লটারিতে ভাগ্য নির্ধারণ হয় দালালদের

0

বিজয়ী নির্ধারণ করতে লটারির কথা সবার জানা আছে। তবে লটারির মাধ্যমে প্রতিদিনের ডিউটি নির্ধারণের কথা কস্মিনকালেও কেউ শুনেছেন কিনা সন্দেহ।

অবাক ঠেকলে সত্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সক্রিয় ২৩ ফার্মেসির দালালদের প্রতিদিনের ডিউটি নির্ধারণ হয় লটারিতে!

প্রতিদিন ঠিক সকাল ৬টায় হয় লটারি। এতে যার নাম আগে আসবে সে প্রথমে তার পছন্দের ওয়ার্ড বেছে নেবে। আবার এই লটারির মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কোন দালাল কোন শিফটে ডিউটি করবে। দালালদের মধ্যে ঝামেলা এড়াতে এই ‘লটারি আইন’ করেছে ২৩ ফার্মেসির সিন্ডিকেট।

চমেকের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরেজমিনে ঘুরে কথা হয় কয়েকজন দালালের সঙ্গে। তথ্যপ্রমাণ দিলে তারা সব স্বীকার করতে বাধ্য হয়। এরপর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

২৩ ফার্মেসির সিন্ডিকেটের সদস্য মিলে তৈরি করেছে প্রতারণার অভিনব কায়দা। দালালদের জন্য বানিয়েছে লটারি আইন। এ আইনেই চলে পুরো চমেক হাসপাতালের অর্ধশত দালাল।

জানা যায়, এই লটারি দিয়ে ভাগ্য নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয় দালাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা এড়াতে। কারণ অনেক সময় একজন রোগীর প্রেসক্রিপশন নিতে একাধিক দালাল লেগে থাকে। তখন দালালদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় হাতছাড়া হয়ে যায় রোগী।

দালালদের মধ্যে ঝামেলা এড়াতেই ‘লটারি আইন’। এই লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হয় দালালদের ওয়ার্ড বাছাই থেকে শুরু করে ডিউটির শিফটও।

প্রতিদিন সকাল ৬টায় লটারির পুরো কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয় ২৩ ফার্মেসির দালাল সিন্ডিকেটের প্রধান নুরুর মালিকানাধীন হীরা ফার্মেসিতে।

বিকে ফার্মার হয়ে কাজ করা এক দালালের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, ২৩ ফার্মেসির নাম লিখে প্রতিদিন সকালে একটা বক্সে রাখা হয়। এরপর দালালরা বক্স থেকে লটারি তোলে। যার নাম আগে আসে সে প্রথমে ওয়ার্ড পছন্দ করার সুযোগ পায়।

ওয়ার্ড়গুলোতে দালালদের দুই শিফটে ডিউটি থাকে। প্রথম শিফট সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা। পরের শিফট রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা। এই শিফটের ভাগাভাগিও নির্ধারিত হয় লটারিতে।

পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করে ২৩ ফামের্সির হয়ে কাজ করা আরেক দালাল জয়নিউজকে বলেন, আমরা এখানে আসি নিজের ইচ্ছেতে। কিন্তু এ কাজ ছেড়ে যেতে চাইলেও পারি না। ওদের নিয়ম এবং আইন মেনে আমাদের চলতে হয়। এখানে আমরা প্রতিদিন অসহায় মানুষদের ঠকায়, প্রতারণা করে তাদের থেকে টাকা হাতিয়ে নিই। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই। আমরা ২৩ ফার্মেসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। আমাদের এই ২৩ ফার্মেসির যে অ্যাসোসিয়েশন আছে তার বাইরে যেতে পারি না।

দালালচক্রের এই সদস্য আরো বলেন, আপনি চাইলে কি এটি বন্ধ করতে পারবেন? পারবেন না। কারণ আমাদের যারা পরিচালিত করেন তাদের সঙ্গে মেডিকেলের অনেক প্রভাবশালীর সম্পর্ক আছে। আপনাকে সব বলতে পারছি না। কিন্তু এই ২৩ ফার্মেসির মূলে যারা আছে তাদের ধরতে পারলে সব বেরিয়ে আসবে। আমাদের ধরে বা শাস্তি দিয়ে লাভ নেই।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চমেকের পূর্ব গেইটে থাকা ফার্মেসিগুলোতে খুব কম পরিমাণ ওষুধ ডিসপ্লেতে রাখা আছে । বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সহয়তায় তারা মেডিকেল থেকে সরানো সরকারি  ওষুধ লোকচক্ষুর আড়ালে রাখে। এছাড়া রোগীর প্রেসক্রিপশনে প্রয়োজনের বেশি লেখা ওষুধও দুর্নীতিবাজ নার্সদের মাধ্যমে দোকানে নিয়ে আসে।

দালালরা রোগীর স্বজন ধরে নিয়ে এলে তাদের সেই ওষুধ ধরিয়ে দেওয়া হয়। যার জন্য স্বজনদের দিতে হয় চার-পাঁচ গুণ বেশি মূল্য। জনশ্রুতি আছে, চমেক হাসপাতালের ফার্মেসিতে ওষুধ পাওয়া না গেলেও এদের কাছে এসে কোনো রোগী খালি হাতে ফেরে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ফোন করা হয় ২৩ ফার্মেসি দালাল অ্যাসোশিয়শনের সদস্য বিকে ফার্মার মালিক সৌরভ চন্দ্রকে। তবে জয়নিউজের নাম শুনতেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। একই কাজ করেন সিটি মেডিকো ও ন্যাশনাল ফার্মেসির মালিক।

পরে ২৩ ফার্মেসি দালাল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নিহা মেডিকেলে যোগাযোগ করা হলে নিজেকে ‘সিরাজ’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন ধরেন। তিনি জয়নিউজকে বলেন, আমরা আগে করতাম এখন এসব লাইন চালাই না। আপনি লেখালেখি করছেন তাই এখন লাইনটা অফ আছে।

তিনি দোকানের মালিক নন উল্লেখ করে বলেন, এই দোকানের মালিক অন্জন ধর। আমি জাস্ট দোকানে বসি। দাদা এখন বাইরে আছেন। আর লটারি করা হয় যখন লাইন চলে। এখন কয়েকদিন লাইন অফ তাই লটারির সিস্টেমও অফ। লাইন শুরু হলে লটারি সিস্টেমেই সব দালাল ডিউটি করবে।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম জয়নিউজকে বলেন, মানুষের বিবেকবোধ চলে গেছে। এরা হতদরিদ্র মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করতে নানান ফাঁদ পাতে। আমরা প্রায় এদের ধরে পুলিশে দিই। কিন্তু এরা জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় । কিছুদিন আগে এক মেয়েকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ধরে থানায় দিয়েছি। সেও ধরিয়ে দেওয়ার পরদিন থানা থেকে বের হয়ে যায় । একজন অপরাধী যদি অপরাধ করে শাস্তি না পায় তাহলে সে আরো বড় অপরাধ করবে- এটাই স্বাভাবিক।

তিনি আরো বলেন, আপনি অনুসন্ধান করে দালালদের প্রধান ২৩টি ফার্মেসি বের করে নিউজ করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে তো কোনো সমাধান হবে না। জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট যদি এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তাহলে এর সমাধান হবে। আমাদেরতো এক্সকিউটিভ ক্ষমতা নেই, তাই শাস্তি দিতে পারি না। তারপরও আমরা আপনাদের তথ্যগুলো আমলে নিয়ে কাজ করছি।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...