‘বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন? কুত্তাওয়ালী জবাব চাই’

0

১৯৮২ সনের ১২ জুন হত্যার অপরাধে বাকেরের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৮৩ সনের শেষ দিকে তার মার্সি পিটিশন অগ্রাহ্য হয়। বাকেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে ১৯৮৫ সালের ১২ জানুয়ারি বুধবার ভোর পাঁচটায়। তার ডেডবডি গ্রহণ করার জন্যে রোগা, লম্বা, শ্যামলা মতো যে মেয়েটি ভোর রাত থেকে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁকে জেলার জিঙ্গেস করেন— আপনি ডেডবডি নিতে এসেছেন? আপনি মৃতের কে? মেয়েটি শান্ত গলায় উত্তর বলল,— কেউ না। আমি ওর কেউ না।

এই রোগা, লম্বা, শ্যামলা মতো মেয়েটি যে মুনা তা বোধ হয় নব্বই দশকের কোনো দর্শকেই বলে দিতে হবে না। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘কোথাও কেউ নেই’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত ও নির্দেশক বরকত উল্লাহ নির্দেশিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক। ধারাবাহিকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল ‘বাকের ভাই’।

বাকের ভাই গুন্ডা প্রকৃতির লোক এবং তার সঙ্গী ছিল বদি আর মজনু। তারা তিনজনই মোটরসাইকেলে করে চলাফেরা করতো। অধিকাংশ সময় মোটরসাইকেল চালাতো মজনু, বদি বসতো পিছনে, বাকের ভাই বসতো মাঝে। বাকের ভাইয়ের একটা মুদ্রাদোষ ছিল। সে একটা চেইন হাতের তর্জনিতে অনবরত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচাতো, আবার উল্টোদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচ খুলে আবার প্যাঁচাতো। সক্রিয় ডায়লগ না থাকলে প্রায়ই তাকে এরকম করতে দেখা যেত।

বাকের ভাইকে পছন্দ করতো মুনা। মুনা এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। সে চাকরি করে এবং তার মামাতো ভাই-বোনদের দেখাশোনা করে। তবে বাকের ভাই এলাকার মাস্তান হলেও অধিকাংশ মানুষ তাকে ভালোবাসতো, কারণ সে ছিল সত্যের পূজারী। নিপীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে যেমন কুণ্ঠিত হতো না, তেমনি সমাজের অন্যায়কেও মুখ বুজে মেনে নিত না, নিজের গুন্ডাদের দিয়ে তা কঠোর হস্তে দমন করতো। আর এভাবেই এক অপরাধীর চরিত্র হুমায়ূন আহমেদ ফুটিয়ে তুলেছিলেন এক অসাধারণ চরত্রে।

ঘটনাপ্রবাহে বাকের ভাই রেবেকা হক নামের এলাকার প্রভাবশালী এক নারীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ওই নারী তার বাড়িতে অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন, বাকের ভাই তা জানতে পেরে প্রতিবাদ করে। এই প্রভাবশালী নারী তার বাড়িতে কুকুর পালন করতেন বলে বাকের ভাই তাকে কুত্তাওয়ালী বলেন। এরই মধ্যে রাতের অন্ধকারে কুত্তাওয়ালীর দারোয়ান তার বাড়িতে খুন হয়। ফাঁসানোর জন্য এই খুনের দায় দেওয়া হয় বাকের ভাইকে।

সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেয় কুত্তাওয়ালীর সাজানো সাক্ষী এলাকার নব্য ছিনতাইকারী মতি। যদিও পদে পদে মতির মিথ্যা সাক্ষ্য বাকের ভাইয়ের উকিল ধরিয়ে দিচ্ছিলেন আদালতের কাছে। এদিকে বাকের ভাইকে ফাঁসানোর জন্য কুত্তাওয়ালী বাকের ভাইয়েরই সাগরেদ বদিকে কৌশলে রাজসাক্ষী করে। নিরুপায় বদি আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়।

বদির মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বাকের ভাইকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। বাকের ভাইয়ের পক্ষে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন উকিল। আদালতের এই সিদ্ধান্তে যেন মরে যায় মুনার মন।

এদিকে মুনার ঘরের সবাইও বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি জমান। এই একাকিত্বের দিনে এক ভোরে, আধো অন্ধকারে, চারদিকে যখন ফজরের আযান হচ্ছিল জেল গেট দিয়ে বাকের ভাইয়ের লাশ বের করে দেওয়া হয়। মুনা ছাড়া কেউ ছিল না সেই লাশ গ্রহণ করার জন্য। মুনা বড় একা হয়ে যায়। তার যেন আর কেউ রইলো না কোথাও।

নাটকের নামকে সার্থক করে মুনা ধারাবাহিকের শেষ দৃশ্যে ভোরের আধো-অন্ধকারে ছায়া হয়ে একা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রদর্শিত এই টিভি ধারাবাহিক এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল ধারাবাহিকটির প্রতিটা পর্ব, দর্শকরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করতেন। ধারাবাহিক প্রতি পর্ব দেখতে দেখতেই দর্শক বাকের ভাইকে পছন্দ করে ফেলেন এবং বাকেরের পক্ষে জনমত গড়ে উঠে। একপর্যায়ে যখন বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠে, উকিল হুমায়ূন ফরিদি শত চেষ্টাসত্ত্বেও খেই হারিয়ে ফেলছেন এই কেসে। তখন দর্শকরা প্রতিবাদমুখর হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। চলতে থাকে মিছিল, দেয়াললিখন, সমাবেশ। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে লোকজন মিছিল করে স্লোগান দিতে থাকে।

“বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কেন, কুত্তাওয়ালী জবাব চাই”/ “বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে”/বাকের ভাইয়ের মুক্তি চাই, কুত্তাওয়ালীর ফাঁসি চাই।”

তখনকার গণমাধ্যমেও বিষয়টি ফলাও করে প্রকাশ হয়। মনে হয়েছিল, হয়ত লেখক জনমতের ভিত্তিতে ধারাবাহিকের গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তা না করে ধারাবাহিকটিকে তার যথাবিহীত পরিণতি দেন এবং বাকের ভাইয়ের পক্ষে দর্শকদের তুমুল আবেগ এবং সমর্থন সত্ত্বেও ধারাবাহিকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়।

ধারাবাহিকটির তুমুল জনপ্রিয়তার  ছায়া পড়ে বাকের ভাই চরিত্রের অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের জীবনেও। তিনি এরপর থেকে বাকের ভাই হিসেবে সমাদৃত হন।এমনকি তিনি যেবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেন,তখন বাকের ভাইয়ের নাম ধরেই নীলফামারীতে তাঁর পক্ষে ভোট চাওয়া হয়েছিল !

এ নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুবর্ণা মোস্তফা– মুনা, আসাদুজ্জামান নূর– বাকের ভাই, আবদুল কাদের– বদি, লুতফর রহমান জর্জ– মজনু, মাহফুজ আহমেদ– মতি, আফসানা মিমি– বকুল, হুমায়ূন ফরিদী– উকিল। এছাড়া মোজাম্মেল হোসেন, সালেহ আহমেদ, আবুল খায়ের, নাজমা আনোয়ার, শহীদুজ্জামান সেলিম প্রমুখ।

জয়নিউজ/পার্থ

 

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...