২৩ ফার্মেসিতে জিম্মি চমেক হাসপাতাল

0

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালকে জিম্মি করে রেখেছে ২৩টি ফার্মেসি। এসব ফার্মেসির অর্ধশত দালাল ছড়িয়ে রয়েছে মেডিকেলজুড়ে। দালালদের মূল কাজ হলো, ‘ভালো মানুষ সেজে’ রোগীর স্বজনের ওইসব ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া। এজন্য তারা প্রতিটি প্রেসক্রিপশনের মোট বিলের বিপরীতে ৩০ শতাংশ কমিশন পান!

অভিযোগ রয়েছে, ২৩ ফার্মেসির দালালচক্রকে সহায়তা করেন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল হক ভুঁইয়া, এস আই তালেবসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তারও। তারা সবাই প্রতি মাসে বড় অঙ্কের টাকা পান ওই ২৩ ফার্মেসি থেকে।

এদিকে ওই ২৩ ফার্মেসির অলিখিত একটি অ্যাসোসিয়েশনও আছে। যেটি পরিচিত ’২৩ ফার্মেসির দালাল অ্যাসোসিয়েশন’ নামে।

কোন ফার্মেসির দালাল কারা

১. হীরা মেডিকেল। দালাল- উত্তম, মিলন ও স্বপন ।

২. রাঙ্গুনিয়া ফার্মেসি। দালাল- জাহাঙ্গীর ও রাসেল।

৩. বিকে ফার্মা। দালাল- সুজন, সবুজ ও উজ্জ্বল।

৪. সবুজ ফার্মেসি। দালাল- আমজাদ ,জসীম ও রুবেল।

৫. নিশাদ মেডিকো। দালাল- রাজু ও বড়ুয়া বাবু।

৬. নোভা মেডিকো। দালাল- নুর হোসেন , কাদের ও পলাশ।

৭. লাজ ফার্মা। দালাল- আকতার ও হারুন।

৮. ফেনী মেডিকো। দালাল- সিরু, সেলিম ও হানিফ।

৯. সানন্দা ফার্মা। দালাল- রাসেল ও মিন্টু।

১০. জয় ফার্মা। দালাল- উত্তম ও সঞ্জয়।

১১. ন্যাশনাল ফার্মেসি। দালাল- তুফান ও জিকু।

১২. মেডিসিন স্টোর।  দালাল- সিরাজ।

১৩. সিটি মেডিকেল। দালাল- শাহজাহান ও সাইফুল।

১৪.  একুশে ড্রাগ হাউজ। দালাল- রাজীব ও সজীব।

১৫. জনতা ড্রাগ হাউজ । দালাল- জিকু ও তুফান।

১৬. নিহা মেডিকেল। দালাল- সবুজ ও ফারুক।

১৭. সমুন ড্রাগ । দালাল- তপন ও ওমর।

১৮. লোটাস ফার্মেসি। দালাল- বাবু ও  ব্ল্যাক জাহাঙ্গীর।

১৯. সাহা মেডিকো। দালাল- অপু ও জুয়েল।

২০. সাহানুর মেডিকো। দালাল- নিমাই।

২১. জয়নব ফার্মেসি। দালাল- কার্তিক।

২২. রিনা মেডিকো। দালাল- মৃদুল।

২৩. সিকদার মেডিকো। দালাল- মিন্টু ও দুলাল।

হাতেনাতে ধরা পড়া এক দালাল বলল…

চমেক হাসপাতালে জয়নিউজের অনুসন্ধানে হাতেনাতে ধরা পড়ে এক দালাল। নাম প্রকাশ করা না হবে বলে আশ্বস্ত করলে সে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেয়।

ওই দালাল জানায়, ২৩ ফার্মেসি ও দালালদের মেইনটেইন করে নুরু ভাই। ওই ২৩ ফার্মেসির সঙ্গে মেডিকেলের পুলিশের প্রধান জহির স্যারসহ সবার সম্পর্ক আছে। আমরা কখনও রোগীর আত্মীয়র কাছে ধরা খেলে জহির স্যার এসে সব সিস্টেম করে দেয়। তখন আমাদের ৫০০ টাকা দিতে হয়।

সে আরও জানায়, আমাদের কাজ হলো ডাক্তার ওষুধের স্লিপ দিলে রোগীর স্বজনদের বুঝিয়ে আমাদের কন্ট্রাক্ট থাকা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া। এরপর প্রতিটি প্রেসক্রিপশনের জন্য আমরা ৩০ শতাংশ কমিশন পাই। এক প্রেসক্রিপশনে মেডিকেলের ফার্মেসিতে যে ওষুধের দাম আসে হাজার টাকা, ওই ২৩টি ফার্মেসিতে তার দাম আসে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা।

