সিনেমা হল: যেন হারাধনের গল্প

0

আশির দশক পর্যন্ত দর্শকের জোয়ার ছিল সিনেমা হলগুলোতে। নব্বই দশকের শেষদিক থেকে শুরু হয় ভাটা। এ কারণে ‘হারাধনের দশটি ছেলে’র গল্পের মতো একে একে হারিয়ে যেতে থাকে জলসা, ‍সাগরিকা, উপহার ও বনানী কমপ্লেক্সের মতো একসময়ের অভিজাত সিনেমা হলগুলো।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নব্বই সালে নগরে সিনেমা হল ছিল ৫০টি। আর বর্তমানে সেই সংখ্যা ৪। স্রোতের বিপরীতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছে আলমাস, দিনার, সিনেমা প্যালেস ও পূরবী সিনেমা হল।

সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের অভিযোগ, তিন কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলগুলো। কারণগুলো হলো- হলগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা ও বাজে পরিবেশ, মানসম্মত সিনেমার অভাব এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যর্থতা।

মানসম্মত সিনেমার অভাব এবং উন্নতমানের প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন আলমাস সিনেমা হলের ব্যবস্থাপক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আউয়াল। তবে এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন আরেকটি বিষয়।

মুক্তিযোদ্ধা আউয়াল জয়নিউজকে বলেন, সিনেমা ব্যবসা ধ্বংসের আরেকটি কারণ হলো পাইরেসি। পাইরেসির কারণে মুক্তিপ্রাপ্ত নতুন সিনেমা মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

হলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, স্যানিটেশন সমস্যা, ভাঙা সিট ইত্যাদি কারণেও দর্শক সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, যোগ করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দর্শকখরায় ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে নগরের অনেক সিনেমা হল। যার মধ্যে রয়েছে কাজীর দেউরির ‘ঝুমুর’, চকবাজারের ‘গুলজার’, জেলখানা রোডের ‘রঙ্গম’, লালদীঘির ‘খুরশিদ মহল’, পাহাড়তলীর ‘আকাশ’ ও ‘অলঙ্কার’, ঝাউতলার ‘নুর জাহান’, আতুরার ডিপুর ‘সঙ্গীত’, কালুরঘাটের ‘সিনেমা কর্ণফুলী’, অক্সিজেনের ‘চাঁদনি’, দুই নম্বর গেটের ‘রূপালী’, হালিশহরের ‘স্যারিসন’, টাইগার পাসের ‘নেভী’, আগ্রাবাদের ‘সাগরিকা’, ‘সানাই’, ‘বনানী’, ‘উপহার’ ও ‘রিদম’, পতেঙ্গার ‘শাহীন’ ও ‘নেভী’, স্টেশন রোডের ‘উজালা’, ‘নূপুর’ ও ‘মেলোডি’, সদরঘাটের ‘লায়ন’ এবং নিউ মার্কেটের ‘জলসা’।

নগরে এখন শুধু চালু আছে কাজীর দেউরির ‘আলমাস’ ও ‘দিনার’, কে সি দে রোডের ‘সিনেমা প্যালেস’ এবং চামড়া গুদাম এলাকার ‘পূরবী’। সরেজমিন ঘুরে এই চার হলের করুণ দশা দেখা গেছে।

এসব হলে দর্শক নেই বললেই চলে। হলের ভেতরের অবস্থা খুবই খারাপ। পর্যাপ্ত সিট থাকলেও ভালো সিট খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনো সিটের হাতল ভাঙা, আবার কোনোটির ফোম উঠে গেছে। কোনো হলেই খুঁজে পাওয়া গেল না দর্শকদের জন্য স্বাস্থ্যকর টয়লেট। হাত দিয়ে নাক-মুখ চেপে তবেই এসব টয়লেট ব্যবহার করতে হয়।

এরপরও টিকিট হাতে কাউন্টারে দর্শকের প্রতীক্ষায় রয়েছেন সিনেমা হলের ম্যানেজার। তারা জানান, সিনেমা হলে দর্শকের ভাটা চলছে। প্রতিটি শো’তে ১০-১৫ জনের বেশি দর্শক পাওয়া যায় না।

তারা আরও বলেন, ভালো হল না থাকলে ভালো সিনেমা হবে না। আবার ভালো সিনেমা না হলে হল ভালো হবে না। একটি সিনেমা হলে দেড়-দুই হাজার আসনের প্রয়োজন নেই। প্রতিটি জেলা শহরে একটি করে সিনেপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। একটি সিনেপ্লেক্সের ভেতর চারটি হল থাকবে। ঢাকা শহরে চারটি সিনেপ্লেক্স ও একুশটি সিনেমা হল আছে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। হলের পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এদিকে চার সিনেমা হল ঘুরে শুধু একটি দম্পতিকে খুঁজে পাওয়া গেল যারা হলে সিনেমা দেখতে এসেছেন! আলমাস সিনেমা হলে তাঁরা এসেছেন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমাটির দুপুর ৩টার শো দেখতে।

ওই দম্পতি জয়নিউজকে বলেন, আসলে হলে এসে সিনমা দেখতে খুব ইচ্ছে করে। বিশেষ করে নতুন সিনেমা এলে বড় পর্দায় দেখতে ইচ্ছে করে। তবে হলের আবস্থা খুব বাজে। অপরিচ্ছন্ন হল, মশার উপদ্রপ, ফ্যান-এসি কোনটিই কাজ না করায় ভীষণ গরম। চেয়ারের অবস্থাও শোচনীয়।

এদিকে সচেতন মহল মনে করছে, এভাবে চলতে থাকলে হারাধনের গল্পের মতো সব সিনেমা হল হারিয়ে যাবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হলের আধুনিকায়ন।

জয়নিউজ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...