ফয়’স লেক ছাড়তে হচ্ছে কনকর্ডকে

0

স্টাফ রিপোর্টার:ফয়’স লেকে আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হচ্ছে কনকর্ড গ্রুপকে। ইজারার একাধিক শর্ত ভঙ্গ ও লভ্যাংশ ভাগাভাগিতে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে রেলওয়ে। ফলে চুক্তির ১৩ বছর পর লেকের ৩৩৭ একর ভূমি শিগগিরই বুঝে নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ফয়’স লেকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় ২০০৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রেলওয়ে ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে কনকর্ডের ৫০ বছর মেয়াদি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। কিন্তু রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৩৫তম সভায় ইজারা বাতিল করার সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের পক্ষে প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ইসরাত রেজা চুক্তিটি বাতিল করেন। ১৯ জুলাই কনকর্ড গ্রুপের চেয়ারম্যানকে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়।

চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ বিষয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর ও চলতি বছরের মাঝামাঝিতে দুই দফা তদন্ত করে রেলওয়ে। দুটি তদন্তেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কনকর্ডকে একাধিক চিঠিও দেয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৯ মে দুই মন্ত্রণালয়ের উপস্থিতিতে কনকর্ডের সঙ্গে বৈঠক হয়। চুক্তির শর্ত পরিপালন না করলে কনকর্ডের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় সেই বৈঠকে।

চুক্তিভঙ্গের বিষয়ে রেলের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শর্তানুযায়ী প্রকল্প এলাকায় রেলের পর্যবেক্ষণের জন্য ২০০ বর্গফুটের একটি অফিসঘর নির্মাণ করে দেয়ার কথা। কিন্তু এক যুগেও তা বাস্তবায়ন করেনি কনকর্ড। এছাড়া হ্রদে যন্ত্রচালিত নৌকা বা বোট পরিচালনা না করা, রেলওয়ের অনুমোদন ছাড়া ইজারাকৃত ভূমির আকার-আকৃতি পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও রূপান্তর না করা এবং মত্স্য চাষ ও শিকার না করার কথা থাকলেও সেসব মানছে না কনকর্ড। শর্ত ভেঙে লেক এলাকায় ১৩টি কটেজ, ৩৬ কক্ষবিশিষ্ট একটি রিসোর্ট ও সি-ওয়ার্ল্ড নামের একটি ওয়াটার পার্ক নির্মাণ করেছে তারা। পাশাপাশি পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য প্রতিনিয়ত যান্ত্রিক নৌযান ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে লেক এলাকার পানিদূষণ ছাড়াও জলজ বাস্তুসংস্থান বিনষ্ট ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের বুক-কিপিং অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার কথা থাকলেও চুক্তির ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও তা করেনি কনকর্ড গ্রুপ। এছাড়া লভ্যাংশ ভাগাভাগিতে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। চুক্তির শর্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভূমি ব্যবহার বাবদ কনকর্ড রেলওয়ে ও বিপিসিকে বার্ষিক ২৫ লাখ টাকা দেবে, যা সরকারি দুটি সংস্থার মধ্যে ২ অনুপাত ১ হারে বণ্টন হবে। আর বিনোদন কেন্দ্রে পর্যটকদের প্রবেশমূল্যের ২ শতাংশ রেলওয়ে ও ১ শতাংশ বিপিসি পাবে। কিন্তু কনকর্ড পছন্দের অডিট ফার্ম দিয়ে হিসাব নিরীক্ষা করে আয় বণ্টন করছে। এতে প্রকৃত আয় আড়াল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রেল কর্তৃপক্ষের।

রেলওয়ের কাছে কনকর্ডের অর্থ পরিশোধের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভূমি ব্যবহার বাবদ রেলওয়ের বার্ষিক প্রাপ্য ১৬ লাখ ৪ হাজার ৩৩৪ টাকা দিচ্ছে কনকর্ড। কিন্তু টিকিট বিক্রি থেকে আয়ের অংশটি সাম্প্রতিক সময়ে কমে আসছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে রেলওয়েকে ২৪ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৭ টাকা দিলেও সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দিয়েছে ২১ লাখ ৫২ হাজার ৪০ টাকা। যদিও এ সময়ের মধ্যে কনকর্ড বিনোদন কেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশের উন্নয়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে।

রেলের ভূ-সম্পত্তি শাখার তথ্যমতে, ফয়’স লেকের শুধু জলাশয় হিসেবে ৩৩৬ দশমিক ৬২ একর ভূমির বর্তমান ইজারামূল্য বার্ষিক ৬৭ লাখ ৩২ হাজার ৪০০ টাকা। এছাড়া আনুষঙ্গিক আয়সহ ফয়’স লেক থেকে রেলের আয় কয়েক গুণ বেশি হওয়ার কথা। ফলে কনকর্ড এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

আরো জানা গেছে, জেলা প্রশাসনকে বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধেও গড়িমসি করেছে কনকর্ড গ্রুপ। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে একটি সিসি মামলা করেছে। মামলা নং-১২-০৮-২০০৯।

চুক্তি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা ইসরাত রেজা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এখন নিয়ম অনুুযায়ী কনকর্ডের স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে। ইউটিলিটি বিচ্ছিন্ন করার আদেশের বিরুদ্ধে কনকর্ড এরই মধ্যে তিন মাসের স্থগিতাদেশ নিয়েছে। রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি বিভাগকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কনকর্ড ফয়’স লেক অ্যামিউজমেন্ট ওয়ার্ল্ডের মহাব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, এখানে কনকর্ডের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে। রেলওয়ে চুক্তি বাতিল করলেও স্থাপনা উচ্ছেদ ও চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...