মুজিব আদর্শের বীর সেনানী আবদুল্লাহ আল হারুন

0

চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী এই জনপদে একজন সজ্জন মানুষ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনৈতিক নেতা। গণমানুষের পরম বন্ধু। অর্থ এবং পেশী নিয়ন্ত্রিত অস্থির রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে তিনি ছিলেন আদর্শনির্ভর প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যার পর আওয়ামী লীগের চরম দুঃসময়েও তিনি মুজিব আদর্শ থেকে সরে যাননি।

এই মহান রাজনীতিবিদ ১৯৩৩ সালে রাউজান থানার গহিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম লীগের জনসভায় তরুণ আবদুল্লাহ আল হারুন সভামঞ্চের খুব কাছে বসেই বক্তব্য শুনছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন জননেতা এম এ আজিজ। তিনি তাঁকে দেখে কাছে ডেকে নেন এবং তাঁর সাথে হ্যান্ডশেক করে কুশল জিজ্ঞেস করেন। এই ছোট একটা ঘটনা তার জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে। জড়িয়ে পড়েন রাজনীতির বন্ধনে ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এম এ আজিজের স্নেহচ্ছায়ায় সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন আবদুল্লাহ আল হারুন। তিনি ১৯৫০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। তিনি প্রগতিশীল মন মানসিকতার কারণে প্রথম থেকেই মুসলিম লীগ বিরোধী ছিলেন। সে কারণে কলেজে তাঁর একটা আধুনিক মন-মানসিকতা সম্পন্ন ছাত্রনেতা হিসেবে ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে।

তিনি ছিলেন ভাষা সৈনিক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৬ সালে তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মরহুম এম এ আজিজের সাথে গিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানরত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে জে এম সেন হলে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬২-৬৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

১৯৬৮ সালে আবদুল্লাহ আল হারুন জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ সকল আসামির মুক্তির দাবিতে পরিচালিত আন্দোলনে তিনি সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও সকল বন্দি মুক্তি লাভ করেন। মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সংবর্ধনা আয়োজনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন আবদুল্লাহ আল হারুন।

রাউজানে তখন জাঁদরেল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন মুসলিম লীগের ফজল কাদের চৌধুরী। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে এই কুখ্যাত ফ কা চৌধুরীর পরাজয়ের পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন আবদুল্লাহ আল হারুন। সেই নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন দৈনিক আজাদি সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ।

মুক্তিযুদ্ধে আবদুল্লাহ আল হারুনের অবদান অসামান্য। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করলে তিনি (আবদুল্লাহ আল হারুন) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন।

’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যা পরবর্তী সময়ে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের সদস্য নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক সরকারের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে এই দায়িত্ব পালন করা রীতিমতো দুঃসাহসের কাজ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ’৭১-এর অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আবদুল্লাহ আল হারুন ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করে তার সাহিত্যপ্রীতি আর সৃজনশীলতার পরিচয় দেন। বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। ছিলেন স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা।

১৯৭৫ সালের পর রাউজান এলাকায় স্বৈরাচার জিয়া-এরশাদের আশীর্বাদপুষ্ট মুসলিম লীগ নেতা রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাউজানে খুন আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। সেই সময় এই এলাকায় আবদুল্লাহ আল হারুন পালন করেছিলেন ত্রাণকর্তার ভূমিকা। রাউজান সংসদীয় আসনে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন নৌকার হয়ে। যদিও ভোট ডাকাতি আর সন্ত্রাসের কারণে ফলাফল তার অনুকূলে আসেনি ।

সার্বক্ষণিক রাজনীতির মানুষ হলেও আবদুল্লাহ আল হারুন ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিসেবী। সক্রিয় রাজনীতি থেকে তিনি সরে আসেন ২০০০ সালের প্রথম দিকে। অবসর নেওয়ার পর তিনি যুক্ত থাকতেন মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিভিন্ন উৎসবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মেলা-পার্বণ আয়োজন অনুষ্ঠানে থাকতেন সম্পৃক্ত।

মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিসি)-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন। তার সুযোগ্য কন্যা শামীমা লুবনা পিতার আদর্শকে ধারণ করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন ছাত্রাবস্থায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন ।

২০০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এই ক্ষণজন্মা বীর পুরুষ পরলোকগমন করেন।

জয়নিউজ/আরসি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...