ভালো মানুষ সেজে প্রতারণা

0

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগ। সস্তান প্রসবের জন্য এখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত ও নিরক্ষর। নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসা নিতেই তাদের এখানে ছুটে আসা।

তবে সস্তান প্রসবের আগমুহূর্তে ভর্তি হয়ে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় প্রতারকদের খপ্পরে! ‘ভালো মানুষ সেজে’ এ প্রতারণা করে প্রতারকরা। প্রতারকদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে হাসপাতালের অসাধু কর্মচারীদের।

অভিযোগ আছে, গর্ভবর্তী নারী ভর্তি হলে চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখে দেন। দালালরা এ সুযোগ ব্যবহার করে ‘কম টাকায় ওষুধ’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যান।

অনেক সময় একজন রোগীকে তিন-চারজন দালাল ঘিরে ধরে। প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে বিভিন্ন ছাড়ের লোভ দেখিয়ে রোগীর স্বজনদের আগ্রহী করে তুলে। রোগীর স্বজনরা কম টাকার আশায় দালালের ফাঁদে পড়েন। পরিণতি, অনেক বেশি টাকায় তাদের ওষুধ কিনতে হয়।

ঝাউতলা থেকে রোগী নিয়ে আসা আফছানা নামের এক নারী বলেন, ‘চিকিৎসকের কক্ষ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নার্স একজন লোকের সঙ্গে আমাকে যেতে বলে। ওই লোকের সঙ্গে মেডিকেলের সামনে লোটাস ফার্মেসিতে যাই। সেই ফার্মেসি থেকে ওষুধ নেওয়ার পর ৪ হাজার ২শ টাকা বিল আসে।

অথচ ওষুধ আনার পর আমার এক পরিচিত বলেছেন, ওষুধগুলোর দাম সবমিলিয়ে এক থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে নেওয়া সম্ভব। আমি এ বিষয়ে অভিযোগ দিতে গেলে কেউ কথা বলার সুযোগ দেয়নি। ফার্মেসিতে গেলে তারা আমাকে চিনে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।

চমেকের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগ ঘুরে দেখা গেছে, অন্য ওয়ার্ডগুলোর তুলনায় এই বিভাগে দালাদের দৌরাত্ম্য বেশি। রোগীর সন্তান প্রসবের সময় চিন্তিত স্বজনদের তারা হাসপাতালের নানা আইনকানুন দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় টাকা।

শুধু যে নিরক্ষর মানুষ বোকা বনে যায় এমন নয়। ডেলিভারির আগমুহূর্তে বোকা বনে যায় অনেক সচেতন স্বজনও। ওয়াডের নার্স, আয়া, বয়, ক্লিনার এবং তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর যোগসাজশে দালালচক্র এসব অবৈধ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এ চক্রের মাধ্যমে চলছে ওষুধ কেনার নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া।

প্রসবযন্ত্রণায় কাতর স্ত্রীকে নিয়ে চমেক হাসপাতালে এসেছিলেন কৃষি ব্যংকের সরকারি কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওয়ার্ডের ভেতর থেকে এক নার্স বের হয়ে আমাকে একটা ওষুধের স্লিপ হাতে দেন। কিন্তু স্লিপ আমাকে দেওয়ার আগে এক লোক আমার হাত থেকে স্লিপটি নিয়ে নেন। তিনি আমাকে বলেন, তার সঙ্গে যেতে, তিনি সব করে দিবেন।

ওই লোক আমাকে বলেন, বাচ্চার পজিশন ভালো না এখন অপারেশন করতে হবে। হাসপাতালের আইন অনুযায়ী এই কাগজে সিল লাগবে। সিলের জন্য টাকা লাগবে। আর ওষুধ যা লাগবে সব তিনি অল্প দামে কিনে দিবেন। এমনভাবে বলছিল, মনো হলো পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে। তাছাড়া ক্রিটিকাল সময়ে তারা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে যেকেউ তাদের বিশ্বাস করবে।

খায়রুল ইসলাম বলেন, আমার প্রথম সন্তান- খুব চিন্তিত ছিলাম। ওই লোক যেভাবে পরামর্শ দিয়েছে আমি সেভাবেই করেছি।

অভিযোগের বিষয়ে চমেক ৩৩ নম্বর গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের একাধিক চিকিৎসক ও নার্সের কাছে প্রতিবেদক গেলেও তারা কেউই কথা বলতে রাজি হননি।

বিকালের শিফটে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক বলেন, আপনি বিভাগীয় প্রধান ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলেন। এসব বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারব না।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্স জয়নিউজকে বলেন, গাইনি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ জন দালাল থাকে। আমরা তাদের কিছু বলতে পারি না কেননা তাদের সঙ্গে বড় কর্মকর্তাদের লিংক আছে। তারা সবার সামনে এসব অবৈধ কাজ করে। রোগীর স্বজনরা কয়েকদিন মেডিকেলে থাকলে তাদের চিনে যায়।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার শাহানারা চৌধুরী সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে উনার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

পরে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জয়নিউজকে জানান, গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডাক্তার শাহানারা চৌধুরী দেশের বাইরে আছেন।

তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে অবগত আছি। ইতিমধ্যে কয়েকটি দালালচক্রকে আমরা গ্রেপ্তারও করেছি। আপনাদের কাছে এমন কোনো দালালের তথ্য বা ছবি থাকলে আমাদের দিন, আমরা অবশ্যই তাদের গ্রেপ্তার করবো।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...