হেলমেট নয় যেন প্লাস্টিক টুপি

0

নগরে অল্পসময়ে ও স্বল্প খরচে বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রীদের পৌঁছে দেয় একাধিক মোটরসাইকেল যাত্রী সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের চালকরা মোটামুটি দামের হেলমেট পড়েন আর যাত্রীদের দেন নিম্নমানের হেলমেট। এর ফলে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণা বলছে, দেশে ব্যবহৃত হেলমেটের বেশিরভাগই দুর্ঘটনায় সুরক্ষা দেয় না। এদিকে হেলমেটের মান পরীক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) হলেও আইনি জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটি হাত গুটিয়ে আছে।

দেশে এখন উবার, মটো, পাঠাও, ওভাই, ওবোন, সহজ, স্যাম, চলো, ইজিয়ার, পিকমি, আমার বাইক, সহজ রাইডার্স, বাহন, আমার রাইড, ঢাকা রাইডার্স ও ঢাকা মটোসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিংয়ের সুবিধা দিচ্ছে। এরমধ্যে উবার ও পাঠাওতে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার হয়।

এদিকে ভারতে মোটরসাইকেল আরোহীদের ‘আইএসআই, যুক্তরাষ্ট্রে ‘ডট’ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ‘ইসিআই’ মানের হেলমেট ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও আমাদের দেশে এ রকম কোনো নিয়ম নেই।

যাত্রীদের নিম্নমানের হেলমেট দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে উবার ও পাঠাও রাইড শেয়ারে চালক মহসিন জয়নিউজকে বলেন, ভালো মানের হেলমেটের ব্যাপারে যাত্রীদের কোনো অভিযোগ না থাকাতে আমরাও দিই না। যা দিই তাও তারা অনেকসময়ে পড়তে চান না।

আরো পড়ুন: আরোহীর হেলমেট না থাকলেই মামলা

‘পুলিশের মামলার ভয়ে আমরা যাত্রীদের হালকা হেলমেট দিই, তবে অনেকে এতে বিরক্ত হয়ে যান। দামি হেলমেট দেওয়ার কোনো নির্দেশনা যেমন নেই, ঠিক তেমনি কেউ যদি নিজের ঝুঁকির কথা মনে করেন, তাহলে তাকে নিজ দায়িত্বে ভালো দামের হেলমেট নিতে হবে।’

আগ্রাবাদের উবার অফিসের কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করার শর্তে জয়নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামে কয়েকটি কোম্পানি রাইড শেয়ারের মাধ্যমে দৈনিক ৬০ হাজারেরও অধিক যাত্রী পরিবহন করে। ঢাকাতে উবার মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট দিলেও চট্টগ্রামে আগামীতে দেওয়া হবে। তবে মানের ব্যাপারে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।

পাঠাওতে আগে কেউ তাদের অ্যাপসে সংযুক্ত হলেই দিতো বিনামূল্যে হেলমেট। সারাদেশে অনেক দুর্ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে, যাত্রীদের মাথায় ছিল পাঠাওয়ের নিম্নমানের হেলমেট।

জানা যায়, মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআইএ’র কোনো রকম অনুমতি না নিয়ে চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যেই ২৭ হাজার হেলমেট মার্কেটে বিতরণ করবে পাঠাও। ফলে প্রশ্ন উঠে, পাঠাও তার যাত্রীদের যে হেলমেট দিচ্ছে সেটা যাত্রীকে কতটুকু নিরাপত্তা দিবে?

ফিনলে স্কয়ারে অবস্থিত পাঠাও অফিসের কর্মকর্তা মি. বাতেন পরিচয়ে জয়নিউজকে বলেন, সাংবাদিকদের কোনো তথ্য দেওয়ার নিয়ম নেই।

এসময় তিনি ঢাকা অফিসের মিডিয়া অফিসার ওসমান সালেহ’র নাম্বার দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে তাকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে বিএসটিআই বাধ্যতামূলক মান পরীক্ষার তালিকায় ১৩০ নম্বরে পণ্য হিসেবে আছে মোটর সাইকেল ও হেলমেট। এ ব্যাপারে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বিএসটিআই চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক মো. নুরুল আমিন জয়নিউজকে বলেন, সরকারের আমদানি নীতিতে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা না থাকাতে আমরা কিছুই করতে পারি না। যদি থাকত তবে কাস্টমস কিংবা আমদানিকারকরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত।

আরো পড়ুন: বাইকের পেছনের আরোহীকেও পড়তে হবে হেলমেট

চট্টগ্রামে কেউ যদি হেলমেট তৈরি করত তবেই মানের প্রসঙ্গটি আসত। আমার জানা মতে, এখানে কেউ হেলমেট তৈরি করেন না। চীন থেকেই হেলমেটগুলো আমাদের দেশে আমদানি করা হয়, যোগ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি ট্রাফিক (দক্ষিণ) মো. আমির জাফর জয়নিউজকে বলেন, ইতোমধ্যে আমরা মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রীদের হেলমেট পড়া বাধ্যতামূলক করেছি। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত নিম্নমানের হেলমেটের ব্যাপারে তেমন নজর দেওয়া হয়নি। তবে এখনই সমস্ত অফিসারদের ব্যাপারটি সম্পর্কে ওয়্যারলেসে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কেউ যাতে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার না করতে পারে।

ডিসি আরো বলেন, আমরা প্রথমে তাদের সতর্ক করব। এরপরেও যদি কেউ আইন না মানে তবেই মামলা করা হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিওএইচও) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ২০২০ সালের মধ্যে নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহারের কারণে এক লাখ ৬৩ হাজার থেকে দুই লাখ ১৪ হাজার মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হতে পারে।

ইউনাইটেড ন্যাশনস ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপের মোটরসাইকেলের হেলমেট সমীক্ষা শীর্ষক এক গবেষণার তথ্য মতে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ!

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, গত ১৫ বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশ হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ৮৮ শতাংশের মাথায় কোনো হেলমেট থাকে না। ২০১৭ সালে রাজধানীতে ৪৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত হয়। গত বছরে ৮ মাসে ৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জন প্রাণ হারায়।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...