অসহায় মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করতে খারাপ লাগে না জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত। যখন দেখি অনেকেই এটি করছে তখন মানিয়ে নিয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, টাকার লোভ তো…।

চমেকের ২৩ ফার্মেসি, দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে প্রকাশ হবে আরো দুটি বিশেষ প্রতিবেদন

অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের

দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল হক ভুঁইয়া। তিনি জয়নিউজকে বলেন,  আমি বা আমার ক্যাম্পের কারো সঙ্গে দালালদের যোগাযোগ নেই। নুরু বা যাদের নাম বলেছেন তারা দোকানদার, তাই সবাইকে চিনি। আর আপনি যে এস আই তালেবের কথা বলছেন সে আমার ক্যাম্পের না। সে পাঁচলাইশ থানার পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, এসব নিয়ে আমি থানায় কয়েকবার লিস্ট দিয়েছি। থানা ব্যবস্থা না নিলে আমি কি করবো।  দালালদের আমি এরেস্ট করে চালান দিই। নুরুর ভাই মেডিকেলের কর্মকর্তা নাছিরের ছেলেকে হাতেনাতে ধরে চালান দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, আপনি বুঝেন না দালালের টাকা কোথায় পর্যন্ত গেলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। আমি এসব বিষয়ে বলতে পারবো না। আপনি আরো অনুসন্ধান করুন। শুধু আমাকে এদের সঙ্গে জড়াবেন না।

এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেন পাঁচলাইশ থানার এসআই তালেবও। তিনি জয়নিউজকে বলেন, আমার সঙ্গে দালালদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নুরুর সঙ্গে কথা হয়েছে এক বছর আগে। আমাদের ডিউটির সময় মাঝেমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দিতাম। এখন আর যোগাযোগ নেই।

এসআই তালেব এক বছর আগে নুরুর সঙ্গে কথা হয়েছে দাবি করলেও জয়নিউজের অনুসন্ধান বলছে তাঁর এ দাবি সঠিক নয়। গত ২৪ আগস্ট রাতেও এসআই তালেব মুঠোফোনে কথা বলেছেন দালালচক্রের মূল হোতা নুরুর সঙ্গে। যার প্রমাণ জয়নিউজের কাছে সংরক্ষিত আছে।

অভিযোগ স্বীকার নুরুর

পুলিশ অভিযোগ অস্বীকার করলেও ওই ধারায় যাননি ২৩ ফার্মেসি দালাল অ্যাসোসিয়শনের আহ্বায়ক নুরু। যিনি আবার হীরা মেডিকো ফার্মেসির মালিক। চমেকে দালালদের উত্থান মূলত এই নুরুর হাত ধরেই।

নুরু জয়নিউজকে বলেন, মেডিকেলের পূর্ব গেইটে আমাদের ২৩ ফার্মেসির অবস্থা দেখলে বুঝবেন। খুব খারাপ অবস্থা। আমাদের বেচা-বিক্রি কম। তাই বাধ্য হয়ে এসব করতে হয়। আর এটার কারণে অনেক ছেলের পেট চলে। আমি এই ব্যবসা ছেড়ে দিবো, এবারের মতো মাফ করে দেন আমাদের।

পুলিশ ও হাসপাতাল কর্মকর্তার যোগসাজশ আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই আপনি যেহেতু এত তথ্য বের করে ফেলছেন এটা আরো ভালো জানবেন। পুলিশ,  হাসপাতাল কর্মকর্তাসহ ভিতরের লোক ছাড়া এসব করা যায় না।

কী বলছে কর্তৃপক্ষ

দালালচক্রের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান জয়নিউজকে বলেন, তারা (পুলিশ) কোনো ধরনের লেনদেন বা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকলে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।

দালালচক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের প্রসঙ্গে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমেদ জয়নিউজকে বলেন, ‘ভালো মানুষ সেজে প্রতারণা’ শিরোনামে জয়নিউজে সংবাদ প্রকাশের পর আমরা গাইনী ওয়ার্ড থেকে কয়েকজকে আটক করেছি। তবে এখন যে সিন্ডিকেট বা অ্যাসোসিয়শনের কথা বলছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আগে দেখতে হবে তাদের সঙ্গে কারা ইনভল্ব। পলিটিক্যাল গ্রুপ  ইনভল্ব থাকলে সেটা টেকেল করা কঠিন হবে। তবে যদি লোয়ার লেভেলের কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান নয় যে কাউকে হুট করে বের করে দিতে পারবো। সরকারি কাজ সরকারি নিয়ম অনুসারেই করতে হবে।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...