৫৭ সালে যাত্রা করা এ হাসপাতালে বর্তমানে ৪৫টি ওয়ার্ড, ৪৮টি বিভাগ এবং ১৫টি বহির্বিভাগ আছে। হাসপাতালে বর্তমানে অনুমোদিত শয্যা সংখ্যা ১ হাজার ৩৪৮টি। তবে প্রতিনিয়তই এখানে ভর্তি থাকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৮০০ রোগী। ভর্তি হওয়া প্রতিজন রোগীর সঙ্গে থাকেন দুই থেকে তিনজন করে স্বজন। তাছাড়া প্রায় ১৫টি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে রোগী দেখা হয় ২৫০ জন করে। এ বিভাগেও প্রতি রোগীর সঙ্গে থাকেন এক থেকে দু’জন করে।

ফলে প্রতিদিন হাসপাতালে রোগী-স্বজন মিলে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ অবস্থান করেন। আবার এরসঙ্গে থাকে নানা প্রকারের যানবাহন। তাছাড়া সবার ব্যবহৃত উচ্ছিষ্টসহ নানা বর্জ্যও জমা হয় হাসপাতালে। ফলে নোংরা হয় হাসপাতালের পরিবেশ।

হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রিজোয়ান রেহান জয়নিউজকে বলেন, উন্নত বিশ্বে একজন রোগীর সঙ্গে একজন স্বজন থাকেন, এটিই নিয়ম। কিন্তু আমাদের দেশে একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন আসার প্রবণতা বেশি। এটি কোনো মতেই উচিত নয়। এর মাধ্যমে রোগীর সেবা দিতে আসা স্বজনেরও নানা ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে। মানুষের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনও অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই বোঝেন না।

জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ জয়নিউজকে বলেন, চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন শয্যাসংখ্যার তুলনায় তিনগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগের রোগী এবং রোগীর স্বজন মিলে এই হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন। একজন রোগীর সঙ্গে একজন স্বজনই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে নানা প্রক্রিয়া হাতে নিয়েও স্বজনদের ঠেকানো যাচ্ছে না। তাই এখন রোগীদের সেবার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের নিয়ন্ত্রণ করা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই রোগীর সঙ্গে ওয়ার্ডে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বসে থাকেন। তাদের কিছু বলাও যায় না। নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের কিছু বললে রোগীর স্বজনেরা তাদের দিকে তেড়ে আসেন। সমস্যা সমাধানের জন্য সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।

জয়নিউজ/বিআর
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...