দেশের একমাত্র জাদুঘরটিতে বাড়ছে প্রাণচাঞ্চল্য

0

তুরাজ ও ইরাজ দুই ভাই। তুরাজ তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র, আর ইরাজ সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বাবা আজিজুর রহমানের সঙ্গে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে এসেছে এই দুই ভাই।

দুই ছেলেকে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখাচ্ছেন আজিজুর। দুই শিশুসন্তানও খুব আগ্রহভরে দেখছে নিদর্শনগুলো।

জাদুঘরে এসে ভীষণ খুশি তুরাজ। ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, “বাবার সঙ্গে জাদুঘর দেখতে এসেছি। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে।”

কী কী দেখেছ জিজ্ঞেস করতেই ঝটপট উত্তর- “বাংলাদেশে বসবাসকারী খুদে জনগোষ্ঠীদের জীবনযাপন, ব্যবহার করা জামা-কাপড় অনেককিছু দেখেছি।”

সন্তানদের নিয়ে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে আসার কারণ জানতে চাইলে আজিজুর রহমান জয়নিউজকে বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সন্তানদের মাঝে মাঝে বেড়াতে নিয়ে যায়। আজ এখানে নিয়ে এলাম। আমি চাই, তারা যেন এখন থেকেই খুদে জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে শেখে। বাবা হিসেবে সন্তানকে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানানো আমার দায়িত্ব।

নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত দেশের একমাত্র জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক আচার, ঐতিহ্যের নমুনা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৬৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় ১৯৭৪ সালে।

বর্তমানে জাদুঘরটিতে দেশ বিদেশের একটি জাতি, ১২টি জনগোষ্ঠী এবং ২৬টি মৌলগোষ্ঠীর নিদর্শন রয়েছে। রয়েছে বাঙালি জাতিসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সাংস্কৃতিক আচার, পোশাক ও অলংকারের নিদর্শন। আলোকচিত্র, মডেল, নমুনার মাধ্যমে জাতিগোষ্ঠীগুলোর নিজস্বতা তুলে ধরা হয়েছে।

জাদুঘরে বাঙালি, চাকমা, মারমা, মুরং, সাঁওতাল, খাসিয়া, গারো, চাক, পালিয়া, কোচ, হদি, চাম্পুরা, খুমি, খ্যাং, বোনা, মণিপুরী, পাওনা, হাজং, দালু, মান্দাই, কোঁচ, ওঁরাও, রাজবংশী, কোঁচ, বাগদি এবং রাখান জাতির সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। আবার ওঁরাও, মান্দাই, রাজবংশী বা হাজং জাতির নিদর্শন বলতে শুধু কয়েকটি আলোকচিত্র দেওয়ালে সাঁটানো অবস্থায় আছে।

ভারতের অরুণাচলে বসবাসকারী আদি, মধ্যপ্রদেশের ফুওয়া ও মুরিয়া এবং মিজোরামের মিজোদ, জার্মান প্রাচীরের কিছু ধ্বংসাবশেষ, কিরগিজস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার জাতিগোষ্ঠীর কয়েকটি নিদর্শনও রয়েছে জাদুঘরে।

১ দশমিক ৩৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটিতে মোট ১১টি কক্ষ রয়েছে। গ্যালারি রয়েছে চারটি।

এক নম্বর গ্যালারির প্রথম কক্ষে রয়েছে বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, জীবনযাপনের বিভিন্ন চিত্র ও নমুনা।

দ্বিতীয় গ্যালারিতে উপস্থাপন করা হয়েছে পাকিস্তানের পাঠান, পাঞ্জাবসহ চারটি জাতির পোশাক, হস্তশিল্প, অস্ত্র ও বাদ্যযন্ত্রের নমুনা।
তৃতীয় গ্যালারিতে রয়েছে মুরংদের গ্রাম্যজীবন, কাঠের চিরুনি, ধূমপানের নল, বাঁশের ক্ষুর, গরুর গলার ঘণ্টা, পানির পাত্র এবং পাহাড়ি খাড়ি নদীতে চলমান নৌকা।

চতুর্থ গ্যালারিতে রয়েছে খুমি জীবনধারার আলোকবচিত্র, চাকমাদের ব্যবহৃত পোশাক, শিকারের অস্ত্র, চাকমা মুদ্রা, চাকমা হস্তলিপি ও তন্ত্রমন্ত্রের পাণ্ডুলিপি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পোশাক-পরিচ্ছদ, পাহাড়ি খাড়ি নদীতে ব্যবহৃত কাঠের নৌকা এবং পাহাড়ি জীবনধারার আলোকচিত্র।
জাদুঘরের কেন্দ্রীয় হলঘরে গেলে নজরে পড়বে বাংলাদেশে খুদে জনগোষ্ঠীগুলোর ব্যবহৃত শিল্পগুণ সমৃদ্ধ নানা মূল্যবান অলংকার। যার মধ্যে রয়েছে হাতের বালা, চুড়ি, বাজুবন্ধনী, কানের দুল, চুলের কাটা, নাকফুল, কোমড়ের বিছা, হাতের আংটি ও তুলসি মালা। সবমিলিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ৩ হাজার ২০০-রও ও বেশি নিদর্শন আছে জাদুঘরে।

জাদুঘর দেখতে এসেছেন খুলশির বাসিন্দা আবদুল্লা আল নোমান। তিনি জয়নিউজকে বলেন, ২০ বছর আগে একবার এসেছিলাম। আজ আবার এলাম। এই জাদুঘর থেকে আমার দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে জানতে পারি। জানতে পারি তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রোববারের সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া প্রতিদিনই জাদুঘর দর্শনার্থীর জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে সরকার ঘোষিত সাধারণ এবং নির্বাহী আদেশে ছুটির দিন বন্ধ থাকে। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এবং গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে শুক্রবার নামাজের বিরতি হিসেবে বেলা সাড়ে ১২টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

২০ টাকার টিকিট কেটে যেকোনো বাংলাদেশ নাগরিক এ জাদুঘর ঘুরে দেখতে পারবে। আর স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য মাত্র ৫ টাকা। তবে বিদেশি নাগরিকদের টিকিট কাটতে হবে বাড়তি মূল্যে। তাদের জন্য প্রতিটি টিকিটের দাম ২০০ টাকা। তবে সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হলে তারা অর্ধেক মূল্যে অর্থাৎ ১০০ টাকায় টিকিট নিতে পারবেন।

জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের কর্মকর্তা আঁখি দাশ জয়নিউজকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নতুন নতুন নিদর্শন সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশ নতুন নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলো জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে। নিদর্শনগুলো আধুনিকভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, গড়ে প্রতিদিন ২০০ দর্শনার্থী জাদুঘরে আসছেন। ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা সংযোজন ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের জন্য একটি বড় জেনারেটরও রয়েছে। এছাড়া একটি দোতলা অফিস ভবন ও ডরমিটরি নির্মিত হয়েছে।

অনেকেই এ জাদুঘর সম্পর্কে জানে না মন্তব্য করে আঁখি বলেন, আমরা যেন সবাইকে এই জাদুঘর সম্পর্কে জানাতে পারি এজন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের ওয়েবসাইট সার্বক্ষণিক আপডেট থাকে। এছাড়া জাতীয় দিবস এবং সরকারি বন্ধে স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়। এই জাদুঘরের উপর বিভিন্ন বইও রয়েছে। যেগুলো থেকে সহজে জাদুঘর সম্পর্কে জানা যাবে।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...